গোলটেবিল আলোচনা
ভ্যাট ও অগ্রিম আয়করে অতি নির্ভরতা বাড়াচ্ছে মূল্যস্ফীতি
সরকার বাজেট অর্থায়নে প্রত্যক্ষ করের তুলনায় পরোক্ষ করের ওপর মাত্রাতিরিক্তভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। যার সরাসরি প্রভাব পড়ে পণ্যের দামে। ফলে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যায়।
সোমবার (১৮ মে) ‘পরোক্ষ করের ওপর অতি নির্ভরশীলতা: অর্থনীতির ওপর বহুমুখী প্রভাব’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় বিশেষজ্ঞরা এসব কথা বলেন। ‘ভয়েস ফর রিফর্ম’ আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে অর্থনীতিবিদ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) প্রাক্তন কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী প্রতিনিধি, ভোক্তা প্রতিনিধি ও মিডিয়া ব্যক্তিত্বরা উপস্থিত ছিলেন।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেসের পরিচালক কর বিশেষজ্ঞ স্নেহাশীষ বড়ুয়া। সঞ্চালনা করেন ভয়েস ফর রিফর্মের সহ-সমন্বয়ক ফাহিম মাশরুর।
স্নেহাশীষ বড়ুয়া বলেন, ‘গত বেশ কয়েক বছর ধরে সরকারের বাজেট অর্থায়নে প্রত্যক্ষ করের তুলনায় পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরশীলতা মাত্রাতিরিক্তভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। যেখানে পাশের দেশ ভারতে পরোক্ষ কর সরকারের মোট করের ৫০ শতাংশের নিচে, সেখানে আমাদের দেশে বর্তমানে পরোক্ষ কর প্রায় ৮০ শতাংশ। এটি এশিয়ার মধ্যে সর্বোচ্চ। এর প্রধান কারণ দেশের রাজস্ব বোর্ড আয়করের মতো প্রত্যক্ষ কর আহরণ করতে ব্যর্থ হচ্ছে। এজন্য সহজ পথ হিসেবে পরোক্ষ করের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।’
তিনি তার উপস্থাপনায় জানান, যদিও অগ্রিম আয়কর তত্ত্বীয়ভাবে প্রত্যক্ষ কর, তবে ব্যবহারিকভাবে একে পরোক্ষ কর হিসেবেই দেখা উচিত। পণ্য ও কাঁচামাল আমদানি করতে ভ্যাট ও কাস্টমস ডিউটির সঙ্গে অনেক ক্ষেত্রেই ৫ শতাংশ অগ্রিম কর আরোপ করা হয়। এছাড়া, অগ্রিম কর একাধিক পর্যায়ে আরোপ করা হয়, যা দ্বৈত কর হয়ে যাচ্ছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে পণ্যের দামে। সাম্প্রতিক সময়ের মূল্যস্ফীতির জন্য ভ্যাট ও অগ্রিম আয়কর বিশালভাবে দায়ী বলে তিনি মনে করেন।
আলোচনায় অংশ নিয়ে এনবিআরের সাবেক সদস্য মোহাম্মদ ফরিদউদ্দিন বলেন, ভ্যাট হার কোনোভাবেই ১০ শতাংশের বেশি হওয়া উচিত নয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে কর কাঠামোর সংস্কার নিয়ে যে টাস্কফোর্স করা হয়েছিল সেখানে সর্বোচ্চ ভ্যাট হার ১০ শতাংশ প্রস্তাব করা হয়েছিল। এছাড়া, সেই টাস্কফোর্স আরও কিছু প্রস্তাব করেছিল, যেগুলো সম্পর্কে দুর্ভাগ্যজনকভাবে কোনো আলোচনা বা সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
তিনি আরও বলেন, ডিজিটালাইজেশন করে কোনো লাভ হবে না, যদি না ভ্যাট, কাস্টমস ও আয়কর- এই তিন ব্যবস্থার মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক স্থাপন না করা যায়।
আরেক আলোচক বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) ড. মাসরুর রিয়াজ বলেন, সরকারের রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় দরকার। শুধু রাজস্ব আহরণ বাড়ালেই চলবে না, রাজস্ব খরচের গুণগত ব্যাপারেও দৃষ্টি দিতে হবে।
তিনি মত দেন, বর্তমান চ্যালেঞ্জপূর্ণ প্রেক্ষাপটে নতুন সরকারি পে-স্কেলের ৩৫ হাজার কোটি টাকা খরচ করা এই মুহূর্তে ভুল সিদ্ধান্ত হবে।
সঞ্চালক ফাহিম মাশরুর ভয়েস ফর রিফর্মের পক্ষ থেকে বেশ কিছু সংস্কার প্রস্তাব তুলে ধরেন। সেগুলো হচ্ছে - সাধারণ ভ্যাট হার সাড়ে সাত শতাংশ নির্ধারণ করা, বিলাসী পণ্যের ক্ষেত্রে ২৫ শতাংশের বেশি ভ্যাট হার প্রণয়ন, ব্যবসার অগ্রিম আয়কর মূল্যায়ন করা যাতে অগ্রিম করারোপের পরিমাণ কোনোভাবেই প্রযোজ্য করপোরেট করের পরিমাণের থেকে অতিরিক্ত না হয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য আমদানির ক্ষেত্রে অগ্রিম আয়কর উঠিয়ে নেওয়া, মোবাইল টক টাইমের ওপর ২০ শতাংশ সম্পূরক শুল্ক বিলোপ করা এবং বাজেটে করের আওতা বাড়িয়ে প্রত্যক্ষ করের অংশ ৪০ শতাংশে উন্নীত করা।
আইএইচও/একিউএফ