ভূমিকম্প মোকাবেলায় প্রয়োজন পেশাদার যৌথবাহিনী : ফায়ার ডিজি
সম্প্রতি শক্তিশালী ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত নগরীতে পরিণত হয়েছে নেপাল। সময়ের সঙ্গে পাল্লা বাড়ছে মৃতের সংখ্যা। একই সময়ে জোরালো ভূমিকম্পে কেঁপেছে ভারতসহ বাংলাদেশও। কম্প্রেহেনসিভ ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রামের (সিডিএমপি) এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ঢাকায় সাড়ে ৬ মাত্রার ভূমিকম্প হলে প্রায় ৭৮ হাজার ভবন সম্পূর্ণ ধসে পড়বে! ৭ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্পে দেশের অবকাঠামোগত ক্ষতি হবে প্রায় ৮ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। এছাড়াও ভূমিকম্পে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হবে রাজধানীর ১০টি প্রথম সারির হাসপাতালসহ ২৪১টি ক্লিনিক এবং ৯০টি স্কুল।
সম্প্রতি রিখটার স্কেলে ৭ দশমিক ৯ মাত্রার ভূমিকম্পে লণ্ডভণ্ড হয়ে গেছে এশিয়ার হিমালয়কন্যা নেপাল। তবে একই মাত্রার ভূমিকম্পে কেমন হবে রাজধানী ঢাকার চিত্র? জাগো নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এ বিষয়ে জানিয়েছেন বাংলাদেশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আলী আহমেদ খান। দুই পর্বের সাক্ষাৎকারের শেষ পর্বটি থাকছে আজ।
মোহাম্মদ আলী আহমেদ খান বলেছেন, দেশে ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের সংখ্যা বাড়াতে হবে। আর দুর্যোগ মোকাবেলায় ফায়ার সার্ভিস সদস্যদের সঙ্গে অন্য বাহিনীর সদস্যদের সমন্বয়ে একটি দল গঠন করা যেতে পারে। যাতে সমন্বিতভাবে মোকাবেলা করা যায়।
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আলী আহমেদ খান জাগো নিউজকে বলছিলেন, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের হিসেব অনুযায়ী দেশে মোট ২৭৩টি ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন রয়েছে। তবে একটি থেকে অন্যটির দূরত্ব অনেক বেশি।
ফায়ারের এই কর্তা বলেন, ‘যেহেতু বাংলাদেশ দুর্যোগপ্রবণ একটি দেশ। তাই দেশের অন্য খাতে উন্নয়নের পাশাপাশি সরকারকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ফায়ার সার্ভিস স্টেশন তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে। আন্তর্জাতিকভাবে, একটি স্টেশন থেকে আরেকটি স্টেশনের দূরত্ব থাকে ১৫ মিনিটের। কিন্তু বাংলাদেশে যা সম্ভব নয়।`
বাহিনীগুলোর সমন্বয় থাকা আবশ্যক : ভূমিকম্পে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে এখন থেকেই সমন্বিত পরিকল্পনা করতে হবে বলে জানান মহাপরিচালক আলী আহমেদ খান। তিনি বলেন, `একটি বড় দুর্ঘটনায় শুধু ফায়ার সার্ভিস কাজ করবে তা নয়। সেখানে অন্যান্য বাহিনীর সঙ্গে বিদ্যুৎ-গ্যাসসহ সব ক্ষেত্রের সমন্বয় করে একটি টিম তৈরি উচিত। বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে এখন থেকেই সব বাহিনীর কাজ ভাগ করে নিতে হবে। উদ্ধার কাজে বাহিনীদের সমন্বয় না থাকলে ভূমিকম্প পরবর্তী দুর্যোগ আরও বড় আকার ধারণ করতে পারে।`
বড় দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রস্তুত স্পেশাল রেসপন্স টিম : দুর্যোগ বিবেচনায় ঢাকা শহর অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ভূমিকম্পের মতো ঢাকায় বড় ধরনের দুর্যোগ মোকাবেলায় ৩০০ জনের স্পেশাল রেসপন্স টিম প্রস্তুত রাখা হয়েছে। টিমের সদস্যদের বাংলাদেশের বিভাগীয় ফায়ার স্টেশন থেকে নির্বাচন করে বিদেশ থেকে দুর্যোগ মোকাবেলায় প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে।
আলী আহমেদ খান বলেন, ‘স্পেশাল রেসপন্স টিমের সদস্যরা দেশের অন্যান্য ফায়ার ফাইটার ও রেসকিউউইং টিমকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। সারাদেশের বিভিন্ন স্টেশনে তাদের ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা হয়েছে।’
আরবান ভলেন্টিয়ার নিয়োগ : দুর্যোগের বিপর্যয় মোকাবেলায় এখন থেকেই এলাকাভিত্তিক স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক (ভলান্টিয়ার) নিয়োগ করছে ফায়ার সার্ভিস। ২০১০ সালে মোট ৬২ হাজার আরবান ভলেন্টিয়ার নিয়োগের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে কাজ শুরু করে ফায়ার সার্ভিস। ইতোমধ্যে প্রায় ৩০ হাজার ভলেন্টিয়ার নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে।
আলী আহমদ আরো জানান, ‘ছাত্র, দোকানদার, দারোয়ানসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষকে এলাকাভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। ফায়ার ফাইটিংয়ের প্রশিক্ষণসহ বিভিন্ন মহড়ায় অংশগ্রহণ করানো হয়। কোনো দুর্ঘটনায় ফায়ার সার্ভিস পৌঁছানোর আগেই কাজ শুরু করবে ভলান্টিয়াররা। তবে পারিশ্রমিক না দেয়ায় অনেকেই হতাশ হয়ে পড়ছেন।’ এক্ষেত্রে সরকার একটি প্রকল্প হাতে নিয়ে তাদের জন্য একটি তহবিল করতে পারে বলে জানান তিনি।
প্রয়োজন মহড়া ও ট্রেনিং একাডেমি : এ বিষয়ে মহাপরিচালক বলেন, ‘এ পর্যন্ত ফায়ার সার্ভিসসহ অন্যান্য বাহিনীর সদস্যরা অনেক প্রশিক্ষণ নিয়েছনি। তবে নিয়মিত এগুলোর মহড়া করলে তারা দুর্যোগ মোকাবেলায় আরো অভিজ্ঞ হবে।’
এ ধরনের প্রশিক্ষণের জন্য দেশে কোনো ট্রেনিং একাডেমি নেই উল্লেখ করে আলী আহমেদ খান বলেন, ‘যত দ্রুত সম্ভব দুর্যোগ মোকাবেলার প্রশিক্ষণের জন্য একটি একাডেমি তৈরি করতে হবে।’
ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জন্য টেবিলটপ এক্সারসাইজ : সম্প্রতি ভূমিকম্পের মতো বড় ধরনের দুর্যোগ মোকাবেলার প্রস্তুতি হিসেবে দেশের ফায়ার স্টেশন সমূহের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের টেবিলটপ এক্সারসাইজ নামে ব্যতিক্রমধর্মী একটি প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণে কর্মকর্তাদের ফায়ার ফাইটিং টিম, মেডিকেল টিম, রেসকিউ অ্যান্ড সার্চিং টিমে ভাগ করে বিভিন্ন দুর্যোগ-পরিস্থিতি অনুযায়ী সমস্যা প্রদান ও তার সমাধান খুঁজে বের করার উপায় শেখানো হয়েছে বলেও জানান ফায়ার সার্ভিসের এই কর্তা।
স্কুল পর্যায়ে প্রশিক্ষণ এখনই জরুরি : ছোট ছেলেমেয়েদের এখন থেকেই ভূমিকম্পসহ সকল দুর্যোগের জন্য প্রস্তুত করতে হবে। আলী আহমেদ খান বলেন, ‘জাপানসহ বেশ কয়েকটি উন্নত দেশে দুর্যোগ সম্পর্কে বাধ্যতামূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দেয়া হয়। আমাদের দেশেও এটি চালু করা জরুরি হয়ে পড়েছে। এছাড়াও পারিবারিক, সামাজিকভাবে সচেতনতা সৃষ্টির উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।’
এআর/আরএস/বিএ/আরআইপি