স্টেফান লিলার

বাংলাদেশে নারী প্রার্থী ও সাংবাদিকরা প্রযুক্তিনির্ভর সহিংসতার শিকার

কূটনৈতিক প্রতিবেদক কূটনৈতিক প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৯:৩৯ পিএম, ০১ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
অনুষ্ঠানে আসন্ন জাতীয় নির্বাচন বিষয়ে কথা বলেন ইউএনডিপি আবাসিক প্রতিনিধি স্টেফান লিলার/ছবি: জাগো নিউজ

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে নারী প্রার্থী, রাজনৈতিক কর্মী ও সাংবাদিকরা অসম মাত্রায় প্রযুক্তিনির্ভর লিঙ্গভিত্তিক সহিংসতার শিকার হচ্ছেন বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) আবাসিক প্রতিনিধি স্টেফান লিলার।

তিনি বলেন, অনলাইন হয়রানি, ভয়ভীতি, যৌন হয়রানিমূলক বিভ্রান্তি ও ডক্সিং (অনুমতি ছাড়া অন্যের ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ করা)-এর মতো আক্রমণ নারীদের কণ্ঠরোধ করতে এবং রাজনৈতিক ও গণমাধ্যমে তাদের অংশগ্রহণ নিরুৎসাহিত করার উদ্দেশে পরিচালিত হচ্ছে।

রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) রাজধানীর একটি হোটেলে ডিপ্লোম্যাটিক করেসপন্ডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ (ডিক্যাব) আয়োজিত নির্বাচন প্রতিবেদন বিষয়ক দুদিনব্যাপী প্রশিক্ষণের সমাপনী অধিবেশনে তিনি এসব কথা বলেন। প্রশিক্ষণটি ইউএনডিপি ও মিডিয়া রিসোর্সেস ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভের (এমআরডিআই) সহযোগিতায় অনুষ্ঠিত হয়।

স্টেফান লিলার বলেন, লিঙ্গসমতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণ গণতান্ত্রিক বৈধতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। কিন্তু বাস্তবতা হলো—নারী প্রার্থী, রাজনৈতিক কর্মী ও সাংবাদিকরা অসমমাত্রায় প্রযুক্তিনির্ভর সহিংসতার শিকার হচ্ছেন, যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার জন্য উদ্বেগজনক।

ডক্সিংয়ের ব্যাখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, কারও ব্যক্তিগত ও পরিচয় সংক্রান্ত তথ্য—যেমন বাসার ঠিকানা, ফোন নম্বর বা কর্মস্থলের তথ্য অনুসন্ধান করে প্রকাশ করা হয় মূলত হয়রানি, ভয়ভীতি বা ক্ষতির উদ্দেশে। এ ধরনের আক্রমণ নারীদের জনপরিসর থেকে সরিয়ে দেওয়ার কৌশল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, এসব আক্রমণের উদ্দেশ্য হলো নারীদের কণ্ঠরোধ করা এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণে নিরুৎসাহিত করা। এ ক্ষতিকর প্রবণতাগুলো প্রকাশ্যে আনার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

নির্বাচন প্রতিবেদন প্রসঙ্গে ইউএনডিপির এই আবাসিক প্রতিনিধি বলেন, নির্বাচন সংক্রান্ত প্রতিবেদন শুধু জাতীয় পরিসরে সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব আন্তর্জাতিক পর্যায়েও পড়ে।

তিনি নির্বাচন প্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রে তিনটি মৌলিক বিষয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেন—সঠিকতা, নিরপেক্ষতা ও নৈতিক বিচারবোধ।

স্টেফান লিলার বলেন, বাংলাদেশের সাংবাদিকদের প্রতিবেদন কূটনীতিক, আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক, উন্নয়ন অংশীদার, বিনিয়োগকারী এবং বৈশ্বিক গণমাধ্যম নিবিড়ভাবে অনুসরণ করে। ফলে নির্বাচন সংক্রান্ত বয়ান আন্তর্জাতিক আস্থা, কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা এবং একটি দেশের ভাবমূর্তি ও গণতান্ত্রিক পরিপক্বতা সম্পর্কে ধারণাকে প্রভাবিত করে।

তার ভাষ্য, এ কারণেই কূটনৈতিক প্রেক্ষাপটে নির্বাচন কভার করা সাংবাদিকদের ওপর বিশেষ দায়িত্ব বর্তায়। দায়িত্বশীল প্রতিবেদন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুহূর্তগুলোকে একটি বৈধ ও নিয়মভিত্তিক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে তুলে ধরতে সহায়তা করে।

তিনি বলেন, নির্বাচন প্রক্রিয়া গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার অন্যতম প্রযুক্তিগত ও রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল উপাদান। এর সঙ্গে জড়িত থাকে জটিল আইনগত কাঠামো, নির্বাচনি আচরণবিধি, ভোটার ও প্রার্থীর বিধিবিধান, ফলাফল গণনা পদ্ধতি এবং অভিযোগ ও বিরোধ নিষ্পত্তির ব্যবস্থা।

স্টেফান লিলার বলেন, সাংবাদিকরা প্রতিষ্ঠান ও নাগরিকদের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করেন। নির্বাচন প্রক্রিয়া যখন স্পষ্ট, সঠিক ও দায়িত্বশীলভাবে উপস্থাপিত হয়, তখন নাগরিকরা শুধু কী ঘটছে তা নয়, বরং কেন ও কীভাবে ঘটছে তা-ও ভালোভাবে বুঝতে পারেন।

তিনি সতর্ক করে বলেন, তীব্র রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার সময় ভুল তথ্য বা অস্পষ্ট প্রতিবেদন অনিচ্ছাকৃতভাবে উত্তেজনা বাড়াতে পারে এবং নির্বাচনি ফলাফলের ওপর জনআস্থা ক্ষুণ্ন করতে পারে।

তথ্যের সততা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা প্রসঙ্গে লিলার বলেন, বিশ্বজুড়ে নির্বাচন পরিস্থিতি ক্রমেই ভুয়া তথ্য, বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা, ঘৃণামূলক বক্তব্য এবং ডিজিটালি বিকৃত কনটেন্টের মাধ্যমে প্রভাবিত হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি বা ছড়িয়ে দেওয়া মিথ্যা বয়ানের দ্রুত বিস্তার নির্বাচনি সততা ও জনআস্থার জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করছে।

তথ্যের সততা রক্ষা করা মানেই সাংবাদিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা—উল্লেখ করে লিলার বলেন, অনিরাপদ বা শত্রুতাপূর্ণ তথ্য পরিবেশনে কাজ করা সাংবাদিকরা অনলাইন ও অফলাইনে হয়রানি, হুমকি ও ভয়ভীতির মুখে পড়েন। তার মতে, সাংবাদিক নিরাপদ মানেই নিরাপদ নির্বাচন।

সমাপনী অধিবেশনে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন। প্রশিক্ষণের ফ্যাসিলিটেটর ছিলেন অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) সাবেক বাংলাদেশ ব্যুরো প্রধান ফরিদ হোসেন। এছাড়া বক্তব্য দেন এমআরডিআই নির্বাহী পরিচালক হাসিবুর রহমান ও ডিসিএবি সভাপতি একেএম মইনউদ্দিন। অধিবেশনটি পরিচালনা করেন ডিসিএবি সাধারণ সম্পাদক এমরুল কায়েস।

জাতিসংঘ ব্যালট ও ড্রিপ প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে। এসব প্রকল্পের আওতায় নির্বাচন প্রক্রিয়ার পুরো চক্রজুড়ে কারিগরি, উপকরণগত, প্রাতিষ্ঠানিক এবং নাগরিক শিক্ষা সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।

জেপিআই/এমকেআর/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।