‘স্বপ্ন দেখেছিলাম সংসার গড়ার, অথচ লাশ দেখে ফিরতে হলো’
রোববার, বিকেল সাড়ে ৩টা। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রশাসনিক ভবনের বিপরীত পাশে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠসংলগ্ন সড়কে চোখে পড়ে সদ্য নির্মিত একাধিক স্মৃতিস্তম্ভ। ব্যস্ত নগরজীবনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা এসব স্তম্ভ যেন হঠাৎ করেই থামিয়ে দেয় পথচারীদের।
একটি স্মৃতিফলকে লেখা— এক মাস আগে বিবাহ করেছিলেন আজিজ। গার্মেন্টস শ্রমিক হিসেবে আন্দোলনের ভিডিও ধারণ করছিলেন। রাবার বুলেট এসে লাগে শরীরে। দুদিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়ে শেষ পর্যন্ত হার মানেন। স্ত্রীর কণ্ঠে বিষাদ— ‘স্বপ্ন দেখেছিলাম সংসার গড়ার, অথচ লাশ দেখে ফিরতে হলো।’
এটি কোনো নাটক বা সিনেমার গল্প নয়। এটি ২০২৪ সালের জুলাই–আগস্টের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে আত্মত্যাগকারী এক সাধারণ গার্মেন্টস শ্রমিকের বাস্তব জীবনগাথা। সেই উত্তাল দিনগুলোতে ঢাকার রাজপথে বুক পেতে দিয়েছিলেন আজিজ—যেখানে তার মতো আরও অসংখ্য মানুষের রক্তে ভিজে উঠেছিল শহরের পিচঢালা পথ।
শুধু আজিজ নন, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের পতনের আন্দোলনে জীবন উৎসর্গকারী বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষদের স্মরণে নির্মিত হয়েছে এসব স্মৃতিস্তম্ভ। প্রতিদিন এ পথে যাতায়াতকারী মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে স্তম্ভগুলো। অনেকেই থেমে দাঁড়িয়ে পড়ছেন শহীদদের জীবনের গল্প, কেউ কেউ নীরবে চোখ মুছছেন।
সরেজমিনে দেখা যায়, প্রতিটি স্মৃতিস্তম্ভ ধূসর বা কালো রঙের লম্বা বেদির ওপর স্থাপিত। শীর্ষে রয়েছে একটি লাল বৃত্ত—যেন বাংলাদেশের পতাকার লাল সূর্যের প্রতিচ্ছবি, শহীদদের রক্তের প্রতীক। বেদির মাঝখানে কালো পাথরে সাদা হরফে লেখা শহীদদের পরিচয়, মৃত্যুর তারিখ এবং স্বজনদের বুকফাটা আর্তনাদের কিছু কথা।

যাদের রক্তে ভিজে ছিল রাজপথ
শহীদ বিজয়
মাত্র ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র ছিল বিজয়। ২৩ আগস্ট বন্ধুদের সঙ্গে আন্দোলনে গিয়ে মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়। ১৪ দিন আইসিইউতে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে শেষ পর্যন্ত হার মানে এই কিশোর। তার মা সাহিদা আজও ছেলের ফেরার অপেক্ষায় পথ চেয়ে বসে থাকেন।
শহীদ মায়া ইসলাম
একজন গৃহিণী। ১৯ জুলাই রামপুরা বনশ্রী এলাকায় বাসার নিচে দাঁড়িয়ে থাকার সময় গুলিবিদ্ধ হন। পরদিন সকালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন।
শহীদ মো. সবুজ
অতিদরিদ্র কৃষক পরিবারের সন্তান। সিএনজি চালিয়ে সংসার চালাতেন। সদ্য বিবাহিত সবুজ স্ত্রীকে নিয়ে মোহাম্মদপুরে বসবাস করতেন। ৪ আগস্ট আন্দোলনের সময় বিজিবির গুলিতে চোখে আঘাত পান। তিন ঘণ্টা লাইফ সাপোর্টে থাকার পর শহীদ হন।
তার মায়ের কান্না— ‘আমি সব দিয়ে বড় করেছি ওরে। আগে বড় ছেলেটা মরার কথা ছিল, ছোটটাই আগে গেল।’
শহীদ কবির
একজন গার্মেন্টস কর্মী। দুই ভাইয়ের মধ্যে বড়। বাবা-মা ও ছোট ভাইকে নিয়ে ভালোভাবে বেঁচে থাকার স্বপ্নে গার্মেন্টসে কাজ নেন। ১৯ জুলাই বিকেলে আন্দোলনে গিয়ে মাথায় গুলিবিদ্ধ হন। ঢাকা মেডিকেলে নেওয়ার পর শহীদ হন।

শহীদ আল-হামীম সায়মন
পরিবারের একমাত্র ছেলে। স্বপ্ন ছিল উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে মা–বাবার দায়িত্ব নেওয়ার। দেশের প্রয়োজনে ১৮ জুলাই হাসিমুখে নিজের জীবন বিলিয়ে দেন।
শহীদ মো. শাকিল
সদাচারী ও পরোপকারী যুবক। অতিদরিদ্র কৃষক পরিবারের ছোট ছেলে। মোহাম্মদপুরের বসিলায় একটি মিষ্টির কারখানায় কাজ করতেন। ২০ জুলাই আন্দোলনের সময় র্যাবের গুলিতে গুরুতর আহত হন। হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তার মায়ের কান্না এখনো থামেনি।
শহীদ মোহাম্মদ বাবুল হাওলাদার
পেশায় রংমিস্ত্রি। স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে সুখের সংসার ছিল। ১৯ জুলাই ছেলেদের সঙ্গে বিক্ষোভে অংশ নিয়ে গলায় গুলিবিদ্ধ হন। ১১ দিন আইসিইউতে থাকার পর ২৮ জুলাই শহীদ হন। জানাজা শেষে আজিমপুর কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।
রাজপথের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা এই স্মৃতিস্তম্ভগুলো কেবল পাথরের ফলক নয়—এগুলো সময়ের সাক্ষ্য, রাষ্ট্রের দায় আর শহীদদের রক্তে লেখা ইতিহাস। যে ইতিহাস প্রতিদিন পথচারীদের মনে করিয়ে দেয়—স্বাধীনতা ও ন্যায়ের মূল্য কতটা ভয়াবহ রক্তের।
এমইউ/এমআইএইচএস/এমএস