কেন মধ্যবয়সে নারীরা বিচ্ছেদের কথা ভাবেন

লাইফস্টাইল ডেস্ক
লাইফস্টাইল ডেস্ক লাইফস্টাইল ডেস্ক
প্রকাশিত: ০১:৩২ পিএম, ১৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ছবি: এআই

বিয়ে হলো দুই মানুষের আজীবন একসঙ্গে থাকার অঙ্গীকারের সামাজিক স্বীকৃতি। একজন নারী ও একজন পুরুষ যখন ভালোবাসা, বিশ্বাস এবং পারস্পরিক প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে জীবন কাটানোর সিদ্ধান্ত নেন, তখন সেই সম্পর্কের আনুষ্ঠানিক রূপই হলো বিয়ে।

আর একসঙ্গে না থাকার সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটে ডিভোর্স বা তালাকের মাধ্যমে। ভালোবাসার রং যদি হয় গোলাপি বা লাল, তবে বিচ্ছেদের রং অনেক সময় ধূসর-নিঃশব্দ, ভারী এবং গভীর।

বিশেষ করে যখন দাম্পত্য জীবনের বয়স পনেরো, বিশ বা ত্রিশ বছর ছাড়িয়ে যায়, তখন বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত আরও জটিল হয়ে ওঠে। এত বছরের স্মৃতি, অভ্যাস, পারিবারিক বন্ধন এবং একসঙ্গে গড়ে তোলা জীবনের কাঠামো ছেড়ে বেরিয়ে আসা সহজ নয়। চুলে পাক ধরা দুই পরিণত মানুষের আলাদা হয়ে যাওয়ার এই সিদ্ধান্তকে বলা হয় গ্রে ডিভোর্স। এখানে বিচ্ছেদ মানে শুধু সম্পর্কের ইতি নয়, বরং জীবনের এক বড় অধ্যায়ের সমাপ্তি।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় এসেছে আরেকটি শব্দ‘মেনো ডিভোর্স’। এই ধারণার সঙ্গে গ্রে ডিভোর্সের কিছুটা মিল রয়েছে। দুই ক্ষেত্রেই সাধারণত বিচ্ছেদের ভাবনা আসে তখন, যখন একজন সঙ্গীর বয়স ৪৫ বা তার বেশি। তবে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য হলো, মেনোডিভোর্সে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত বা ভাবনা প্রধানত নারীদের দিক থেকেই উঠে আসে।

CGH

মেনো ডিভোর্স কী
মেনো ডিভোর্স বলতে বোঝায় পেরিমেনোপজ বা মেনোপজের সময় অনেক নারী নিজের জীবন ও সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে ভাবতে শুরু করেন এবং সেই ভাবনা থেকে দীর্ঘদিনের দাম্পত্য ছেড়ে বেরিয়ে আসার সিদ্ধান্ত নেন। জীবনের এই পর্যায়ে এসে তারা বুঝতে চান, তারা আসলে কী চান, কী পাচ্ছেন আর কী পাচ্ছেন না।

ব্রিটেনের সংস্থা ‘নুন’-এর এক সমীক্ষায় দেখা গেছে ৪৫ থেকে ৬৫ বছর বয়সি নারীদের মধ্যে প্রতি তিন জনে একজন বিবাহবিচ্ছেদের কথা ভাবছেন। প্রায় ৪৬ শতাংশ ক্ষেত্রে বিচ্ছেদের উদ্যোগও নিচ্ছেন নারীরাই। এই তথ্য দেখায়, মধ্যবয়সে এসে অনেক নারী নিজের সুখ-শান্তি ও মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি গুরুত্ব দিচ্ছেন।
মনোবিদরা বলেন, কম বয়সে বিয়ে করলে অনেকেই নিজের চাওয়া-পাওয়া ঠিকভাবে বোঝার আগেই সংসারে ঢুকে পড়েন। পরে বয়স ও অভিজ্ঞতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা নিজেদের নতুনভাবে চিনতে শেখেন। তখন কেউ কেউ অনুভব করেন, সম্পর্ক থেকে তারা প্রত্যাশিত মানসিক সমর্থন বা বোঝাপড়া পাচ্ছেন না।

মেনো ডিভোর্সের কারণ
মেনোডিভোর্সের পেছনে একক কোনো কারণ নেই বরং এটি শারীরিক, মানসিক ও সামাজিক নানা পরিবর্তনের সম্মিলিত প্রভাব। একজন নারী বহু বছর ধরে একসঙ্গে কাজ, সন্তান লালন-পালন এবং সংসার সামলাচ্ছেন। নিজের চাওয়া-পাওয়ার চেয়ে পরিবারকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন বেশি। তারপর আসে মধ্যবয়সের একটি সময়, যখন শরীর ও মনের ভেতরে বড় পরিবর্তন শুরু হয়।

মেনোপজ বা তার আগের পর্যায়ে ইস্ট্রোজেন ও প্রোজেস্টেরনের মাত্রা দ্রুত কমতে থাকে। ফলে ঘুমের সমস্যা, বিরক্তি, উদ্বেগ কিংবা বিষণ্ণতার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। এসব পরিবর্তন মানসিক শক্তিকে প্রভাবিত করে। আগে যে হতাশা বা অসন্তোষ সহজে সামলে নেওয়া যেত, এ সময় তা অনেক বেশি তীব্র মনে হতে পারে। ফলে দাম্পত্যের ভেতরের অমিল বা দূরত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলেন, মেনোপজই যে সরাসরি বিচ্ছেদের কারণ এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা কঠিন। বরং রজোনিবৃত্তির সময়টি জীবনের এমন এক অধ্যায়, যখন মানুষ নিজেকে নতুনভাবে মূল্যায়ন করেন। শরীরের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মনমেজাজেও আসে ওঠানামা। বহু বছরের দায়িত্ব সামলে যখন একটু স্থির হওয়ার সময়, তখনই এই শারীরিক ও মানসিক পরিবর্তন নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।

এর সঙ্গে যুক্ত হয় আরেকটি বাস্তবতা সন্তানদের বড় হয়ে আলাদা হয়ে যাওয়া। দীর্ঘদিন সম্পর্ককে ধরে রাখার যে ব্যস্ততা ও দায়িত্ব ছিল, তা কমে গেলে দাম্পত্যের প্রকৃত অবস্থাটা চোখে পড়ে। শরীর ও মনের পরিবর্তনের সঙ্গে লড়াই করে সংসার ও পেশা সামলানো কঠিন হয়ে ওঠে। এই সময় আবেগপ্রবণতা বাড়ে, আর বহুদিনের চাপা অসন্তোষ বা অপূর্ণতা সামনে চলে আসে।
ফলে কিছু নারীর মধ্যে স্বাধীনভাবে বাঁচার ইচ্ছা জাগে। তারা নিজেদের প্রয়োজন ও স্বপ্নকে গুরুত্ব দিতে চায়।

মেনো ডিভোর্স পরিস্থিতিকে সামলাবেন যেভাবেন
মনোবিদদের মতে, যেসব সম্পর্কের ভিত শুরু থেকেই মজবুত এবং যেখানে পারস্পরিক সম্মান ও বোঝাপড়া রয়েছে, সেসব দাম্পত্য এই কঠিন সময়ও পার করে উঠতে পারে।

প্রথমেই নিজের অনুভূতিগুলো চেপে না রেখে সঙ্গীর সঙ্গে শান্তভাবে ভাগ করে নেওয়া জরুরি। মেনোপজের সময় শরীর ও মনের পরিবর্তন সম্পর্কে দুজনেরই সচেতন হওয়া দরকার। হরমোনজনিত সমস্যার জন্য চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে। অনেক সময় শারীরিক উপসর্গ সামলানো গেলে মানসিক চাপও কমে আসে।

থেরাপি এ সময় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। দম্পতি থেরাপি সম্পর্কের অমিলগুলো বোঝাতে এবং সমাধানের পথ খুঁজতে সাহায্য করে। আবার ব্যক্তিগত কাউন্সেলিং নিজের অনুভূতি ও সিদ্ধান্ত পরিষ্কারভাবে বুঝতে সহায়তা করে। কখনো কখনো বাইরের একজন পেশাদারের নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্ককে নতুনভাবে দেখতে শেখায়।

সংসারের দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে ভাগ করে নেওয়াও জরুরি। বহু বছর ধরে এক পক্ষের ওপর বেশি চাপ থাকলে ক্ষোভ তৈরি হতে পারে। তাই কাজের ভারসাম্য আনতে হবে। পাশাপাশি একসঙ্গে সময় কাটানোর জন্য সহজ ডেট প্ল্যান, হাঁটাহাঁটি, কিংবা দুজনের পছন্দের কোনো শখের মতো ছোট ছোট উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

নিজের যত্ন নেওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম এবং মানসিক সচেতনতার চর্চা মনকে স্থির রাখতে সাহায্য করে। আবেগের ঝড়ের মধ্যে হঠাৎ সিদ্ধান্ত না নিয়ে সময় নিয়ে ভাবা উচিত। কারণ এই সময়ের অনুভূতি অনেক সময় সাময়িকও হতে পারে।

সূত্র: টাইমস অব ইন্ডিয়া

আরও পড়ুন:
‘হি ইজ নট মাই টাইপ’ বলার পর কেন তার সঙ্গে প্রেম হয়? 
ছোট ছোট ব্যাপারে ভালোবাসা প্রকাশই ভাইরাল প্রেমের ভাষা 

এসএকেওয়াই

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।