প্রযুক্তির জয়ে হার মানছে টাইপরাইটার

আশিকুজ্জামান
আশিকুজ্জামান আশিকুজ্জামান , নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৮:২৪ এএম, ২৮ এপ্রিল ২০২৬
টাইপরাইটার মেশিনে টাইপ করছেন বিমান পাল, ছবি: জাগো নিউজ

ঢাকা আইনজীবী সমিতির কার্যালয়ের পাশে একটি দোকানের সামনে বসে খসড়া কাগজ থেকে দলিলে শব্দ তুলছিলেন বিমান পাল। চারপাশে আধুনিক কম্পিউটার দোকানে ভিড়, কিন্তু তার সামনে রাখা ধাতব মেশিনটি যেন অন্য এক সময়ের গল্প বলে। নিজের মনেই টাইপ করে যাচ্ছিলেন তিনি। যেন সময়ের সঙ্গে এক নীরব প্রতিযোগিতা।

খটখট… খটখট-খট। আদালতপাড়ার ব্যস্ততার ভিড়ে এখন আর খুব একটা শোনা যায় না এই শব্দ। তবুও কোথাও কোথাও এখনো টিকে আছে। একটি পুরোনো টাইপরাইটার, আর তাকে আঁকড়ে ধরে থাকা কিছু মানুষ।

ঢাকার এই আদালতপাড়ায় এক সময় ছিল টাইপরাইটারের রাজত্ব। সারি সারি মেশিন, ব্যস্ত টাইপিস্ট, আর অপেক্ষমাণ মানুষ। সব মিলিয়ে এক আলাদা পরিবেশ। এখন সেই জায়গা দখল করেছে কম্পিউটার। শব্দ বদলেছে, গতি বেড়েছে, কিন্তু হারিয়ে গেছে খটখটের ছন্দ।

আরও পড়ুন
সময়ের স্রোতে হারিয়ে যাওয়া পেশা
যন্ত্রের ছোবলে বিলুপ্ত হচ্ছে করাতি পেশা
বিলুপ্তপ্রায় পেশা ঘোলওয়ালা
বিলুপ্তির পথে তাঁত শিল্প, পেশা ছাড়ছেন কারিগররা

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রযুক্তিগত পথে আদালতপাড়াও বদলে গেছে দ্রুত। কম্পিউটার, প্রিন্টার, ইন্টারনেট সবকিছুই কাজকে সহজ করেছে। কিন্তু সেই সহজতার আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে একটি ঐতিহ্যবাহী পেশা।

টাইপরাইটারের খটখট শব্দ এখন আর ব্যস্ততার প্রতীক নয়, অস্তিত্বের লড়াইয়ের প্রতিধ্বনি।

আদালতপাড়ার এই টাইপিস্টদের গল্প নতুন করে ভাবায়। প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে কিছু শ্রম, কিছু পেশা নিঃশব্দে হারিয়ে যাচ্ছে। বহু বছর আগেই এই মেশিনের উৎপাদনও বন্ধ হয়ে গেছে।

তবুও বিমান পালদের মতো কিছু মানুষ এখনো বসে আছেন তাদের মেশিন নিয়ে। খটখট শব্দ তুলে মনে করিয়ে দিচ্ছেন, সব পরিবর্তনের মধ্যেও কিছু ইতিহাস বেঁচে থাকে। কিছুটা জেদে, কিছুটা অভ্যাসে, আর অনেকটা ভালোবাসায়।

প্রযুক্তির জয়ে হার মানছে টাইপরাইটার

কম্পিউটারে কাজ করছেন টাইপিস্ট সুভাষ পাল, ছবি: জাগো নিউজ

পাঁচ দশকের অভিজ্ঞতা: সুভাষ পালের গল্প

ঢাকার আদালত এলাকায় টাইপরাইটারদের নির্ধারিত স্থানে বসে কথা হয় সুভাষ পালের (৭০) সঙ্গে। ১৯৭২ সালে মাধ্যমিক পাসের পরই শেখেন টাইপের কাজ। ১৯৭৩ সাল থেকেই আদালতপাড়ায় শুরু করেন পেশাগত জীবন।

‘তখন এই কাজের আলাদা মর্যাদা ছিল’, বলছিলেন তিনি। জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমেরিকা আর জার্মানি থেকে মেশিন আসতো। অনেক কষ্ট করে একটা পুরোনো টাইপরাইটার কিনেছিলাম।’

আদালত এলাকার নিবন্ধিত টাইপিস্ট তিনি। জীবনের বড় একটা সময় কাটিয়েছেন এই মেশিনের সঙ্গে। তবে সময়ের বাস্তবতায় তাকেও বদলাতে হয়েছে।

আরও পড়ুন
জৌলুশ হারিয়েছে বিশ্বখ্যাত ইসলামপুরের কাঁসা শিল্প
কলুর ঘানিতে সংসার চলছে না তাদের
দিনাজপুরে তিলের খাজা তৈরি করে শত বছরের ঐতিহ্য ধরে আছে পরিবারটি
ঐতিহ্যের শীতল পাটিতে আগ্রহ হারাচ্ছেন কারিগররা

সুভাষ পাল বলেন, ‘১০-১১ বছর ধরে কম্পিউটার ব্যবহার করছি। টাইপরাইটারে একসঙ্গে তিনটা কপি করা যেত, এখন একবার টাইপ করলেই অসংখ্য কপি প্রিন্ট করা যায়। সুবিধা তো আছেই। তাই মেশিন বদলে ফেলেছি। বলতে পারেন প্রযুক্তি এখানে জিতেছে।’

রিবন ফিতার সংকট, মেশিনের যন্ত্রাংশের অভাব। সব মিলিয়ে টাইপরাইটার টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে উঠেছে বলেও জানান তিনি।

সুভাষ পালের দুই সন্তানই এখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক। তিনি বলেন, ‘ওরা কেউ এই পেশায় আসেনি। ভবিষ্যৎ নেই বলেই অন্য পথে গেছে।’

প্রযুক্তির জয়ে হার মানছে টাইপরাইটার

অচল মেশিন, বসে থাকা

আদালতপাড়া ঘুরে দেখা যায়, অনেক দোকানে এখনো পুরোনো টাইপরাইটার মেশিন আছে। কিন্তু সেগুলোর বেশিরভাগই অচল। কিছু ধুলোমাখা, কিছু পরিষ্কার। তবে  ব্যবহারের বাইরে পড়ে আছে।

এই দোকান মালিকরা বলছেন, এটা আসলে মেশিন নয়, স্মৃতির সঙ্গে বসবাস। অনেকে হয়তো আসবেন এই আগ্রহ নিয়ে মেশিন পাশে নিয়ে বসে থাকা।

পরান নামের এক টাইপিস্ট বলেন, ‘প্রতিদিন মেশিন পরিষ্কার করে বসে থাকি। ম্যানুয়াল এই মেশিনে এখন আর কাজ হয় না। পরিচিত কেউ এলে পাশের কম্পিউটারের দোকানে পাঠিয়ে দেই বা আমিও মাঝেমধ্যে কম্পিউটারেই কাজ করি।’

তার কণ্ঠে হতাশা স্পষ্ট, ‘আগে লাইনে দাঁড়িয়ে কাজ করতো মানুষ। এখন ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থাকি।’

আরেকজন টাইপিস্ট নিতাই চন্দ্র বলেন, ‘মেশিনের যন্ত্রাংশ পাওয়া যায় না। নষ্ট হলে নিজেরাই ঠিক করার চেষ্টা করি। নতুন কেউ তো এই কাজ শিখতেই চায় না।’

আরও পড়ুন
বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে ‘ঠাটারি’ পেশা
সংকটে শাঁখা শিল্প, পেশা বদলাচ্ছেন কারিগররা
চাকা ঘোরে কিন্তু ভাগ্য ফেরে না মৃৎশিল্পীদের
যন্ত্রের দাপটে বিলুপ্তির পথে ঢুলি

টাইপরাইটারদের আয় কমেছে

টাইপরাইটারনির্ভর টাইপিস্টদের আয় এখন অনেকটাই কমে গেছে। এই মেশিনে এখন কাজ করেন হাতে গোনা কয়েকজন। প্রবীণ টাইপিস্ট সৌরভ রায় জাগো নিউজকে বলেন, ‘আগে দিনে অন্যসব খরচ বাদে ৮০০-১০০০ টাকা আয় থাকতো। এখন ৪০০-৫০০ টাকাও হয় না অনেক সময়।’

এই টাইপিস্ট যোগ করেন, ‘এই পেশা আর টিকবে না। আমরা শেষ প্রজন্ম।’

টাইপরাইটারের প্রয়োজনীয়তা

ডিজিটাল যুগে এসে টাইপরাইটারের ব্যবহার কমলেও পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। কিছু ক্ষেত্রে এখনো এর প্রয়োজন আছে বলে মনে করেন আইনজীবীরা।

হাইকোর্টের আইনজীবী আল কাইয়ুম জাগো নিউজকে বলেন, ম্যানুয়াল টাইপে খরচ কম। সহজে পাওয়া যায়। তাই অনেক সময় টাইপরাইটার ব্যবহার করি। যে আবেদনগুলো কম্পিউটারে করতে গেলে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা খরচ পড়ে। ম্যানুয়ালি তা ৫০-৬০ টাকায় হয়ে যায়।

তিনি আরও বলেন, ‘আদালতের অনেক ফরম এখনো ডিজিটাল হয়নি। সেগুলো ম্যানুয়ালি টাইপরাইটার মেশিনে পূরণ করতে হয়।’

প্রযুক্তির জয়ে হার মানছে টাইপরাইটার

আইনজীবী রোকসানা হক বলেন, গ্রামের অনেক মানুষ আসে, তাদের জন্য টাইপরাইটার সুবিধাজনক। তারা কম খরচে কাজ করতে পারে।

অ্যাডভোকেট মাহমুদ হাসান মনে করেন, সব কিছু ডিজিটাল হলেও কিছু পুরোনো পদ্ধতি রাখা দরকার। কারণ সব মানুষ প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারে না।

আরেক আইনজীবী সাইফুল ইসলাম বলেন, টাইপরাইটারের একটা বিশ্বাসযোগ্যতা আছে। ভুল কম হয়, আর ডকুমেন্টগুলো পরিষ্কার থাকে।

অন্যদিকে অ্যাডভোকেট নাসরিন আক্তার বলেন, বয়স্ক অনেক ক্লায়েন্ট এখনো হাতে লেখা বা টাইপরাইটারে টাইপ করা কাগজে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন।

অন্যদের অভিজ্ঞতা

শুধু আইনজীবী নন, সাধারণ ব্যবহারকারীদের কাছেও এখনো কিছু ক্ষেত্রে টাইপরাইটারের কদর আছে।

জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জমি সংক্রান্ত একটি আবেদন করতে আসা আব্দুল করিম বলেন, ‘কম খরচে কাজ হয়ে যায়। তাই এখানে আসি। কম্পিউটার বুঝি না। টাইপরাইটারে কাজ করলে সহজ লাগে।’

সঙ্গে থাকা তার ছেলে শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘অনেক সময় জরুরি কাজে কম্পিউটার দোকানে ভিড় থাকে। তখন টাইপরাইটারই ভরসা।’

এমডিএএ/এমএমএআর/ এমএফএ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।