সম্পর্ক ভাঙার পর সচেতন থাকুন
একটি সম্পর্ক ভেঙে যাওয়া শুধু দুজন মানুষের আলাদা হয়ে যাওয়া নয়; এটি মানসিক, আবেগিক এমনকি শারীরিক স্তরেও গভীর প্রভাব ফেলে। ভালোবাসা, অভ্যাস, নির্ভরতা সব মিলিয়ে যে বন্ধন তৈরি হয়, তা হঠাৎ ছিন্ন হলে স্বাভাবিকভাবেই ভেতরে শূন্যতা তৈরি হয়। অনেকেই এই সময়ে তাড়াহুড়া করে সিদ্ধান্ত নেন, আবেগে ভেসে এমন কিছু করেন যা পরে অনুশোচনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তাই সম্পর্ক ভাঙার পর সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো সচেতন থাকা।
আবেগকে অস্বীকার নয়, স্বীকার করুন
বিচ্ছেদের পর কষ্ট, রাগ, হতাশা বা অপরাধবোধ এসব অনুভূতি খুবই স্বাভাবিক। নিজেকে শক্ত প্রমাণ করতে গিয়ে অনেকেই বলেন, ‘আমি ঠিক আছি।’ কিন্তু ভেতরে জমে থাকা অনুভূতিগুলো অস্বীকার করলে তা দীর্ঘমেয়াদে মানসিক চাপ বাড়ায়। কাঁদতে ইচ্ছে করলে কাঁদুন, মন খারাপ হলে স্বীকার করুন যে আপনি কষ্ট পাচ্ছেন। আবেগকে জায়গা দেওয়া মানেই দুর্বল হওয়া নয়; বরং সুস্থ হয়ে ওঠার প্রথম ধাপ।
হঠাৎ সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে বিরত থাকুন
ব্রেকআপের পর অনেকেই হুট করে চাকরি ছাড়েন, শহর বদলান, নতুন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন বা বড় কোনো আর্থিক সিদ্ধান্ত নেন। আবেগের তাড়নায় নেওয়া এসব সিদ্ধান্ত পরবর্তীতে সমস্যার কারণ হতে পারে। অন্তত কয়েক সপ্তাহ বা মাস সময় দিন নিজেকে। মন স্থির না হওয়া পর্যন্ত বড় সিদ্ধান্ত না নেওয়াই ভালো।
সামাজিক মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া নয়
অনেকেই বিচ্ছেদের পর সামাজিক মাধ্যমে ইঙ্গিতপূর্ণ স্ট্যাটাস দেন, পুরোনো ছবি মুছে ফেলেন বা প্রাক্তনকে উদ্দেশ করে পোস্ট করেন। এসব আচরণ সাময়িক স্বস্তি দিলেও পরে অস্বস্তি তৈরি করতে পারে। ব্যক্তিগত বিষয়কে প্রকাশ্যে না এনে ব্যক্তিগত পরিসরে সামলানোই পরিণত আচরণ।
আরও পড়ুন:
নিজেকে দোষারোপ বা প্রাক্তনকে সম্পূর্ণ দোষ দেওয়া দুটিই ভুল
একটি সম্পর্ক ভাঙার পেছনে সাধারণত একাধিক কারণ থাকে। সব দোষ নিজের কাঁধে নেওয়া যেমন আত্মসম্মান ক্ষুণ্ণ করে, তেমনি সব দায় অন্যের ওপর চাপানোও শেখার সুযোগ কমিয়ে দেয়। নিরপেক্ষভাবে ভাবুন কী শেখা হলো? ভবিষ্যতে কী ভিন্নভাবে করতে চান?
একাকিত্ব এড়িয়ে চলুন
একেবারে নিজেকে গুটিয়ে ফেললে মানসিক অবসাদ বাড়তে পারে। পরিবার, বন্ধু বা বিশ্বাসযোগ্য কারও সঙ্গে সময় কাটান। প্রয়োজনে পেশাদার কাউন্সেলরের সাহায্য নিন। নিজের ভেতরের কথাগুলো ভাগ করে নেওয়া মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে।
প্রতিশোধের মানসিকতা ত্যাগ করুন
প্রাক্তনকে কষ্ট দেওয়ার জন্য ইচ্ছাকৃত কিছু করা, গোপন তথ্য ফাঁস করা বা বদনাম ছড়ানো এসব আচরণ সাময়িক তৃপ্তি দিলেও দীর্ঘমেয়াদে নিজের ব্যক্তিত্ব ও সামাজিক অবস্থানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। প্রতিশোধ নয়, আত্মসম্মানই হোক অগ্রাধিকার।
নতুন সম্পর্কে তাড়াহুড়া নয়
শূন্যতা পূরণ করতে গিয়ে দ্রুত নতুন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়া অনেক সময় ‘রিবাউন্ড’ হয়ে যায়। এতে নিজের অনুভূতিও পরিষ্কার থাকে না, নতুন মানুষটির প্রতিও সুবিচার করা হয় না। আগে নিজেকে সময় দিন, সুস্থ হোন, তারপর নতুন পথচলা শুরু করুন।
নিজের যত্ন নিন
বিচ্ছেদের পর অনেকেই খাওয়া-দাওয়া, ঘুম বা দৈনন্দিন রুটিন অবহেলা করেন। কিন্তু এই সময়টাতেই শরীর ও মনের যত্ন নেওয়া জরুরি। নিয়মিত ঘুম, সুষম খাবার, হালকা ব্যায়াম ও শখের কাজ এসবই মানসিক স্থিতি ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করে।
স্মৃতিকে সম্মান করুন, আটকে থাকবেন না
একটি সম্পর্ক মানেই শুধু ব্যর্থতা নয়; সেখানে ভালো সময়ও ছিল। সেই স্মৃতিকে অস্বীকার করার দরকার নেই। তবে অতীতে আটকে না থেকে বর্তমানকে গুরুত্ব দিন। স্মৃতি থেকে শিক্ষা নিন, কিন্তু ভবিষ্যৎ থামিয়ে রাখবেন না।
আত্মসম্মানকে প্রাধান্য দিন
বারবার ফোন করা, অনুনয়-বিনয় করা বা অপমান সহ্য করে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার চেষ্টা অনেক সময় আত্মসম্মানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। যদি সম্পর্ক শেষ হয়ে যায়, তা মেনে নেওয়ার মধ্যেই পরিণত মানসিকতার পরিচয়।
সম্পর্ক ভাঙা মানে জীবনের শেষ নয়; এটি নতুন উপলব্ধির শুরু হতে পারে। সচেতনতা, ধৈর্য ও আত্মসম্মান এই তিনটি বিষয় মাথায় রাখলে বিচ্ছেদের কষ্ট ধীরে ধীরে সহনীয় হয়ে ওঠে। সময়ই সবচেয়ে বড় নিরাময়কারী। নিজেকে সময় দিন, যত্ন নিন এবং বিশ্বাস রাখুন ভবিষ্যতে আরও সুস্থ ও পরিণত সম্পর্ক আপনার জন্য অপেক্ষা করছে।
তথ্যসূত্র: ভেরি ওয়েল মাইন্ড, মেন্টাল হেলথ ফাউন্ডেশন (ইউকে)
জেএস/