হঠাৎ অ্যাংজাইটি শুরু হয় কেন? উত্তর লুকিয়ে আছে মস্তিষ্কে

ফিচার ডেস্ক
ফিচার ডেস্ক ফিচার ডেস্ক
প্রকাশিত: ০১:৩২ পিএম, ০৭ এপ্রিল ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত

বর্তমানের ব্যস্ত, দৌড়ঝাঁপের জীবনে স্ট্রেস যেন আমাদের নিত্যসঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে। একক কোনো সমস্যা নয়, বরং ছোট-বড় নানা চাপ একসঙ্গে জমে গিয়ে অনেককে প্রতিদিনই মানসিক অস্বস্তির মধ্যে ফেলে।

ফলেই বাড়তে থাকে হৃদস্পন্দন, অস্থিরতা এবং উদ্বেগ। স্বল্পমেয়াদি বা অ্যাকিউট স্ট্রেস কখনো কখনো কাজে সহায়ক হলেও দীর্ঘমেয়াদি বা ক্রনিক স্ট্রেস শরীরের জন্য ক্ষতিকর। এটি উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ এমনকি মানসিক সমস্যার ঝুঁকিও বাড়িয়ে দিতে পারে।

অনেকেই ভাবেন, ইচ্ছাশক্তি দিয়ে সহজেই উদ্বেগ কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। কিন্তু চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, বিষয়টি এতটা সহজ নয়। অ্যাংজাইটি আসলে শুধু মানসিক দুর্বলতা নয়-এটি মস্তিষ্কের একটি জটিল শারীরবৃত্তীয় প্রতিক্রিয়া।

অ্যাংজাইটির সময় মস্তিষ্কে কী ঘটে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, উদ্বেগের সময় মস্তিষ্কের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ সক্রিয়ভাবে কাজ করে-অ্যামিগডালা, লুকাস কোয়েরুলিয়াস এবং প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স।

১. বিপদের সঙ্কেত বাড়ে

অ্যামিগডালা মস্তিষ্কের সেই অংশ, যা ভয় এবং বিপদের সঙ্কেত শনাক্ত করে। অ্যাংজাইটির সময় এটি অতি-সক্রিয় হয়ে ওঠে। ফলে বাস্তবে বিপদ না থাকলেও শরীর বারবার মনে করে, কোনো একটা সমস্যা সামনে আসতে চলেছে। এই অবস্থায় শরীর ফাইট অর ফ্লাইট মোডে চলে যায়।

২. নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা কমে যায়

প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স আমাদের চিন্তা, সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং নিজেকে শান্ত রাখার কাজ করে। কিন্তু উদ্বেগের সময় এই অংশের কার্যকারিতা কমে যায়। ফলে আমরা যুক্তি দিয়ে পরিস্থিতি বোঝার পরিবর্তে আবেগ দিয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে শুরু করি।

৩. শারীরিক লক্ষণ দেখা দেয়

এই দুই প্রক্রিয়ার ফলে শরীরে নানা উপসর্গ দেখা দেয়-বুক ধড়ফড় করা, ঘাম হওয়া, হাত কাঁপা, অস্থিরতা এবং মনোযোগে ঘাটতি। অনেক সময় ঘুমের সমস্যাও দেখা দেয়।

অ্যাংজাইটি দুর্বলতা নয়

অ্যাংজাইটি আসলে শরীরের একটি প্রতিরক্ষামূলক প্রতিক্রিয়া। মস্তিষ্ক যখন মনে করে সামনে বিপদ রয়েছে, তখন শরীরকে লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত করে। তাই এটিকে শুধু মানসিক দুর্বলতা ভাবা ভুল। বরং এটি শরীর ও মস্তিষ্কের স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া, যা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সঠিক পদ্ধতি প্রয়োজন।

শরীরচর্চায় যেভাবে অ্যাংজাইটি কমায়

অ্যাংজাইটি কমাতে শরীরচর্চা অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখে। এর পেছনে রয়েছে কয়েকটি বৈজ্ঞানিক কারণ রয়েছে। আসুন জেনে নেওয়া যাক- 

১. মনোযোগ অন্যদিকে সরায়

ব্যায়াম করার সময় মস্তিষ্ক উদ্বেগের কারণ থেকে সরে গিয়ে শরীরের নড়াচড়ায় মনোযোগ দেয়। ফলে নেতিবাচক চিন্তা কমে।

২. পেশির শিথিলতা আনে

উদ্বেগে শরীর শক্ত হয়ে যায়, পেশিতে টান পড়ে। নিয়মিত ব্যায়াম পেশিকে শিথিল করে এবং শরীরকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনে।

৩. মস্তিষ্কে ইতিবাচক রাসায়নিক তৈরি হয়

ব্যায়ামের ফলে সেরোটোনিন, গাবা এবং এন্ডোক্যানাবিনয়েডসের মতো ‘ফিল-গুড’ কেমিক্যাল নিঃসরণ বাড়ে। এগুলো স্বাভাবিকভাবেই উদ্বেগ কমাতে সাহায্য করে।

৪. মস্তিষ্কের নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা বাড়ায়

শরীরচর্চা প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্সকে সক্রিয় করে, যা অ্যামিগডালার অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণে রাখে। ফলে ভয় ও দুশ্চিন্তা কমে।

ব্যায়ামই যথেষ্ট

গবেষণা বলছে, প্রতিদিন দীর্ঘ সময় ব্যায়াম করতেই হবে এমন নয়। শুরুতে মাত্র ১০ মিনিটের হালকা শরীরচর্চাও যথেষ্ট উপকার দিতে পারে। ধীরে ধীরে সময় বাড়ানোই সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি।

যে ধরনের ব্যায়াম করবেন

জোরে হাঁটা, সাইকেল চালানো, নাচ, সাঁতার বা তাই-চি মতো সহজ কিছু ব্যায়াম অ্যাংজাইটি কমাতে কার্যকর। এমনকি হাই-ইনটেনসিটি ইন্টারভ্যাল ট্রেনিং ও ভালো ফল দেয়।

চিকিৎসকের পরামর্শ জরুরি

যদি উদ্বেগ এতটাই বেড়ে যায় যে তা দৈনন্দিন জীবনে বাধা সৃষ্টি করে, কিংবা নিজে থেকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব না হয়, তাহলে অবশ্যই বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া উচিত। সঠিক থেরাপি ও জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে মস্তিষ্ককে আবার শান্ত থাকার অভ্যাস শেখানো সম্ভব।

অ্যাংজাইটি সাময়িক হলেও অবহেলা করা ঠিক নয়। সময়মতো সচেতনতা ও সঠিক পদক্ষেপই পারে মানসিক সুস্থতা বজায় রাখতে।

সূত্র: মায়ো ক্লিনিক, ওয়েবএমডি, টাইমস অব ইন্ডিয়া

এসএকেওয়াই

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।