কবে আসছে দুদকের নতুন কমিশন, আলোচনায় যারা
সমাজকে দুর্নীতিমুক্ত করার লক্ষ্যে ২০০৪ সালে যাত্রা শুরু হয় দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক)। এটি বাংলাদেশে দুর্নীতি প্রতিরোধ ও দমনে নিয়োজিত প্রধান সাংবিধানিক ও স্বাধীন একটি সংস্থা। দুর্নীতিমূলক কাজের অনুসন্ধান, তদন্ত, দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং সম্পদের হিসাব নিরীক্ষা করাই মূলত প্রধান কাজ স্বশাসিত সংস্থাটির। নির্বাচনের পর নতুন সরকার আসার পর থেকে সংস্থাটি নেতৃত্ব শূন্য। ফলে স্থবির হয়ে পড়েছে দাপ্তরিক কাজকর্ম। যদিও নতুন চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার হিসেবে কারা আসছেন, এ নিয়ে চলছে আলোচনা।
দুদকের সদ্য সাবেক চেয়ারম্যান ড. আবদুল মোমেন, কমিশনার (তদন্ত) মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবার আজিজী ও কমিশনার (অনুসন্ধান) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাফিজ আহসান ফরিদ গত ৩ মার্চ পদত্যাগ করায় নতুন কমিশন গঠনের তৎপরতা চলছে বলে জানা গেছে।
আরও পড়ুন:
আওয়ামী লীগ সরকার তথ্য কমিশনকে অকার্যকর করে রেখেছিল
দুদকের চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনারের পদত্যাগ
তবে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় জটিলতার কারণে শিগগির কমিশন গঠন নিয়ে শঙ্কাও রয়েছে। ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সংস্কারে পদক্ষেপ নেয়। এরই ধারাবাহিকতায় দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) ২০২৫ অধ্যাদেশ জারি করে তৎকালীন সরকার।
দুদকের কেউ কেউ বলছেন, এই অধ্যাদেশ সংসদ অধিবেশনে তুলতে পারে সরকার। সেক্ষেত্রে আইনি জটিলতায় কমিশন নিয়োগ দেরি হতে পারে।
এসব বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সংসদ অধিবেশন শুরু হবে ১২ মার্চ। এর আগেই আগের আইনে কমিশন নিয়োগ দিতে পারে সরকার।
জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুদকের একজন পরিচালক বলেন, সরকারের নিশ্চয়ই পরিকল্পনা আছে। দুদকের মতো প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে অচলাবস্থা থাকবে এটা নিশ্চয়ই কেউ চাইবে না।
আলোচনা কারা আছেন
দুদকে নতুন চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার হিসেবে কারা আসছেন এ নিয়ে জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে। এর মধ্যে নতুন চেয়ারম্যান হিসেবে ঢাকা মহানগর আদালতের সাবেক সিনিয়র স্পেশাল জজ মোতাহার হোসেনের নাম শোনা যাচ্ছে সবচেয়ে বেশি। তিনি (মোতাহার) চেয়ারম্যান হবেন শুনে অনেক কর্মকর্তা এরইমধ্যে তার সঙ্গে দেখাও করেছেন।
পরিচয় গোপন রাখার শর্তে এক কর্মকর্তা বলেন, তিনি অসুস্থ। চিকিৎসাধীন আছেন। কেউ কেউ দেখা করেছেন তার সঙ্গে। তবে অতীত অভিজ্ঞতা বলে যার নাম জোরেশোরে শোনা যায় তিনি দুদকে পদ পান না। তার (মোতাহার) নাম অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও শোনা গিয়েছিল।
জানা যায়, বিদেশে অর্থ পাচার সংক্রান্ত দুর্নীতির মামলায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে ২০১৩ সালের ১৭ নভেম্বর বেকসুর খালাস দিয়েছিলেন বিচারক মোতাহার হোসেন। সে সময় তিনি ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৩-এর বিচারক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ওই বছরের ডিসেম্বরে তিনি অবসরে যান।
দুদক কর্মকর্তারা জানান, প্রধানমন্ত্রীর জনপ্রশাসন উপদেষ্টা মো. ইসমাইল জবিউল্লাহর আপন ভাই প্রশাসন ক্যাডারের ৮৫ ব্যাচের কর্মকর্তা মো. আব্দুল্লাহ আল বাকী, সাবেক আয়কর কমিশনার (চলতি দায়িত্ব) ও বর্তমানে ফাইনান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের (এফআরসি) চেয়ারম্যান ড. মো. সাজ্জাদ হোসেন ভূইয়া, সাবেক যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ খন্দকার আবুল হোসেনের নামও দুদক চেয়ারম্যান বা কমিশনের সদস্য হিসেবে শোনা যাচ্ছে।
দুদক আইন অনুযায়ী, চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার খুঁজে বের করতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে শিগগির পাঁচ সদস্যের সার্চ কমিটি গঠন করা হবে।
তবে সার্চ কমিটি গঠনের বিষয়ে জানতে মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
নিয়ম অনুযায়ী, সার্চ কমিটি একাধিক সভা করে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে শীর্ষ তিনটি পদের জন্য ছয়জনের নাম রাষ্ট্রপতির কাছে জমা দেবে। রাষ্ট্রপতি ওই তালিকা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে কমিশনার হিসেবে তিনজনকে নির্বাচিত করবেন। তাদের মধ্য থেকে একজনকে চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব দেবেন।
যদিও অধ্যাদেশ অনুযায়ী কমিশন নিয়োগের প্রক্রিয়া কিছুটা ভিন্ন। ২০২৫ সালের সংশোধনী অধ্যাদেশ অনুযায়ী, এখন দুদক সর্বোচ্চ পাঁচ সদস্যের কমিশন হতে পারবে। এতে অন্তত একজন নারী এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিতে দক্ষ একজন সদস্য রাখার বিধান যুক্ত করা হয়েছে। কমিশনের সদস্যদের মধ্য থেকে রাষ্ট্রপতি একজনকে চেয়ারম্যান নিয়োগ দেবেন।
আরও পড়ুন:
বাংলাদেশ ব্যাংক-দুদকের মতো প্রতিষ্ঠান দলীয়করণ করা হচ্ছে: নাহিদ ইসলাম
দুদকের সাবেক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ নিজেই সংস্থাটির জালে
আইন অনুযায়ী কমিশনার নিয়োগের জন্য একটি বাছাই কমিটি কাজ করে। সংশোধিত বিধানে এই কমিটি সাত সদস্যের। এর সভাপতি থাকবেন আপিল বিভাগের একজন জ্যেষ্ঠ বিচারপতি। এছাড়া সদস্য হিসেবে থাকবেন প্রধান বিচারপতির মনোনীত একজন হাইকোর্ট বিচারক, মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রক, সরকারি কর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান, জাতীয় সংসদের স্পিকারের মনোনীত সরকার ও বিরোধী দলের একজন করে সংসদ সদস্য এবং দুর্নীতি প্রতিরোধ বা সুশাসন বিষয়ে অভিজ্ঞ একজন নাগরিক। জাতীয় সংসদ ভেঙে থাকলে সংসদ সদস্য দুজন ছাড়া কমিটি গঠন করার সুযোগও রাখা হয়েছে।
বাছাই কমিটি সাধারণত গণবিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে আবেদন আহ্বান করবে। আবেদনকারীদের জীবনবৃত্তান্ত ও সম্পদের বিবরণ জমা দিতে হয়। এরপর যাচাই–বাছাই করে যোগ্য প্রার্থীদের সংক্ষিপ্ত তালিকা তৈরি করা হয় এবং তাদের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। প্রয়োজনে সাক্ষাৎকার প্রক্রিয়ায় সর্বোচ্চ দুইজন বিশেষজ্ঞকে যুক্ত করা যেতে পারে, তবে তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণে অংশ নিতে পারেন না। শেষ পর্যন্ত প্রতিটি শূন্য পদের বিপরীতে দুইজন করে প্রার্থীর নাম রাষ্ট্রপতির কাছে সুপারিশ করা হয়। রাষ্ট্রপতি সেখান থেকে চেয়ারম্যান ও কমিশনার নিয়োগ দেন।
তবে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্ত সাধারণত প্রধানমন্ত্রীর লিখিত পরামর্শের ভিত্তিতেই কার্যকর হয়।
সংশোধিত আইনে কমিশনার হওয়ার যোগ্যতাও নির্দিষ্ট করা হয়েছে। আইন, প্রশাসন, বিচার, হিসাব বা নিরীক্ষা, শৃঙ্খলা বাহিনী, আর্থিক প্রতিষ্ঠান কিংবা দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমে অন্তত ২০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকলে কাউকে কমিশনার হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। অন্যদিকে, বিদেশি নাগরিকত্ব গ্রহণ, অন্য দেশে স্থায়ীভাবে বসবাসের অনুমতি নেওয়া বা অনুমোদন ছাড়া বিদেশে বিনিয়োগ করাও অযোগ্যতার কারণ হতে পারে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) ড. ইফতেখারুজ্জামান সম্প্রতি এক সেমিনারে বলেন, দুদকের চেয়ারম্যান ও কমিশনার পদে দুর্নীতিবিরোধী আপসহীন ব্যক্তিত্ব প্রয়োজন। রাজনৈতিক বিবেচনায় চেয়ারম্যান ও কমিশনার পদে কাউকে কোনোভাবে যাতে নিয়োগ দেওয়া না হয়। এর আগে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়ায় কমিশন দল-মত নির্বিশেষে নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারেনি। পরিচয় দেখে কাজ করা হয়েছে। যার ফলে দুদক বরাবরই জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী কাজ করতে পারেনি।
এসএম/এসএনআর/এমএমএআর