ওজন কমাতে কলা, বন্ধু না শত্রু?
ওজন কমানোর কথা মাথায় আসলেই মনে পড়ে ফলের কথা। কারণ ওজন কমানোর জন্য সবচেয়ে জরুরি শর্করা বা কার্বোহাইড্রেট বাদ দেওয়া। আর সেজন্য বেশি ফল খেয়ে পেট ভরা রাখার চিন্তা থেকেই বেড়ে যায় এর গুরুত্ব। কিন্তু বেশি দামের কারণে সব ধরণের ফল খাওয়া সবার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই সহজলভ্য ফলই বেছে নেওয়ার চেষ্টা করেন সবাই। সহজলভ্য ফলের মধ্যে অন্যতম কলা।
কলা খেতে সুস্বাদু, প্রাকৃতিকভাবে মিষ্টি এবং পুষ্টিগুণে ভরপুর। পটাসিয়াম, ভিটামিন বি৬ এবং ফাইবারের ভালো উৎস এই ফল। কিন্তু ওজন নিয়ন্ত্রণের দিক থেকে প্রশ্ন আসে প্রতিদিন কলা খেলে কি ওজন কমাতে সাহায্য করবে, নাকি এটি ওজন বৃদ্ধির ঝুঁকি বাড়াবে?
চলুন জেনে নেই কলার ক্যালোরি ও কার্বোহাইড্রেট কেমন প্রভাব ফেলে, কতটা পরিমাণে খেলে এটি স্বাস্থ্যকর এবং ওজন কমানোর জন্য কীভাবে কলাকে আপনার খাদ্যতালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা যায়।

একটি কলায় কতটা চিনি থাকে?
মাঝারি আকারের একটি কলার ওজন সাধারণত প্রায় ১১৮ গ্রাম। এতে প্রায় ১৪ গ্রাম প্রাকৃতিক চিনি থাকে। এই চিনি মূলত ফ্রুক্টোজ, গ্লুকোজ ও সুক্রোজ থেকে আসে। শুনতে বেশি মনে হলেও এটি প্রক্রিয়াজাত নয়, বরং প্রাকৃতিক চিনি যার সঙ্গে থাকে ফাইবার, ভিটামিন ও খনিজ উপাদান।
কলার ফাইবার রক্তে শর্করার শোষণকে ধীর করে দেয়। ফলে হঠাৎ করে রক্তে শর্করার মাত্রা বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি অনেকটাই কমে। তবে মনে রাখতে হবে, কলা যত বেশি পাকে, তত বেশি মিষ্টি হয়। কারণ পাকতে থাকলে এর ভেতরের স্টার্চ ভেঙে সরল শর্করায় রূপ নেয়। এছাড়া কলা পটাসিয়াম, ভিটামিন বি৬ এবং তাৎক্ষণিক শক্তির ভালো উৎস।
কলা কি রক্তে শর্করার মাত্রা বাড়ায়?
হ্যাঁ, কলায় থাকা কার্বোহাইড্রেট শরীরে গ্লুকোজে রূপান্তরিত হয়, যা স্বাভাবিকভাবেই রক্তে শর্করার মাত্রা কিছুটা বাড়াতে পারে। একটি মাঝারি কলায় প্রায় ২৭ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট থাকে, যার মধ্যে প্রায় ১৪ গ্রামই চিনি।
তবে বিষয়টি পুরোপুরি নেতিবাচক নয়। কলায় উপস্থিত ফাইবার কার্বোহাইড্রেটের শোষণ ধীর করে দেয়। ফলে সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে রক্তে শর্করার ওঠানামা সাধারণত নিয়ন্ত্রিত পর্যায়েই থাকে। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে অবশ্যই পরিমাণের দিকে নজর রাখা জরুরি। একসঙ্গে বড় কলা খাওয়ার বদলে ছোট বা অর্ধেক কলা খাওয়া নিরাপদ হতে পারে।
কলার পাকা-অপাকার প্রভাব
সবুজ বা কম পাকা কলায় বেশি পরিমাণে প্রতিরোধী স্টার্চ থাকে। এই স্টার্চ ধীরে হজম হয় এবং রক্তে শর্করার মাত্রা ধীরে বাড়ায়। অন্যদিকে, কলা পুরোপুরি পেকে গেলে স্টার্চ ভেঙে সরল শর্করায় পরিণত হয়। ফলে এটি বেশি মিষ্টি লাগে এবং রক্তে শর্করা তুলনামূলক দ্রুত বাড়তে পারে।
যারা রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখতে চান, বিশেষ করে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তি তারা সামান্য কম পাকা কলা বেছে নিতে পারেন।
আরও পড়ুন:
কলা কি ওজন বাড়ায়?
একটি মাঝারি কলায় প্রায় ১০০–১১০ ক্যালোরি থাকে। একে একা খেলে সাধারণত ওজন বাড়ে না। বরং এটি স্বাস্থ্যকর স্ন্যাকস হিসেবে ভালো বিকল্প। তবে যদি প্রতিদিন একাধিক কলা উচ্চ-ক্যালোরিযুক্ত খাবারের সঙ্গে যেমন: দুধ, চিনাবাদাম মাখন, বাদাম বা ওটস মিশিয়ে খাওয়া হয়, তাহলে মোট ক্যালোরি গ্রহণ বেড়ে যেতে পারে। নিয়মিত অতিরিক্ত ক্যালোরি গ্রহণই মূলত ওজন বৃদ্ধির কারণ। অর্থাৎ, কলা নিজে সমস্যার মূল নয়; পরিমাণ ও সামগ্রিক খাদ্যাভ্যাসই গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিদিন কতটি কলা খাওয়া নিরাপদ?
সাধারণত সুস্থ প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য প্রতিদিন একটি মাঝারি কলা খাওয়া নিরাপদ ও উপকারী। এতে প্রায় ১০০–১১০ ক্যালোরি, ২৭ গ্রাম কার্বোহাইড্রেট এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পটাসিয়াম, ভিটামিন বি৬ ও ফাইবার পাওয়া যায়।
তবে কিছু ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন-
- ডায়াবেটিস থাকলে পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ জরুরি
- কিডনি সমস্যায় আক্রান্ত ব্যক্তিদের অতিরিক্ত পটাসিয়াম এড়িয়ে চলা উচিত
- ক্যালোরি নিয়ন্ত্রণে থাকলে দৈনিক মোট খাদ্যতালিকার অংশ হিসেবে হিসাব রাখা ভালো
কিছু পরামর্শ
- একসঙ্গে পুরো বড় কলা না খেয়ে অর্ধেক খান
- প্রোটিন বা ফাইবারসমৃদ্ধ খাবারের সঙ্গে খান
- খুব বেশি পাকা কলা এড়িয়ে চলুন
- রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়মিত পরীক্ষা করুন
সর্বোপরি ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য পরিস্থিতি অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ সিদ্ধান্ত।
তথ্যসূত্র: ব্রিটিশ নিউট্রিশন ফাউন্ডেশন
জেএস/

