চেয়ারম্যানের চেয়ার ফাঁকা, সচিবের ক্ষমতা বাড়িয়ে দুদক আইনে আসছে সংশোধন

সাইফুল হক মিঠু
সাইফুল হক মিঠু সাইফুল হক মিঠু
প্রকাশিত: ০৫:৫১ পিএম, ১৮ মে ২০২৬
চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনারের পদত্যাগের পর দুদক এখন অভিভাবকশূন্য/এআই দিয়ে তৈরি ছবি
  • কমিশনের মেয়াদ পাঁচ থেকে কমিয়ে চার বছর করার সুপারিশ
  • ক্ষমতা বাড়ছে দুদক সচিবের
  • মানি লন্ডারিং আইনেও ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাব
  • ১২০ দিনের মধ্যে তদন্ত সম্পন্নের বাধ্যবাধকতা বিলুপ্তি
  • কমিশনে নিয়োগে বিদেশি নাগরিকত্ব থাকা ‘অযোগ্যতা’

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবদুল মোমেন পদত্যাগ করেন গত ৩ মার্চ। একই দিন দুদকের দুই কমিশনার মিঞা মুহাম্মদ আলি আকবার আজিজী ও ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাফিজ আহসান ফরিদও পদত্যাগ করেন। এরপর গত প্রায় আড়াই মাস ধরে ‘চেয়ারম্যানের চেয়ার ফাঁকা’ রেখেই দিন পার করছে সংস্থাটি। এতে অভিভাবকশূন্য দুদকে দুর্নীতিবিরোধীসহ সার্বিক কার্যক্রমে দেখা দিয়েছে স্থবিরতা। কবে নাগাদ নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়া হবে সেটি এখনো স্পষ্ট নয়।

তবে দুর্নীতি দমন (দুদক) কমিশনশূন্য হয়ে পড়লে যেন সংস্থার কার্যক্রম বন্ধ হয়ে না যায়, সেজন্য আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নতুন সংশোধনীতে কমিশন না থাকলে দুদক সচিবকে সংস্থার কার্যক্রম চালিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। একই সঙ্গে কমিশনের মেয়াদ পাঁচ বছর থেকে কমিয়ে চার বছর করার সুপারিশও করা হয়েছে। দুদক সূত্রে জানা গেছে, গত সপ্তাহ দুই আগে আইন মন্ত্রণালয় থেকে এমন প্রস্তাব চাওয়া হয়েছে।

দুদক চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের পদত্যাগ বা পদচ্যুত হওয়ার কারণে কমিশনশূন্যতায় সার্বিক কার্যক্রমে স্থবিরতা কাটাতে এবং সংস্থাটি সচল রাখতে দুদক আইনে সংশোধনী এনে করা হচ্ছে ‘দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সংশোধন আইন’। দুদকের একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জাগো নিউজকে এ তথ্য জানিয়েছেন। 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংস্থাটির একজন কর্মকর্তা জাগো নিউজকে বলেন, ‘আইন মন্ত্রণালয় থেকে মন্ত্রিপরিষদ হয়ে আইন সংশোধন করতে দুদকে প্রস্তাব চাওয়া হয়েছে। একগুচ্ছ প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। আয়কর আইন অনুযায়ী, তথ্য তলব ও জব্দ করণে জটিলতা নিরসন, কমিশন না থাকাকালীন দুদকের কার্যক্রমে স্থবিরতা কমানোসহ নানান বিষয়ে প্রস্তাব করা হয়েছে। দুদক সচিব মোহাম্মদ খালেদ রহীমসহ একাধিক পরিচালকের মতামতের ভিত্তিতে এসব প্রস্তাব প্রস্তুত করা হয়েছে।’

আরও পড়ুন
অভিভাবকশূন্য দুদক, স্থবির দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রম
চেয়ারম্যান-কমিশনার না থাকায় ‘ঝিমোচ্ছে’ দুদক, আলোচনায় যারা
দুদকের চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনারের পদত্যাগ

দুদক সূত্র জানিয়েছে, চেয়ারম্যান ও কমিশনারদের পদত্যাগ বা অপসারণের কারণে কমিশনশূন্য পরিস্থিতিতে সংস্থার কার্যক্রম অচল হয়ে পড়ার অভিজ্ঞতা থেকেই এ সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বর্তমানে কমিশন না থাকায় অভিযোগ যাচাই, অনুসন্ধান অনুমোদন, ফাঁদ মামলা ও চার্জশিট দাখিলসহ গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম প্রায় বন্ধ।

jagonews24২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি দুদক সংস্কার কমিশন প্রতিবেদন জমা দেয়/ফাইল ছবি

গত ৩ মার্চ চেয়ারম্যান ড. মোহাম্মদ আবদুল মোমেনের নেতৃত্বাধীন কমিশন পদত্যাগ করার পর প্রায় আড়াই মাস ধরে দুদক চলছে কমিশনবিহীন। ফলে দুর্নীতির অভিযোগের স্তূপ জমছে, কিন্তু কমিশনের অনুমোদন ছাড়া কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া যাচ্ছে না।

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানকে প্রধান করে দুদক সংস্কার কমিশন গঠন করেছিল তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। এই সংস্কার কমিশন দুদককে বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি এবং কমিশনকে তিন সদস্য থেকে বাড়িয়ে পাঁচ সদস্যে উন্নীত করাসহ ৪৭টি সুপারিশ করে ২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি প্রতিবেদন জমা দেয়।

সংস্থাটি আড়াই মাস ধরে কমিশনশূন্য থাকার বিষয়ে ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, দুদকের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানকে দীর্ঘ সময় অকার্যকর রাখা রাষ্ট্র ও জনগণের জন্য ক্ষতিকর। দ্রুত নতুন কমিশন নিয়োগ দিয়ে অচলাবস্থা দূর করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।

জাগো নিউজের হাতে আসা নথি সূত্রে জানা যায়, নতুন সংশোধনীতে দুদক আইনের ১০ ধারায় একটি নতুন উপধারা যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, অনিবার্য কারণে কমিশনের সব পদ শূন্য হলে দুদক সচিব মহাপরিচালকদের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন। পরে কমিশন গঠিত হলে সেই কার্যক্রম কমিশনকে অবহিত করতে হবে এবং সচিবের নেওয়া সিদ্ধান্ত কমিশনের সিদ্ধান্ত হিসেবে গণ্য হবে।

দুদক কর্মকর্তারা জানান, সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে আইন সংশোধনের বিষয়ে মতামত চাওয়া হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ৭ মে দুদক সচিব মোহাম্মদ খালেদ রহীমের নেতৃত্বে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে মহাপরিচালক ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা অংশ নেন। পরে একটি খসড়া সুপারিশ চূড়ান্ত করা হয়, যা শিগগির মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হবে।

দুদক আইন অনুযায়ী ৩০ দিনের মধ্যে নতুন কমিশন নিয়োগ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও সেই সময়সীমা এরই মধ্যে পার হয়ে গেছে। কারণ, দুদকের চেয়ারম্যান এবং দুই কমিশনার পদত্যাগ করেছেন গত ৩ মার্চ।

jagonews24গত ৩ মার্চ দুদক চেয়ারম্যান ও দুই কমিশনার পদত্যাগ করেন/ফাইল ছবি

অন্যদিকে, তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার দুদক আইন সংশোধন করে দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ জারি করে। সেখানে সংস্কার কমিশনের সুপারিশ মোতাবেক তিনজনের বদলে পাঁচ সদস্যের কমিশন গঠনের বিধান করা হয়। তবে বিএনপি নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ওই অধ্যাদেশ সংসদে অনুমোদন করেনি। ফলে নতুন কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া অনেকটাই থমকে আছে।

এদিকে, নতুন করে আইনের সংশোধনীতে দুদকের ক্ষমতা বাড়ানোরও প্রস্তাব করা হয়েছে। বিশেষ করে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে দুদকের এখতিয়ার সম্প্রসারণের সুপারিশ করা হয়েছে। বর্তমানে শুধু ঘুস ও দুর্নীতি-সংক্রান্ত অপরাধ দুদকের আওতায় থাকলেও নতুন প্রস্তাবে সরকারি সম্পদ আত্মসাৎ, জালিয়াতি, দলিল জালকরণ, বৈদেশিক মুদ্রা পাচার, কর ও শুল্ক সংক্রান্ত অপরাধ এবং পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট অপরাধও দুদকের আওতায় আনার সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।

এছাড়া আলোচিত দুদক আইন ২০০৪-এর ৩২(ক) ধারা বাতিলের প্রস্তাব করা হয়েছে। ওই ধারায় বিচারক, ম্যাজিস্ট্রেট বা সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মামলা করতে সরকারের অনুমতির বাধ্যবাধকতা ছিল। উচ্চ আদালত আগেই ধারাটিকে ‘অবৈধ’ ঘোষণা করেছিলেন। তদন্ত শেষ করার ১২০ দিনের সময়সীমাও বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে।

আরও পড়ুন
ইউনূস সরকারের দেড় বছরে রেকর্ড মামলা দুদকের
কবে আসছে দুদকের নতুন কমিশন, আলোচনায় যারা

সংশোধিত আইনের ২০ (ক) ধারায় তদন্তের সময়সীমা ১২০ দিনের মধ্যে শেষ করার যে বাধ্যবাধকতা রাখা হয়েছে, সেটি বাতিল করে একই ধারায় নতুন একটি আইন প্রতিস্থাপনের সুপারিশ করা হয়েছে। একইভাবে ‘গোপনীয় অনুসন্ধান’ পরিচালনা, কর্মচারীদের সুযোগ-সুবিধা বাড়ানো এবং বিদেশি নাগরিকত্ব থাকা ব্যক্তিদের কমিশনার হিসেবে নিয়োগে ‘অযোগ্য’ ঘোষণা করার বিষয়টিও দুদক আইন সংশোধনীতে সুপারিশ করা হয়েছে। 

jagonews24দুদক কার্যালয়/ফাইল ছবি

দুদক কর্মকর্তাদের অনুসন্ধান ও তদন্তকাজে ভীতি তৈরি করে এ ধরনের ২৮-এর (গ) ধারাটি বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছে। এ ধারায় উল্লেখ ছিল, মিথ্যা জানিয়া বা তথ্যের সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত না হইয়া কোনো ব্যক্তি ভিত্তিহীন কোনো তথ্য, যে তথ্যের ভিত্তিতে এই আইনের অধীন তদন্ত বা বিচারকার্য পরিচালিত হইবার সম্ভাবনা থাকে, প্রদান করিলে তিনি মিথ্যা তথ্য প্রদান করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবে।

কমিশনের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জাগো নিউজকে বলেন, সংশোধনী আইনটি পাস হলে দুদক শক্তিশালী হবে। নতুন আইনে কমিশনের মেয়াদ ও কমিশন না থাকলে করণীয়—এমন অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সংশোধনী প্রস্তাবে রাখা হয়েছে। ফলে কমিশন সচল হবে। কমিশন না থাকলে পার পাওয়া যায়—এ ধরনের একটা মেসেজ আছে, সেই সংস্কৃতি বন্ধ করা প্রয়োজন। 

দুদকের সাবেক মহাপরিচালক মঈদুল ইসলাম জাগো নিউজকে বলেন, যেসব আইনে সংশোধনী এনে সুপারিশ করা হয়েছে, সেগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি এগুলো সংশোধিত আকারে পাস করা হয়, তাহলে দুদকের ক্ষমতা অনেকাংশে বাড়বে।

এসএম/এমকেআর/এমএফএ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।