সহিংসতা-আচরণবিধি লঙ্ঘনে উত্তপ্ত নির্বাচনি মাঠ, নির্বিকার ইসি
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণা শুরু হওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা, হামলা ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এসব ঘটনায় প্রায় প্রতিদিনই বিভিন্ন দল ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের আহত হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। সবশেষ বুধবার (২৮ জানুয়ারি) শেরপুরে নির্বাচনি সহিংসতায় নিহত হয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর এক নেতা।
আচরণবিধি লঙ্ঘনসহ নানা অভিযোগ নিয়ে প্রায় প্রতিদিনই সংশ্লিষ্টরা নির্বাচন কমিশনের (ইসি) দ্বারস্থ হচ্ছেন। এরই মধ্যে আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে সারাদেশে অর্ধশতাধিক প্রার্থী ও সমর্থককে জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। নির্বাচনি মাঠে এমন উত্তেজনা বাড়ার প্রেক্ষাপটে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও ভোটের পরিবেশ নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শেরপুরে নির্বাচনি ইশতেহার অনুষ্ঠানে বিএনপির সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হন শ্রীবরদী উপজেলা জামায়াতের সেক্রেটারি মাওলানা রেজাউল করিম। বুধবার (২৮ জানুয়ারি) রাত ১০টার দিকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন জেলা জামায়াতের আমির মাওলানা হাফিজুর রহমান।
এর আগের দিন মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে রাজধানীর হাবিবুল্লাহ বাহার কলেজে ঢাকা-৮ আসনের ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ও তার লোকজনের ওপর হামলা করা হয়।
সোমবার (২৬ জানুয়ারি) সকালে ঢাকা-১৮ আসনে ১১ দলীয় জোটের প্রার্থী ও এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীবের ওপরও হামলা চালানো হয়। স্থানীয় ৪৩ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি দিদার মোল্লার নেতৃত্বে এ হামলা করা হয় বলে এনসিপি অভিযোগ করেছে। ওই সময় আদীব ওই এলাকায় গণসংযোগ করছিলেন।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে বিএনপি।
এছাড়া বাগেরহাট-১, ২ ও ৩ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী (ঘোড়া প্রতীক) এম এ এইচ সেলিমের এক কর্মীর ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে।
একই সঙ্গে ঢাকা-১৬ আসনে জামায়াতের প্রার্থী ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ করেছেন বিএনপির প্রার্থী ও দলটির ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক আমিনুল হক। তিনি অভিযোগ করে বলেন, ‘জামায়াত প্রার্থী ও তার সহযোগীরা টাকা দিয়ে ভোট কেনার চেষ্টা করছেন এবং বিএনপির নাম ব্যবহার করে ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে জনগণকে বিভ্রান্ত করছেন।’
অভিযোগ অস্বীকার করে ঢাকা-১৬ আসনের জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী কর্নেল (অব.) মো. আব্দুল বাতেন বলেন, ‘এই আসনের মানুষ পরিবর্তন চান—চাঁদাবাজি ও দখলদারিমুক্ত দেশ চান। আমি একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা। টাকা দিয়ে ভোট কেনার প্রশ্নই ওঠে না। আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা।’
আরও পড়ুন
নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হামলার অভিযোগ
শেরপুরে বিএনপির সঙ্গে সংঘর্ষে জামায়াত নেতা নিহত
শেরপুরে নির্বাচনি ইশতেহার অনুষ্ঠানে বিএনপি-জামায়াত সংঘর্ষ, আহত অর্ধশত
‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারণা করায় পল্লী বিদ্যুতের কর্মচারীকে যুবদলের মারধর
একই দিন নাটোর ও নড়াইলে বিএনপি ও ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীদের নির্বাচনি সরঞ্জাম পোড়ানোর অভিযোগ পাওয়া যায়। ভোলা, লালমনিরহাট ও চুয়াডাঙ্গায় বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে।
ইসি সূত্রে জানা গেছে, প্রতিদিনই আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ আসছে। এসব অভিযোগে শোকজ ও জরিমানার পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান চলছে। প্লাস্টিক লেমিনেটেড রঙিন পোস্টার ব্যবহার, দুপুর ২টার আগে ও রাত ৮টার পর উচ্চশব্দে মাইক বাজানো, মোটর শোভাযাত্রা ও ট্রাক মিছিলের মাধ্যমে শক্তি প্রদর্শনের মতো ঘটনা ঘটছে, যা সরাসরি নির্বাচনি আচরণবিধির লঙ্ঘন। তফসিল ঘোষণার পর প্রচার শুরুর আগেও একই চিত্র দেখা গেছে।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে ইসি সচিব আখতার আহমেদ জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমরা মোটেই নির্ভার নই। নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড রয়েছে।’
তিনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট রিটার্নিং কর্মকর্তা ও ইলেকটোরাল ইনকোয়ারি অ্যান্ড অ্যাডজুডিকেশন কমিটিতে অভিযোগ করার পরামর্শ দেন।
ইসি সচিব আরও বলেন, ‘আপনারা সেখানে অভিযোগ জানান, আমাদের কপি দিন—ফলো করবো। কিন্তু আমাকে যদি বলা হয় ঘুরে ঘুরে গিয়ে দেখার জন্য, তাহলে সেটি আমার প্রতি মিসক্যারেজ অব জাস্টিস হবে।’
বিএনপি জানায়, পরিকল্পিতভাবে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা চলছে। দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস বলেছেন, ‘ভয় পেয়ে কিছু দল আমাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছে। ক্ষমতায় যাওয়ার আগেই প্রোপাগান্ডা ও অপপ্রচারের মাধ্যমে আমাদের দোষী সাব্যস্ত করার চেষ্টা চলছে।’
শেরপুরে বুধবার বিএনপি-জামায়াতের নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ/ ফাইল ছবি
সম্প্রতি প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাডভোকেট এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘গত কয়েক দিনে বিভিন্ন জায়গায় আচরণবিধি লঙ্ঘন ও হামলার ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। এগুলো নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে নির্বাচনের আগ পর্যন্ত পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।’ তিনি নারী কর্মীদের হেনস্তা ও হামলার বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
এদিকে দলের নেতাকর্মীদের ওপর হামলার দায় বিএনপির ওপর চাপিয়ে এনসিপির কুমিল্লা-৪ আসনের প্রার্থী ও দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ বলেছেন, ‘ঢাকা-১৮ আসনে যেভাবে আমাদের প্রার্থী আরিফুল ইসলাম আদীবের ওপর হামলা হয়েছে, তাতে মনে হচ্ছে আজই প্র্যাকটিস ম্যাচ শুরু হলো। বিএনপি যদি শুরুতেই এভাবে বিরোধী প্রার্থীদের ওপর হামলা করে, তাহলে পুরো নির্বাচনের জন্যই এটি নেতিবাচক বার্তা।’
ইসির হিসাব অনুযায়ী, ৮ জানুয়ারি থেকে ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত ১২৮টি নির্বাচনি এলাকায় আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় অভিযান চালানো হয়। এসময় ৯৪টি মামলায় মোট ৯ লাখ ৫ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। কয়েকটি ঘটনায় কারাদণ্ডের আদেশও দেওয়া হয়েছে। এসময়ে মোট আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা ছিল ১৪৪টি।
আরও পড়ুন
কদমতলীতে গণসংযোগে জামায়াত নেত্রীর মাথায় কোপ
নেত্রকোনায় স্বতন্ত্র প্রার্থীর প্রচারে হামলার অভিযোগ, আহত ১০
যে কোনো ঘটনায় তারেক রহমানের নাম জড়ানো ফ্যাসিবাদী সংস্কৃতির প্রতিফলন: মাহদী আমিন
শেরপুর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি স্থগিত
তারেক রহমানের প্রতি মানুষ আশা দেখতে পাচ্ছে: মির্জা ফখরুল
নির্বাচন বিশ্লেষক ড. আব্দুল আলীম বলেছেন, বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখনো সন্তোষজনক নয়। দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে ভোটারদের আস্থা ফেরানো কঠিন হবে।
নির্বাচন কমিশনার আনোয়ারুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের মাঠ পর্যায়ে প্রত্যেক আসনে ভ্রাম্যমাণ আদালত এবং ইলেক্টোরাল ইনকোয়ারি ও বিচারক কমিটি আছে। আমাদের যুগ্ম জেলা জজ পর্যায়ের বিচারক আছেন। তারা তাৎক্ষণিকভাবে সেগুলো আমলে নিচ্ছেন। তারা বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। মোবাইল কোর্ট প্রতিদিনই তারা পরিচালনা করছেন এবং প্রতিদিনই আমরা রিপোর্ট পাচ্ছি যে মিনিমাম ৫০–৬০টি কেস রুজু হচ্ছে। কোথাও জরিমানা হচ্ছে, কোথাও সাজা হচ্ছে। মানে কার্যক্রম জোরেশোরে চলছে।’
এসএম/এমআইএইচএস/এমএমএআর