সংসদ নির্বাচন
চলছে গাড়ি রিকুইজিশন, খরচ বহনের নিশ্চয়তা পাচ্ছেন না মালিক
মুসা আহমেদ মুসা আহমেদ
প্রকাশিত: ০৭:৩৩ পিএম, ২৯ জানুয়ারি ২০২৬
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এরই মধ্যে প্রায় সব কাজ সম্পন্ন করেছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। বিশাল এ কর্মযজ্ঞের শেষ নামাতে প্রচুর সংখ্যক গাড়ি প্রয়োজন হয়, যা রিকুইজিশনের মাধ্যমে সংগ্রহ করে প্রশাসন। রিকুইজিশন শুরু হলেও চালকের বেতন, তেলসহ আনুষঙ্গিক খরচ কে বহন করবে সে নিশ্চয়তা পাচ্ছেন না মালিকরা।
নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে প্রায় তিন হাজার একশ কোটি টাকা বাজেট নির্ধারণ করেছে ইসি। তবে অভিযোগ রয়েছে, নির্বাচনের কাজে ব্যবহারের জন্য ৬৪ জেলাতেই গাড়ি সংগ্রহ বা রিকুইজিশন করছে জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। কিন্তু রিকুইজিশন করা গাড়িগুলোর মালিকের দৈনিক আয়, চালক ও কর্মীদের বেতন দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো নিশ্চয়তা দিচ্ছে না তারা। পুলিশ শুধু প্রতিটি গাড়ির চালককে রিকুইজিশন স্লিপ ধরিয়ে দিচ্ছে। এতে অন্তত ৪০ কোটি টাকা আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন পরিবহন মালিকেরা। এর প্রতিকার চেয়ে ইসিকে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতি।
তবে ইসির সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্বাচনে যাবতীয় খরচ বহনে সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসনকে দেওয়া হয়েছে। সেখান থেকে বাস ভাড়াসহ পরিবহন শ্রমিকরা মজুরি পাবেন। তারপরও কোথাও কোনো ব্যত্যয় ঘটলে ব্যবস্থা নেবে ইসি।
ইসিকে পরিবহন মালিক সমিতির চিঠি
২৭ জানুয়ারি জাতীয় নির্বাচন উপলক্ষে রিকুইজিশন করা বাসের ক্ষতিপুরণ চেয়ে ইসি সচিব বরাবর চিঠি দেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব সাইফুল আলম। ওই চিঠিতে বলা হয়, পুলিশ ও ডিসিদের মাধ্যমে ৬৪ জেলাতেই জাতীয় নির্বাচন উপলক্ষে সাধারণ মালিকদের গাড়ি রিকুইজিশন করছে। রিকুইজিশন করা গাড়িগুলোর মালিকের দৈনিক আয়, চালক ও স্টাফদের বেতন দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো নিশ্চয়তা দিচ্ছে না। পুলিশ শুধু প্রতিটি গাড়ির চালককে রিকুইজিশন স্লিপ ধরিয়ে দিচ্ছে। অথচ প্রতিটি গাড়িই ব্যাংক বা লিজিং কোম্পানি থেকে কিস্তিতে কেনা হয়েছে।

ওই চিঠিতে আরও বলা হয়, রিকুইজিশন করা গাড়ির মালিকদের দৈনিক আয় ও শ্রমিকদের বেতন, তেলের টাকা নগদ দিতে হবে। অন্যথায়, রিকুইজিশন করা গাড়ি সময়মতো সব জায়গায় পাঠানোর ক্ষেত্রে মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা দেখা দিতে পারে। এমতাবস্থায়, অবিলম্বে রিকুইজিশন করা গাড়ির ক্ষতিপূরণের যথাযথ বরাদ্দ দিয়ে এ বিষয়ে পুলিশ ও জেলা প্রশাসকদের নির্দেশ দিতে অনুরোধ জানানো হয়। যাতে মালিক ও শ্রমিকেরা জানতে পারে, রিকুইজিশনে থাকাকালীন তারা কী কী সুবিধা পাবে।
রিকুইজিশন নিয়ম অনুযায়ী চালক ও তার সহকারী খোরাকি পাবে। বাসের তেলও দেওয়া হয়। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী পুলিশ রিকুইজিশন করছে। এসব বাস নির্বাচন কমিশনের কাছে হস্তান্তর করা হবে। কমিশন নির্বাচনের কাজে বাসগুলো ব্যবহার করবে।-ট্রাফিক রমনার পরিবহন বিভাগের রিকুইজিশন শাখার ইনচার্জ মোস্তফা কামাল
পরিবহন মালিক সমিতি সূত্র জানায়, পুলিশ রিকুইজিশন স্লিপ ধরিয়ে দিয়ে আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে বাস চাচ্ছে। এরই মধ্যে অনেক জেলায় বাস নিয়ে গেছে। তবে অধিকাংশজনকে বলা হয়েছে, আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি থেকে যেন বাস নিয়ে নির্ধারিত স্থানে হাজির হয়। এমন অবস্থায় যদি পাঁচ বা সাতদিনের জন্য গাড়িগুলো রিকুইজিশন করা হয় সেক্ষেত্রে এসব গাড়ির মালিকরা আর্থিকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হবে।
বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির দপ্তর সম্পাদক কাজী জুবায়ের মাসুদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘পুলিশ ও জেলা প্রশাসক নির্বাচনের কাজে প্রায় তিন হাজার বাস রিকুইজিশন করতে পারে বলা ধারণা করছে মালিক সমিতি। এ হিসাবে পাঁচ থেকে সাতদিন বাসগুলো নির্বাচনের কাজে ব্যবহার করলে প্রায় ৪০ কোটি টাকা আর্থিক ক্ষতি হবে। এমন ক্ষতির আশঙ্কায় সারা দেশ থেকে মালিক সমিতির সঙ্গে যোগাযোগ করছেন মালিকেরা। তাই মালিক সমিতি থেকে ইসিকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। আশাকরি ইসি এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে।
আরও পড়ুন
সহিংসতা-আচরণবিধি লঙ্ঘনে উত্তপ্ত নির্বাচনি মাঠ, নির্বিকার ইসি
নির্বাচনি ইশতেহারে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় স্পষ্ট প্রতিশ্রুতি আবশ্যক
নির্বাচন ঘিরে চাহিদা বেড়েছে হ্যান্ড মাইকের
ইসি সূত্র জানায়, বুধবার (২৮ জানুয়ারি) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঠিক কত টাকা খরচ হবে, তার একটি হিসাব সাংবাদিকদের জানান ইসির জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ। তিনি জানান, আসন্ন নির্বাচনে বাজেট ধরা হয়েছে ৩ হাজার ১শ কোটি টাকা। এর মধ্যে নির্বাচন পরিচালনা ব্যয় ১ হাজার ২শ কোটি টাকা। আইনশৃঙ্খলায় ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ৪শ কোটি টাকা। এছাড়া পোস্টাল ভোট, গণভোট ও অন্যান্য মিলিয়ে ৫শ কোটি টাকা ব্যয় ধরে এগোচ্ছে কমিশন।
রিকুইজিশন করা বাসের ভাড়ায় বরাদ্দ আছে কি না, তা জানতে ২৮ জানুয়ারি ও ২৯ জানুয়ারি বেশ কয়েকবার ইসির জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদকে কল দেন এই প্রতিবেদক। কিন্তু তিনি কল রিসিভ করেননি। হোয়াটসঅ্যাপে প্রশ্ন করা হলেও কোনো উত্তর দেননি।
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ইসির এক কর্মকর্তা জানান, নির্বাচন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, প্রিসাইডিং কর্মকর্তা, সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তাসহ প্রায় লাখো সদস্য সংশ্লিষ্ট আসনে দায়িত্ব পালন করবেন। কিন্তু তাদের যাতায়াতে পর্যাপ্ত পরিবহন নেই। এ কারণে পুলিশ বাস রিকুইজিশন করছে। এসব যানবাহনের তেল খরচের জন্য ইসির বাজেট রয়েছে। যথাযথভাবেই সব জেলায় বাজেট পাঠানো হচ্ছে। নির্বাচনের নির্ধারিত দিনের আগেই সব খরচ সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন কার্যালয়ে পাঠানো হবে।
জাতীয় নির্বাচনে জনসাধারণের স্বার্থে ও সরকারি কাজের জন্য গত ১৫ জানুয়ারি ৩২ আসনের গাজীপুর-ব-১১-০০০৬ নম্বরের একটি বাস রিকুইজিশন করে পুলিশের রমনা ট্রাফিক বিভাগ। গাড়িটিকে আগামী ৭ ফেব্রুয়ারি বিকাল ৩টায় রাজারবাগ পুলিশ লাইন্স মাঠে উপস্থিত হতে নোটিশ দেওয়া হয়।
ওই বাসটির মালিক মো. ফরিদ হোসেন। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, তার মালিকানাধীন দুটি বাস ঢাকা থেকে গাজীপুরে যাত্রী পরিবহন করে। নির্বাচন উপলক্ষে একটি বাস ঢাকার রমনায় এবং আরেকটি বাস গাজীপুরের পুলিশ রিকুইজিশন করেছে। কিন্তু কোনোটিতেই ভাড়া, চালকের বেতন, তেল খরচ দেওয়ার বিষয়ে কিছু বলেনি।
একইভাবে ২০২৪ সালে জাতীয় নির্বাচনে দুটি বাস পুলিশ রিকুইজিশন করেছিল। তখনও তেল খরচ দেয়নি। তিনি বলেন, সরকারি কাজে বাস লাগলে অবশ্যই পুলিশ তা নিতে পারে। অন্তত তেল খরচ ও চালকের বেতনটাতো তারা দিতে পারে। কিন্তু কোনো সময়ই পুলিশ তা করে না। এতে কোটি কোটি টাকা ক্ষতির সম্মুখীন হন মালিকেরা।
ঢাকা মহানগর পুলিশের পক্ষে ফরিদ হোসেনের ওই বাসটি রিকুইজিশন করেন ট্রাফিক রমনার পরিবহন বিভাগের রিকুইজিশন শাখার ইনচার্জ মোস্তফা কামাল। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘রিকুইজিশন নিয়ম অনুযায়ী চালক ও তার সহকারী খোরাকি পাবে। বাসের তেলও দেওয়া হয়। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী পুলিশ রিকুইজিশন করছে। এসব বাস নির্বাচন কমিশনের কাছে হস্তান্তর করা হবে। কমিশন নির্বাচনের কাজে বাসগুলো ব্যবহার করবে।’
বুধবার (২৯ জানুয়ারি) নির্বাচনের বাজেট নিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন ইসির অতিরিক্ত সচিব কে এম আলী নেওয়াজ। তিনি জানান, সব মিলিয়ে সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের জন্য তিন হাজার ১৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছি। একই সঙ্গে অর্থ আমরা গণভোটের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যালট পেপার, কর্মী, যাতায়াত, খোরাকি, খামসহ নির্বাচনি সামগ্রী বাবদ খরচ করছি।
তবে এ খরচের মধ্যে রিকুইজিশন করা যানবাহনের ভাড়াসহ অন্য খরচ আছে কি না, তা বিস্তারিত জানাননি তিনি।
নির্বাচন কমিশন সূত্র জানায়, ব্যয়ের খাত বিশ্লেষণে দেখা যায়, সরকারি যানবাহনের জ্বালানি তেলে ব্যয় হবে ২৯৮ কোটি টাকা এবং চুক্তিভিত্তিক যানবাহন ব্যবহারে ব্যয় ধরা হয়েছে ২০১ কোটি টাকা। এর মধ্যে রিকুইজিশন করা যানবাহনের তেলের খরচও রয়েছে। তবে আইনে বাসের ভাড়া দেওয়ার সুযোগ নেই। বাস রেজিস্ট্রেশন করার সময় রেজিস্ট্রেশন পেপারে লেখা থাকে, ‘সরকারের প্রয়োজনে যে কোনো সময় যানবাহন সরকারকে দিতে বাধ্য থাকিবে।’
এমএমএ/এএসএ