শহীদ জননীর সমাধি সংরক্ষণের দাবি বিশিষ্টজনদের


প্রকাশিত: ০৩:২৮ এএম, ২৪ এপ্রিল ২০১৭

রোববার দুপুর ১টা। চারদিক থেকে কানে আসছিল জোহরের আজানের ধ্বনি। শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে ব্যস্ত অনেকে প্রিয়জনদের কবর জিয়ারতে। দু’হাত তুলে দোয়া ও আত্মার মাগফেরাত কামনায় ছল ছল হয়ে আছে স্বজনদের চোখ। প্রধান ফটক পেরিয়ে কবরস্থানের প্রবেশ করে হাতের বাম পাশ দিয়ে সামনে যেতেই শহীদ জননী জাহানারা ইমামের সমাধি। পাথর কিংবা টাইলসে বাধা হয়নি সমাধিটি। কিন্তু বাঁশ দিয়ে শহীদ জননীর কবরস্থান ঘেরা হলেও ভেঙে পড়েছে তা। সমাধিটি দেখার যেন কেউ নেই।

একাধারে লেখক, শহীদ জননী, কথাসাহিত্যিক, শিক্ষাবিদ এবং একাত্তরের ঘাতক দালাল বিরোধী আন্দোলনের নেত্রী ছিলেন জাহানারা ইমাম। স্বাধীনতা যুদ্ধে জ্যেষ্ঠ পুত্র শফি ইমাম রুমী অংশ নিয়ে পাক বাহিনীর হাতে আটক ও নির্মমভাবে শহীদ হন। স্বাধীনতা লাভের পর ছেলেহারা মা জাহানারা ইমাম ‘শহীদ জননী’র মযার্দায় ভূষিত হন। তার নেতৃত্বেই স্বাধীনতাবিরোধীদের বিচারের দাবি গণদাবিতে রুপ নেয়। কিন্তু এমন নেত্রীর সমাধি সংরক্ষণের কোনো দায় যেন নেই কারও।

বিশিষ্টজনরা বলছেন, স্বাধীনতার চেতনা টিকিয়ে রাখা এবং যুদ্ধাপরাধের বিচার নিশ্চিত করার স্বার্থেই জাহানারা ইমামের সমাধি সংরক্ষণ করা উচিত। তবে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন বলছে, কোনো ব্যক্তির সমাধিস্থল স্বতন্ত্রভাবে সংরক্ষণের সুযোগ নেই তাদের। তবে কেউ যদি সংরক্ষণ করতে চায় তাহলে গণপূর্ত বিভাগের অনুমতি নিয়ে সিটি কর্পোরেশনকে জানাতে হবে।

আত্মীয়ের কবর জেয়ারত করতে আসা আব্দুস সবুর নামে প্রবাসী বাঙালি বুদ্ধিজীবী করবস্থানে দাঁড়িয়ে জাগো নিউজকে বলেন, জাহানারা ইমাম দলমত নির্বিশেষে দেশে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিকে গণদাবিতে রুপান্তরিত করার জন্য আন্দোলন করেছেন। তার আন্দোলনই আজ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে দেশে। ঐতিহাসিক চিন্তা থেকে হলেও শহীদ জননীর সমাধি সংরক্ষণ করা উচিত।

এ বিষয়ে শিক্ষাবিদ, ইতিহাসবিদ ও ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির নেতা অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন জাগো নিউজকে বলেন, ‘কবর সংরক্ষণের বিষয়ে পরিবারেরও মতামতের বিষয় রয়েছে। আমি ঘাতক দালাল নির্মুল কমিটির নেতা হিসেবে কমিটির অন্যদের সঙ্গে কথা বলবো। পাশাপাশি কি পদক্ষেপ নেয়া যায় সে ব্যাপারে শহীদ জননীর পরিবারের সঙ্গেও কথা বলবো।

বিশিষ্ট আইনজীবী রানা দাশ গুপ্ত জাগো নিউজকে বলেন, পাকিস্তান আমল থেকে এদেশে স্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক লড়াইয়ে যারা ভূমিকা পালন করেছেন তাদের সবার সমাধি সংরক্ষণ করা দরকার আমাদের নিজেদের স্বার্থে। শহীদ জননী জাহানারা ইমাম যে ভূমিকা পালন করেছিলেন, তা আমাদের ইতিহাসের জ্বলন্ত অধ্যায়। অতএব শহীদ জননীর সমাধিস্থল যদি সংরক্ষণ করা না হয়, উপেক্ষিতই থাকে তবে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে আন্দোলন এবং স্বাধীনতাবিরোধীদের বিপক্ষের আন্দোলন তা ইতিহাস থেকে বিস্মৃত হয়ে যাবে। এতে লাভবান হবে স্বাধীনতাবিরোধীরা। স্মৃতি যদি লোপ পায় তবে লাভ তো তাদেরই। সুতরাং আমি মনে করি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগেই শহীদ জননীর সমাধি সংরক্ষণ করা দরকার।

jahanara

শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানের আনসার সদস্য আব্দুস সালাম জাগো নিউজকে বলেন, এখানে অনেকের কবর আছে। ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদায় অবশ্যই হয়তো শহীদ জননীর সমাধি সংরক্ষণ করা উচিত। কিন্তু সে দায় তো পরিবারের। এখানে সে ধরনের কোনো নিয়ম নেই।

তিনি বলেন, ‘আমার জানা মতে কোনো ব্যক্তির নামে স্বতন্ত্র কবর রাখার ব্যবস্থা বর্তমানে বন্ধ আছে। তবে সর্বোচ্চ ১/২ বছর পর্যন্ত কবরগুলো সংরক্ষণ করতে দেখেছি।

মিরপুর-১ থেকে শাহ আলী মাজার হয়ে পশ্চিম দিকে ৩০০ গজ গিয়ে হাতের ডান দিকে অর্থাৎ উত্তরে আরও ১০০ গজ গেলেই মিরপুর বুদ্ধিজীবী কবরস্থান। প্রতিষ্ঠার শুরুতে পারিবারিকভাবে চালু হলেও পরবর্তীতে এই কবরস্থানটি সরকারের সহযোগিতায় পরিপূর্ণতা লাভ করে। আয়তনের দিক থেকে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন যে কয়টি কবরস্থান রয়েছে তার মধ্যে এই কবরস্থানটি সবচেয়ে বড়। এটি ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের অঞ্চল-৭ এর অন্তর্ভুক্ত।

ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের সমাজকল্যাণ কর্মকর্তা এনায়েত হোসেন বলেন, সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে কেবল মুক্তিযোদ্ধাদের কবর সংরক্ষণ করা হয় ১০ বছর পর্যন্ত। অন্য কবরগুলো দু’বছর পর্যন্ত দেখভাল করে সিটি কর্পোরেশন। বাকি সব কবর পারিবারিক উদ্যোগেই সংরক্ষণ করা হয়।

তিনি বলেন, এই সংরক্ষিত জায়গায় প্রায় ৩ হাজার মানুষের কবর হবে। বর্তমানে কোন ব্যক্তি বা পরিবারের নামে কবরের জায়গা বরাদ্দ দেয়া বন্ধ আছে। তবে যারা আগেই সংরক্ষিত স্থানে জায়গা কিনেছে তাদের রক্তের সম্পর্ক আছে এমন কেউ মৃত্যুবরণ করলে পূর্বের ক্রয় রশিদ দেখিয়ে তার মেয়াদ থাকা অবস্থায় ৩ হাজার ২০ টাকা জমা দিয়ে পুনরায় সেই জায়গায় নতুন কবর দিতে পারবে। এছাড়া কোন ব্যক্তির নামে স্বতন্ত্র কবর রাখার ব্যবস্থাও বর্তমানে বন্ধ আছে।

তবে কেউ যদি কোনো ব্যক্তির সমাধিস্থল স্বতন্ত্রভাবে সংরক্ষণ করতে চায় সেক্ষেত্রে গণপূর্ত বিভাগের অনুমতি নিয়ে সিটি কর্পোরেশনকে জানাতে হবে। যদিও এ ধরনের আবেদন কখনো সিটি কর্পোরেশন পায়নি বলে জানান তিনি।

উল্লেখ্য, ১৯৯২ সালের ১৯ জানুয়ারি ১০১ সদস্যবিশিষ্ট একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি গঠিত হয় জাহানারা ইমামের নেতৃত্বে। ১১ ফেব্রুয়ারি ১৯৯২ ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়ন ও একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল জাতীয় সমন্বয় কমিটি’ গঠিত হয়। ১৯৯৪ সালের ২৬ জুন আমেরিকার মিশিগান স্টেটের ডেট্রয়েট শহরের হসপিটালে ৬৫ বছর বয়সে মারা যান জাহানারা ইমাম।

জেইউ/এএস/এআরএস/জেআই্এম

আপনার মতামত লিখুন :