বিশ্ব আইবিডি দিবস

সচেতনতা, সহমর্মিতা ও সুস্থ জীবনের আহ্বান

ডা. মো. সাঈদ হোসেন
ডা. মো. সাঈদ হোসেন ডা. মো. সাঈদ হোসেন , কনসালটেন্ট ও বিভাগীয় প্রধান, মেডিসিন
প্রকাশিত: ১২:০৯ পিএম, ১৯ মে ২০২৬
প্রতীকী ছবি, এআই দিয়ে বানানো

প্রতিবছর ১৯ মে বিশ্বজুড়ে পালিত হয় ‌বিশ্ব আইবিডি দিবস। এই দিনটি শুধু একটি স্বাস্থ্যসচেতনতামূলক আয়োজন নয়, বরং লাখ লাখ মানুষের নীরব সংগ্রামের প্রতি সম্মান জানানোর দিন।

আইবিডি এমন একটি দীর্ঘমেয়াদি অন্ত্রজনিত রোগ, যা মানুষের দৈনন্দিন জীবন, মানসিক স্বাস্থ্য এবং সামাজিক সম্পর্কের উপর গভীর প্রভাব ফেলে। তবুও সচেতনতার অভাবে অনেকেই রোগটি সম্পর্কে জানেন না, কিংবা রোগীদের কষ্ট উপলব্ধি করতে পারেন না। তাই এই দিবসের মূল উদ্দেশ্য হলো-সচেতনতা বৃদ্ধি, রোগ সম্পর্কে সঠিক তথ্য পৌঁছে দেওয়া এবং আক্রান্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো।

২০২৬ সালের বিশ্ব আইবিডি দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় হলো- 'আইবিডির কোনো সীমানা নেই: সবার জন্য চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা'। এই প্রতিপাদ্যের মূল উদ্দেশ্য হলো- পৃথিবীর সব আইবিডি রোগীর জন্য দ্রুত রোগ নির্ণয়, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা ও সমান স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার গুরুত্ব তুলে ধরা।

অনেকেই হয়তো 'আইবিডি' শব্দটির সঙ্গে খুব বেশি পরিচিত নন। আইবিডি বা ইনফ্ল্যামেটরি বাওয়েল ডিজিজ হলো অন্ত্রের দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহজনিত একটি রোগ। এটি মূলত দুই ধরনের-ক্রোনস ডিজিজ এবং আলসারেটিভ কোলাইটিস। এই রোগে পরিপাকতন্ত্রে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ সৃষ্টি হয়, যার ফলে রোগী তীব্র পেটব্যথা, ডায়রিয়া, রক্তপাত, দুর্বলতা, ওজন কমে যাওয়া, ক্ষুধামন্দা এবং চরম ক্লান্তির মতো সমস্যায় ভোগেন। অনেক সময় রোগটি এতটাই জটিল হয়ে ওঠে যে রোগীর স্বাভাবিক জীবনযাপন কঠিন হয়ে পড়ে।

আইবিডি এমন একটি রোগ, যা বাইরে থেকে বোঝা যায় না। একজন মানুষ হয়তো হাসিমুখে সবার সঙ্গে কথা বলছেন, কিন্তু ভেতরে ভেতরে তিনি তীব্র শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। এই অদৃশ্য কষ্টের কারণেই আইবিডি রোগীদের জীবন অনেক বেশি কঠিন হয়ে ওঠে। কারণ অধিকাংশ মানুষ তাদের সমস্যাকে বুঝতে পারেন না। অনেক সময় রোগীরা সামাজিকভাবে বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। বারবার টয়লেটে যেতে হওয়া, হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়া কিংবা দীর্ঘ সময় কর্মস্থলে বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে থাকতে না পারার কারণে তারা মানসিক চাপ ও হতাশায় ভোগেন।

বিশ্ব আইবিডি দিবস

বিশ্বজুড়ে বর্তমানে কোটি কোটি মানুষ আইবিডিতে আক্রান্ত। উন্নত বিশ্বের পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও এ রোগের প্রকোপ দ্রুত বাড়ছে। বাংলাদেশেও গত কয়েক বছরে আইবিডি রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে এখনও এ রোগ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের মধ্যে সচেতনতা তুলনামূলক কম। অনেক ক্ষেত্রেই রোগটি দীর্ঘদিন শনাক্ত হয় না। সাধারণ পেটের সমস্যা ভেবে রোগীরা বছরের পর বছর ভুল চিকিৎসা নেন। ফলে রোগ জটিল আকার ধারণ করে। তাই সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রাথমিক পর্যায়ে সঠিক রোগ নির্ণয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, আইবিডির সুনির্দিষ্ট কারণ এখনও পুরোপুরি জানা যায়নি। তবে ধারণা করা হয়, শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার অস্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া এর অন্যতম কারণ। জেনেটিক প্রভাব, পরিবেশগত পরিবর্তন, খাদ্যাভ্যাস, অতিরিক্ত মানসিক চাপ, দূষণ এবং অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনও এই রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। আধুনিক নগরজীবনের ব্যস্ততা, অনিয়মিত খাদ্যাভ্যাস এবং ফাস্টফুডনির্ভর সংস্কৃতিও এ রোগ বৃদ্ধির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।

আইবিডি কোনো ছোঁয়াচে রোগ নয়, এ কথা সমাজের সবাইকে বুঝতে হবে। অনেক সময় মানুষ ভুল ধারণার কারণে রোগীদের এড়িয়ে চলেন বা অপ্রয়োজনীয় মন্তব্য করেন, যা একজন রোগীর মানসিক অবস্থাকে আরও খারাপ করে তোলে। একজন আইবিডি রোগী কেবল শারীরিক অসুস্থতার সঙ্গেই লড়েন না; তিনি সামাজিক অবহেলা, মানসিক ক্লান্তি এবং একাকীত্বের সঙ্গেও যুদ্ধ করেন। তাই রোগীদের প্রতি সহানুভূতিশীল আচরণ অত্যন্ত জরুরি।

বিশ্ব আইবিডি দিবস আমাদের শেখায়-মানবিকতা সবচেয়ে বড় শক্তি। একজন রোগীকে করুণা নয়, প্রয়োজন সম্মান, সহযোগিতা ও ভালোবাসা। পরিবার, বন্ধু, সহকর্মী এবং সমাজ যদি একজন রোগীর পাশে দাঁড়ায়, তবে তার মানসিক শক্তি বহুগুণ বেড়ে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে, মানসিক প্রশান্তি এবং সামাজিক সমর্থন আইবিডি রোগ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

আইবিডি রোগীদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো অনিশ্চয়তা। কখন রোগ বাড়বে, কখন শরীর খারাপ হবে-তা অনেক সময় আগে থেকে বোঝা যায় না। ফলে তারা ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন থাকেন। শিক্ষার্থী হলে পড়াশোনা ব্যাহত হয়, চাকরিজীবী হলে কর্মক্ষমতা কমে যায়, এমনকি পারিবারিক সম্পর্কেও প্রভাব পড়ে। অনেক রোগী দীর্ঘমেয়াদি হতাশা ও উদ্বেগে ভোগেন। তাই চিকিৎসার পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যসেবাও অত্যন্ত প্রয়োজন।

বর্তমানে চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে আইবিডির জন্য উন্নত ও কার্যকর চিকিৎসা পদ্ধতি রয়েছে। নিয়মিত ওষুধ সেবন, চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলা, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, পর্যাপ্ত বিশ্রাম এবং মানসিক চাপ কমিয়ে রাখলে অধিকাংশ রোগী স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। আধুনিক বায়োলজিক থেরাপি এবং অন্যান্য উন্নত চিকিৎসা অনেক রোগীর জীবনে আশার আলো নিয়ে এসেছে। তবে উন্নত চিকিৎসা সবার নাগালে পৌঁছানো এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে।

বিশ্ব আইবিডি দিবসে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সচেতনতামূলক কর্মসূচি আয়োজন করা হয়। সেমিনার, ওয়েবিনার, স্বাস্থ্য ক্যাম্প, আলোচনা সভা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা এবং বেগুনি রঙের আলোকসজ্জার মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করা হয়। বেগুনি রং আইবিডি সচেতনতার প্রতীক। এই রং যেন বিশ্বকে স্মরণ করিয়ে দেয়, অসংখ্য মানুষ নীরবে কষ্ট পাচ্ছেন, আর তাদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের দায়িত্ব।

এই দিবসটি চিকিৎসক, গবেষক এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা জানানোর সুযোগ এনে দেয়। যারা দিনরাত পরিশ্রম করে আইবিডি রোগীদের সুস্থ জীবন ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছেন, তারা নিঃসন্দেহে মানবতার সেবায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। একই সঙ্গে আইবিডি নিয়ে গবেষণা আরও বিস্তৃত করা প্রয়োজন, যেন ভবিষ্যতে আরও কার্যকর চিকিৎসা ও প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হয়।

আমাদের সমাজে এখনও পেটের রোগ বা অন্ত্রের সমস্যাকে অনেক সময় লজ্জার বিষয় হিসেবে দেখা হয়। এই মানসিকতা বদলাতে হবে। একজন রোগী যেন নিজের সমস্যার কথা নির্ভয়ে বলতে পারেন, চিকিৎসা নিতে পারেন এবং সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্যতা পান-এমন পরিবেশ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সচেতন সমাজই পারে রোগীদের কষ্ট কিছুটা হলেও লাঘব করতে।

বিশ্ব আইবিডি দিবস শুধু রোগ সম্পর্কে জানার দিন নয়; এটি মানবিকতার শিক্ষা দেয়। আমরা যখন একজন রোগীর কষ্ট বুঝতে শিখি, তখন আমাদের সমাজ আরও সুন্দর, আরও সহানুভূতিশীল হয়ে ওঠে। স্বাস্থ্যসচেতনতা কোনো একক ব্যক্তির দায়িত্ব নয়; এটি পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্র সবার সম্মিলিত দায়িত্ব।

আজকের এই দিনে আমাদের প্রত্যেকের উচিত আইবিডি সম্পর্কে সঠিক তথ্য জানা এবং অন্যদের জানানো। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সচেতনতামূলক বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া, রোগীদের প্রতি ইতিবাচক আচরণ করা এবং স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনে উৎসাহিত করাও বড় ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ সচেতনতা যত বাড়বে, তত দ্রুত রোগ শনাক্ত হবে এবং রোগীরা উন্নত জীবনযাপনের সুযোগ পাবেন।

একজন আইবিডি রোগী কখনোই দুর্বল নন। প্রতিদিনের কষ্ট সহ্য করে, প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে তারা বেঁচে থাকার যে সাহস দেখান, তা সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক। তাদের মুখের হাসির আড়ালে লুকিয়ে থাকে অদম্য শক্তি। তাই এই মানুষগুলোর পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।

মানবতার সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো-একজন মানুষের কষ্টে আরেকজন মানুষের পাশে দাঁড়ানো। আইবিডি আক্রান্ত মানুষেরাও আমাদেরই পরিবার, আমাদেরই সমাজের অংশ। তাদের জন্য ভালোবাসা, সহযোগিতা ও সচেতনতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া হোক আজকের দিনের সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার। 'সচেতনতা হোক শক্তি, সহমর্মিতা হোক সাহস, আর ভালোবাসা হোক প্রতিটি আইবিডি রোগীর নতুন আশার আলো।'

জেএস/

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।