ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত

আন্তর্জাতিক আইনের পক্ষে ফ্রান্স–বাংলাদেশের অভিন্ন অবস্থান

কূটনৈতিক প্রতিবেদক কূটনৈতিক প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ১২:৪১ পিএম, ২৬ জানুয়ারি ২০২৬
বাংলাদেশে নিযুক্ত ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-শার্লেট/ফাইল ছবি

বাংলাদেশ ও ফ্রান্স শান্তিপ্রিয় দেশ হিসেবে আন্তর্জাতিক আইন, বহুপাক্ষিকতা এবং সহযোগিতাভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থার পক্ষে অভিন্ন অবস্থানে রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জ্যঁ-মার্ক সেরে-শার্লেট।

তিনি বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় একতরফা শক্তির ব্যবহার নয়, বরং পারস্পরিক সহযোগিতায় শান্তি ও স্থিতিশীলতার একমাত্র পথ।

সেন্টার ফর বে অব বেঙ্গল স্টাডিজ এবং ডিপার্টমেন্ট অব গ্লোবাল স্টাডিজ অ্যান্ড গভর্নমেন্টের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘ফ্রান্স ও বিশ্বব্যবস্থা: তাতে বাংলাদেশের অবস্থান’ শীর্ষক লেকচার অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন তিনি।

রাষ্ট্রদূত বলেন, ফ্রান্স ও বাংলাদেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের সময় নবাবের সঙ্গে ফ্রান্সের সংশ্লিষ্টতা, চন্দননগরে ফরাসি বাণিজ্যকেন্দ্র এবং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের পক্ষে ফরাসি বুদ্ধিজীবীদের অবস্থান এসবই দুই দেশের সম্পর্কের সাক্ষ্য বহন করে।

তিনি বিশেষভাবে স্মরণ করেন ফ্রান্সের সাবেক সংস্কৃতিমন্ত্রী আন্দ্রে মালরোকে, যিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। এছাড়া তিনি ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রোঁ ও সাবেক প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া মিতেরাঁর বাংলাদেশ সফরের কথাও উল্লেখ করেন।

রাষ্ট্রদূত বলেন, ফ্রান্স ও বাংলাদেশ উভয়ই শান্তিপ্রিয় দেশ। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র নীতি ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও প্রতি বৈরিতা নয়’ ফ্রান্সের কূটনৈতিক দর্শনের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ।

তিনি বলেন, দুই দেশই বহুপাক্ষিকতা ও জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমের দৃঢ় সমর্থক। ফ্রান্স জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং বাংলাদেশ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে।

রাষ্ট্রদূত জানান, ভৌগোলিক দূরত্ব সত্ত্বেও ফ্রান্স ও বাংলাদেশ প্রতিবেশী, কারণ ফ্রান্স ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের একটি দেশ। এ অঞ্চলে প্রায় ১৮ লাখ ফরাসি নাগরিক বসবাস করেন।

তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, সামুদ্রিক নিরাপত্তা ও পরিবেশ সংরক্ষণে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ফ্রান্স ও বাংলাদেশের যৌথ সহযোগিতার বড় সুযোগ রয়েছে।

বক্তব্যে রাষ্ট্রদূত বলেন, বৈশ্বিক কৌশলগত পরিবেশ দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এক বছর আগের বাস্তবতা আজ আর একই নাও থাকতে পারে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ–পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থা আন্তর্জাতিক আইন ও বহুপাক্ষিকতার ওপর দাঁড়ালেও বর্তমানে বিশ্ব ক্রমবর্ধমান সহিংসতা ও একতরফা শক্তি প্রয়োগের মুখোমুখি।

রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ, একতরফা নিষেধাজ্ঞা, বাণিজ্যযুদ্ধ এবং বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের সংঘাতকে তিনি এই বাস্তবতার উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন। ইউরোপে ভুয়া তথ্য, সাইবার হামলা ও মনস্তাত্ত্বিক চাপের মাধ্যমে পরিচালিত হাইব্রিড যুদ্ধ নতুন উদ্বেগের কারণ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

রাষ্ট্রদূত বলেন, এই পরিস্থিতিতে বিশ্ববাসীর সামনে তিনটি পথ রয়েছে-সবকিছু মেনে নেওয়া, নিজেদের নীতিমালা ত্যাগ করা অথবা দৃঢ়ভাবে দাঁড়িয়ে সহযোগিতা জোরদার করা। ফ্রান্স তৃতীয় পথেই বিশ্বাস করে।

তিনি জোর দিয়ে বলেন, আন্তর্জাতিক আইন মৃত নয়। এর প্রতিষ্ঠানগুলো সংস্কারের প্রয়োজন হলেও এর মূলনীতিগুলো এখনো সঠিক ও প্রাসঙ্গিক। ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের অধিকার ও মধ্যপ্রাচ্যে শান্তির প্রশ্নে ফ্রান্স ও বাংলাদেশ একই অবস্থানে রয়েছে।

রাষ্ট্রদূত বলেন, দুই দেশের জনগণের মধ্যে পারস্পরিক জানাশোনা বাড়ানো জরুরি। ফ্রান্সে বাংলাদেশ সম্পর্কে যেমন সীমিত ধারণা রয়েছে, তেমনি বাংলাদেশেও ফ্রান্স সম্পর্কে জানাশোনা তুলনামূলকভাবে কম।

এই দূরত্ব কমাতে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও কৌশলগত সহযোগিতা জোরদারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন তিনি। তিনি বলেন, সহযোগিতাই একমাত্র পথ, একতরফা শক্তি নয়।

জেপিআই/এমআরএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।