গর্ভাবস্থায় ব্যায়ামের সঠিক নিয়ম ও সতর্কতা
গর্ভাবস্থায় ব্যায়াম করা নিয়ে অনেক নারীর মধ্যেই দ্বিধা থাকে। অনেকে মনে করেন, ব্যায়াম করলে গর্ভের শিশুর ক্ষতি হতে পারে। আবার কেউ কেউ প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সক্রিয় হয়ে পড়েন, যা ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। বাস্তবে চিকিৎসাবিজ্ঞানের মতে, সঠিক নিয়মে ও সীমার মধ্যে করা ব্যায়াম গর্ভবতী মা ও শিশুর জন্য উপকারী।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগে অধ্যাপক ডা. রেজাউল করিম কাজল জানিয়েছেন, গর্ভাবস্থায় সম্পূর্ণ বিশ্রামে থাকা যেমন ক্ষতিকর, তেমনি অতিরিক্ত ব্যায়ামও ঝুঁকিপূর্ণ। মাঝামাঝি ভারসাম্যটাই সবচেয়ে নিরাপদ।
ছবি: বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগে অধ্যাপক ডা. রেজাউল করিম কাজল
গর্ভাবস্থায় ব্যায়াম কি নিরাপদ?
এ প্রশ্নের উত্তরে ডা. কাজল জানান, স্বাভাবিক ও ঝুঁকিমুক্ত গর্ভাবস্থায় ব্যায়াম সাধারণত নিরাপদ। বরং নিয়মিত হালকা ব্যায়াম শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখে, রক্তসঞ্চালন ভালো করে, কোমর ও পায়ের ব্যথা কমায়, প্রসবের সময় সহনশীলতা বাড়ায়, মানসিক চাপ ও উদ্বেগ কমায়। তবে যাদের উচ্চ রক্তচাপ, রক্তক্ষরণ, আগের প্রি-ম্যাচিউর ডেলিভারির ইতিহাস বা গর্ভাবস্থায় অন্য জটিলতা আছে, তাদের ক্ষেত্রে ব্যায়াম শুরুর আগে অবশ্যই চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন।
কোন ধরণের ব্যায়াম গর্ভাবস্থায় উপকারী?
ডা. কাজলের মতে, গর্ভাবস্থায় ব্যায়ামের মূল লক্ষ্য হলো শরীরকে সক্রিয় রাখা, ক্লান্ত করা নয়।
নিয়মিত হাঁটা: এটি সবচেয়ে সহজ ও নিরাপদ ব্যায়াম। দিনে ২০–৩০ মিনিট হালকা হাঁটা উপকারী। খোলা ও নিরাপদ জায়গায় হাঁটা ভালো। অতিরিক্ত গরমে হাঁটা এড়িয়ে চলতে হবে।
হালকা স্ট্রেচিং ব্যায়াম: পেশি শিথিল রাখতে সাহায্য করে। কোমর ও পায়ের ব্যথা কমায়। ঘুমের সমস্যা কমাতে সহায়ক।
শ্বাস-প্রশ্বাসের ব্যায়াম: এই ব্যায়াম প্রসবের সময় শ্বাস নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। গভীর শ্বাস নেওয়া ও ছাড়ার অনুশীলন মানসিক চাপ কমায়।
কোন ব্যায়ামগুলো এড়িয়ে চলা জরুরি?
গর্ভাবস্থায় কিছু ব্যায়াম বিপজ্জনক হতে পারে। যেমন- ভারী ওজন তোলা, দৌড়ঝাঁপ বা লাফানো ব্যায়াম, হঠাৎ বাঁকানো বা পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি আছে এমন ব্যায়াম, দীর্ঘ সময় চিৎ হয়ে শুয়ে করা ব্যায়াম।
ডা. কাজল বলেন, যে কোনো ব্যায়ামে যদি মাথা ঘোরা, শ্বাসকষ্ট বা তলপেটে ব্যথা শুরু হয়, সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ করতে হবে।
আরও পড়ুন:
- বিয়ের অনেক বছর পার হলেও সন্তান হচ্ছে না?
- বিয়ের আগে যাদের জন্মনিয়ন্ত্রণ পিল খেতে হয়
- প্রি-ম্যাচিউর শিশু জন্ম, একটি নীরব স্বাস্থ্যঝুঁকি
- নিঃসন্তান দম্পতিদের চিকিৎসায় আইভিএফ, যা জানা জরুরি
ব্যায়াম করার সময় কোন লক্ষণ দেখলে থামবেন?
ব্যায়াম চলাকালীন রক্তক্ষরণ, তীব্র মাথা ঘোরা, বুকে ব্যথা, শিশুর নড়াচড়া কমে যাওয়া এসব লক্ষণগুলো দেখা দিলে সঙ্গে সঙ্গে থামতে হবে এবং চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে।
গর্ভাবস্থায় ব্যায়ামের সময় কিছু গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
- খালি পেটে ব্যায়াম না করা
- পর্যাপ্ত পানি পান করা
- আরামদায়ক পোশাক ও জুতা ব্যবহার করা
- অতিরিক্ত ক্লান্ত হওয়া পর্যন্ত ব্যায়াম না করা
সবশেষে ডা. কাজল বলেন, গর্ভাবস্থায় ব্যায়াম মানেই ঝুঁকি নয়, বরং সঠিক নিয়মে করলে এটি মায়ের শরীর ও মনের জন্য আশীর্বাদস্বরূপ। মনে রাখতে হবে প্রতিটি গর্ভাবস্থা আলাদা। তাই অন্যের দেখে নয়, নিজের শরীরের অবস্থা বুঝে এবং প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে ব্যায়াম করাই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
জেএস/