থাইল্যান্ডে গণকবর : কক্সবাজার উপকূল-সমতলে আহাজারি


প্রকাশিত: ০৫:১২ এএম, ১০ মে ২০১৫

কক্সবাজার সদরের ঈদগাঁও কলেজ পল্লীর মৃত আবদুল মতলবের ছেলে বেলাল উদ্দিন (৩০) পেশায় রিকশাচালক। স্ত্রী, তিন সন্তান নিয়ে তার পরিপাটি সংসার। নিজের রিকশাটি পছন্দমতো সময়ে চালিয়ে যা আয় হতো তা দিয়ে সুন্দরভাবেই চলছিল সংসার।পরিজন নিয়ে সুখেই কাটতো তার দিন।

এরই মাঝে রিকশার প্যাডল ঘুরানো বাদ দিয়ে মালয়েশিয়ান মুদ্রায় ভাগ্যের চাকা ঘুরানোর প্রস্তাব পান তিনি। কিন্তু জমানো কোনো টাকা তার কাছে নেই। তাহলে কীভাবে ভাগ্য বদলানোর দেশ মালয়েশিয়া পাড়ি দিতে পারে বেলাল? বিনা টাকায় স্বপ্নের দেশে পৌঁছানোর পথ দেখিয়ে দেন পাচারকারী দলের এক রোহিঙ্গা সদস্য। মাত্র ১০ হাজার টাকা যোগাড় হলেই পাড়ি দেয়া সম্ভব তার! প্রস্তাব মনে ধরে বেলালের। রিকশা ও বৌয়ের শখের গয়না বিক্রি করে টাকা তুলে দেয়া হলো দালালের হাতে। একদিন রাতে রওনা হলেন বেলাল।

তার যাওয়া দেখে নিরবে তারই পদাঙ্ক অনুসরণ করলেন প্রতিবেশী বদি আলম মাঝির ছেলে নাছির উদ্দিন (২১) ও আরেক আত্মীয় জসিম উদ্দিন (২৬)। ১৫ দিন পর খবর এলো বেলাল থাইল্যান্ডের বনে পাচারকারীদের হাতে বন্দি। দাবি করা ২ লাখ টাকা পরিশোধ হলে তাকে মালয়েশিয়ার পথে ছেড়ে দেয়া হবে। দেশে অনাহার অর্ধাহারে থাকা হতদরিদ্র মা ও স্ত্রীর পক্ষে টাকা জোগাড় করা সম্ভব হয়নি। এভাবে আরো পক্ষকাল অতিবাহিত হওয়ার পর এক রাতে খবর এলো শারীরিক নির্যাতন ও ক্ষুধার তীব্রতায় মারা গেছেন বেলাল।

এ খবর এলাকায় আসার পর বেলালের পরিবারে চলে শোকের মাতম। আর নাছির-জসিমের খোঁজে হন্যে হয়ে পড়নে তাদের আত্মীয়-স্বজনরা। এটি ২০১৩ সালের শেষের দিকের ঘটনা।
 
মাঝখানে একটি বছর কেটে গেছে। হারানো নাছির-জসিমের খবর এখনো পাননি তাদের পরিবার। উল্টো তাদের এ বেদনার সঙ্গে যোগ হয়েছে কক্সবাজারের সমতল-উপকূলের বিভিন্ন এলাকার আরো অসংখ্য নাছির-জসিমের হারিয়ে যাওয়ার কাহিনী। এভাবে স্বল্প সময়ে বিত্তবান হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে অসংখ্য কিশোর-যুবক ও মধ্য বয়সীদের সাগর পথে পাচার করেছে অর্থলিপ্সু একদল দানব। নানাভাবে খবর নিয়ে নিখোঁজদের অবস্থান জানা সম্ভব না হওয়ায় অনেকে গায়েবানা জানাজা, চেহলাম ও মিলাদ পড়িয়ে হারানো সন্তানের মঙ্গল কামনা করে নিত্য কাজে মনোনিবেশ করেন।

কিন্তু সম্প্রতি থাইল্যান্ডের জঙ্গলে গণকবরের সন্ধান পাওয়ার খবরে কক্সবাজার থেকে মালয়েশিয়ার পথে পা বাড়িয়ে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের পরিবারে আহাজারি চলছে। বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে কোন এলাকার কে মালয়েশিয়ার পথে গিয়ে নিখোঁজ রয়েছেন।

এলাকাবাসীর দেয়া তথ্য মতে রামুর দরিয়ারদীঘি এলাকায় নিখোঁজদের মধ্যে রয়েছে ওই এলাকার গোলাম সোবাহানের ছেলে কালু, গোলাম হোসেনের ছেলে ফরিদুল আলম, সোনা আলীর ছেলে ফরিদ মিয়া, নাজির হোসেনের ছেলে ফরিদুল আলম, কাদের হোসেনের ছেলে মো. আলম, সুলতান আহমদের ছেলে তৈয়ুব উল্লাহ, আলী আহমদের ছেলে আলম, ইসলাম মিয়ার ছেলে মুহিব উল্লাহ, আলী আকবরের ছেলে আবু সিদ্দিক, ঠাণ্ডা মিয়ার ছেলে কামাল হোসেন, আবুল কালামের ছেলে খাইরুল আমিন।

উখিয়ার সোনাইছড়ির মো. ইমরান, ইসলাম মিয়া, আবু তাহের, দক্ষিণ সোনাইছড়ির সাইফুল ইসলাম, পূর্ব সোনার পাড়ার মো. ইসহাক, পশ্চিম সোনাইছড়ির মানিক, সোনার পাড়ার নুর আলম, কায়সার হামিদ। আর এদের সবার বয়স ১২ থেকে ১৮-এর মধ্যে। উপজেলার প্যাচারদ্বীপ করাচি পাড়ার কাশেম আলীর পুত্র আব্দুল গফুর প্রকাশ কালাইয়াও গত ১ বছর ধরে নিখোঁজ রয়েছেন। তিনি সোনার পাড়া এলাকার আলোচিত রেবি ম্যাডামের মাধ্যমে সাগর পথে মালয়েশিয়া গিয়েছিলেন। তিনি বেঁচে আছেন নাকি মারা গেছেন জানেন না তার পরিবার। থাইল্যান্ডের গণকবরের কথা শুনে গফুরের বৃদ্ধ বাবা কেঁদে উঠেন। তেমনি করে কাঁদছেন নাছির-জসিমের পরিবার।

আবার মালয়েশিয়ায় পাচারের শিকার অনেক স্বপ্নবাজ পুরুষের মারা যাওয়ার খবরও আসছে। তাদের মধ্যে উখিয়ার সোনার পাড়ার মো. উল্লাহর ছেলে মৃত মোহাম্মদ ইউনুস, পশ্চিম সোনাইছড়ির জমির আহমদ আহমদের ছেলে আফাজ উদ্দিন, রত্মাপালংর শফিউল আলম এর ছেলে মো. ইসমাইল, সোনার পাড়ার ইসলাম মিয়া ছেলে আক্তার হোসেন। মনখালী এলাকার আশু আলী মারা গেছেন বলে খবর পেয়েছেন পরিবার। তাদের অনেকের গায়েবানা জানাজা ও চেহলাম এবং মিলাদ পড়ানো হয়েছে।
 
ভুক্তভোগী অনেক পরিবারের অভিযোগ, দালালদের কাছে টাকা দেয়ার পরও তাদের সন্তানদের কোনো খোঁজ পাওয়া যায়নি। তাদের দাবি, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দুর্নীতিবাজ কিছু কর্মকর্তার সহায়তায় গত ৩ বছরে লক্ষাধিক লোক পাচারের শিকার হয়েছেন। তাদের মাঝ থেকে ৩ হাজরেরও বেশি লোক নিখোঁজ রয়েছনি।

ওয়াকিবহাল মহলের মতে, উখিয়া উপজেলার মনখালী, ছেপটখালী, চোয়াংখালী, মাদারবনিয়া, মো. শফিরবিল, পাটুয়ার টেক, রূপপতি, নিদানিয়া, ইনানী, রেজুরকুল, সোনাইছড়ি ও বাদামতলীর ঘাট দিয়ে প্রতিরাতে মানবপাচার করে আসছিল একটি চক্র। শুধু স্থানীয় নয় দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে লোক জোগাড় করে সাগরের বুকে অনিশ্চিত যাত্রায় তুলে দিয়েছেন এ সিন্ডিকেট। সাগর উপকূলের নিরাপত্তা চৌকি পুলিশ ফাঁড়ির অসাধু কর্মকর্তারা বিনিময় নিয়ে পাচারকারিদের সহযোগিতা করেছে।

অসমর্থিত একটি সূত্র মতে, মাথাপিছু এক হাজার টাকা করে পুলিশ ফাঁড়িতে পৌঁছে দিয়ে বোট ছাড়তে পেরেছে পাচারকারিরা। এসময় সিভিল পোশাকে পুলিশের কিছু সদস্য ওই এলাকায় উপস্থিত থেকে পাচারকারিদের নির্ভয় দিয়েছে।

উপকূলের ইনানী পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ আলা উদ্দিন পাচারকারিদের কাছ থেকে টাকা নেয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে জাগো নিউজকে বলেন, গত ৫ মাসে উপকূলের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৬০ মালয়েশিয়াগামীকে উদ্ধার করে ইনানী পুলিশ। এসময় ২০ জন দালালকে আটক করে তাদের বিরুদ্ধে ৬টি মামলা করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

উপকূলে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, উখিয়ার ১৩টি পয়েন্ট ব্যবহার করে ছোটখালী এলাকার মৃত মোস্তাফিজুর রহমানের ছেলে মোহাম্মদ ফয়েজ, মাষ্টার শরিফ মোহাম্মদের ছেলে আবুল কালাম, মনখালীর মনির আহমদের ছেলে নরুল আবছার, জাফর আহমদের ছেলে আবুল কালাম, মৃত রহমত শরিফের ছেলে বাহদুর, জাফর আহমদের ছেলে আবু বক্কর, ছোয়াংখালী এলাকার বদি আলমের ছেলে মোজাম্মেল, মাদারবনিয়ার ছালেহ আহমদের ছেলে জামাল হোসেন, মো. আলমের ছেলে আবু তাহের, চোয়াংখালীর মোহাম্মদ মিয়ার ছেলে আয়ুব আলী, শুক্কুর আহমদের ছেলে আব্দু জলিল, স্থানীয় মেম্বার জাহেদ, সোনার পাড়া ও সোনাই ছড়ি এলাকার রেবি ম্যাডামের ভাই মুসলেম উদ্দিন, জালাল উদ্দিন, শামসুর আলম, আব্দুল্লাহ আল মামুন, আবু তাহের, রুস্তম আলী, আবুল হোসন, ছিদ্দিক, শফিউল আলম, নুরুল কবিরসহ আরো অনেকে আদম পাচার করে আসছেন। পুলিশের সহযোগিতায় তারা এ অপরাধ চালান বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগীরা।


উখিয়া-টেকনাফ উপকূলীয় এলাকায় মানবপাচার প্রতিরোধে কাজ করছে বেসরকারি সংস্থা হেলপ। সংস্থার কক্সবাজারের নির্বাহী পরিচালক এম এ কাশেম জানান, মানবপাচার নিয়ে টাকা পয়সা লেনদেন ও নিখোঁজ যাত্রীর ঘটনা নিয়ে তাদের কাছে প্রায় ৫ শতাধিক অভিযোগ রয়েছে।

অপরদিকে, মানবপাচারের সাথে আন্তর্জাতিক চক্রের সম্পৃক্ততা নিয়ে সম্প্রতি পুলিশের সদর দফতরে একটি প্রতিবেদন দিয়েছে পুলিশের বিশেষ দল। থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়াসহ চার দেশের ২৪১ দালালের সম্পৃক্ততার বিষয়ে আলোকপাত করা হয়েছে এ গোপন প্রতিবেদনে।

প্রতিবেদনের সত্যতা নিশ্চিত করে তদন্ত দলের প্রধান ও চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (অপরাধ ও অপারেশন) বনজ কুমার মজুমদার সম্প্রতি সাংবাদিকদের বলেছিলেন, তালিকাভুক্ত দালালদের আটক করে উপকূলের মানব পাচার ঠেকানোর জন্য কাজ করছে পুলিশ। গত ৯ মার্চ হামিদ করিম নামে মিয়ানমারের এক দালালসহ কয়েকজনকে আটক করে পুলিশ মানব পাচার চক্রের তথ্য উদঘাটন করেছে।

পুলিশ সূত্র জানায়, মানব পাচারের বড় একটি চক্রের নেতৃত্ব দেন হামিদ করিম। চট্টগ্রামের আগ্রাবাদ এলাকায় অবস্থান করে হামিদ প্রতি মাসে দুই থেকে তিনটি জাহাজে করে মালয়েশিয়ায় মানব পাচার করে থাকেন। দেশজুড়ে তাঁর নিজস্ব এজেন্ট রয়েছে, যারা ৪০ জেলা থেকে পাচারের জন্য লোক সংগ্রহ করেন।

প্রতিবেদনে বলা হয়, পাচারকারিরা ট্রলারে তোলার পর যাত্রীদের নির্যাতন করেন। যাত্রীদের ১৫ দিন থেকে এক মাস পর্যন্ত সাগরে ট্রলারে ফেলে রাখা হয়। সেসময় শুধু শুকনো খাবার দেয়া হয়। নারীদের যৌন হয়রানি করা হয়। প্রতিবাদ করলে হত্যা করে সমুদ্রে ফেলে দেয়া হয়। আর মুক্তিপণের টাকা না পেলে যাত্রীদের থাইল্যান্ড উপকূলের জঙ্গলে ফেলে দেয়া হয়।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা তথ্যের সত্যতা পাওয়া গেছে পাচারের পর থাইল্যান্ড থেকে ভাগ্যক্রমে ফিরে আসা বেশ কয়েকজনের বিবরণে।

পাচার ফেরত কক্সবাজারের নুনিয়ারছড়া এলাকার আব্দুল করিম জাগো নিউজকে জানান, শামলাপুরের মৃত কামাল উদ্দিন মেম্বারের ছেলে আশু আলীর মাধ্যমে তিনি সাগর পথে মালেয়শিয়া যান। সেখানে কোন এক জঙ্গলে তাকে আটকে রেখে ব্যাপক মারধর করা হয়। পরে ৩ লাখ টাকা দিয়ে ছাড়া পান করিম।

থাইল্যান্ডে পাচারকারিদের নির্মম অত্যাচারের হাত থেকে রেহাই পেয়ে সম্প্রতি দেশে ফিরে আসা হলদিয়া পালং ইউনিয়নের মরিচ্যা গ্রামের ১৭ বছরের যুবক শফিউল আলমন জানান, থাইল্যান্ডের জঙ্গলে একটি গর্তে তাকেসহ বেশ কয়েকজনকে একমাস ধরে মুক্তিপণের জন্য আটকে রাখা হয়। পরবর্তীতে তার পিতা বসতভিটা বন্ধক রেখে দালালদের চাহিদামতো টাকা পরিশোধ করলে তাকে মুক্তি দেন তারা। এসময় শফিউলের চোখে মুখে নির্যাতনের আতঙ্ক ভেসে উঠে। তার মতে, যেখানে তাদের রাখা হয়েছিল সেটি ছিল এক মৃত্যুপুরী।

একইভাবে মালয়েশিয়া থেকে দেশে ফিরে আসা চোয়াংখালী গ্রামের আলতাজ মিয়ার ছেলে শমশের আলম (১৮) জানান, পরিবারের স্বচ্ছলতা আনতে দালালের হাত ধরে মালয়েশিয়া পাড়ি দিতে গিয়ে তাকে প্রায় দেড় মাস নির্যাতনের শিকার হতে হয়েছে।

পুলিশের সেই প্রতিবেদনে আরো উল্লেখ করা হয়, টেকনাফ স্থলবন্দরে আমদানি পণ্য নিয়ে আসা জাহাজ ও ট্রলারগুলো ফিরে যাওয়ার সময় যাত্রী নিয়ে যায়। মানব পাচারে মিয়ানমারের নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ড সক্রিয় সহযোগিতা করে।

প্রতিবেদনে আন্তর্জাতিক মানব পাচারকারি হিসেবে ১১ জনের নাম তুলে ধরা হয়েছে। তারা হলেন থাইল্যান্ডের ফুডাবা জেলার রোনাং থানার থেন, মং ও মানাকিং। মিয়ানমারের বুচিদং জেলার আবদুল গফুর, দিল মোহাম্মদ, মালয়েশিয়ায় বসবাসকারী টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপ মিস্ত্রিপাড়ার আবদুল আমিন, আক্তার হোসেন, আবু তৈয়ুব, দক্ষিণ নয়াপাড়ার আনার আলী, রঙিখালী গ্রামের সলিম উল্লাহ, থাইয়ংখালীর মো. সুমন। মালয়েশিয়ান নারী মানাকিং থ্যাইল্যান্ড অবস্থান করে মানব পাচার নিয়ন্ত্রণ করছেন।

প্রতিবেদনে দেশের ২৩০ জন মানব পাচারকারির তালিকা তুলে ধরা হয়। ১ নম্বরে রয়েছেন পাবনার সুজানগরের হেমজপুরের মহসীনের (৪২) নাম। এরপর আছে হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলার নাজিরপুল গ্রামের শহিদ মিয়া (৩০), যশোরের ডুমুরখালীর মিলন হোসেন (২৫), নড়াইলের কচুয়াডাঙ্গার বিদ্যুৎ শেখ (৪০) ও টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের মো. সেলিম ওরফে লম্বা সেলিমের নাম।

স্থানীয় সূত্র মতে, টেকনাফ উপকূলেও মানবপাচারকারিরা নির্ধারিত পরিমাণ একটি অংশ পুলিশ-বিজিবি ও কোস্টগার্ডের জন্য রেখে দিয়ে অথবা আগে ভাগে পৌঁছে দিয়ে মানবভর্তি ট্রলার থাইল্যান্ডের উদ্দেশ্যে ছাড়া হতো। তবে বিষয়টি অস্বীকার করেছে সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্তা ব্যক্তিরা।
পুলিশ প্রতিবেদনে মানব পাচার প্রতিরোধে আট দফা সুপারিশ করা হয়। এগুলো হচ্ছে, তালিকাভুক্ত দালালদের গ্রেফতার, মানব পাচারের ঘটনায় আটক ব্যক্তিদের বিশেষ আদালতে বিচার, মানব পাচার মামলা দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে পরিচালনা, মানব পাচারের মূল কেন্দ্র শাহপরীর দ্বীপে পূর্ণাঙ্গ পুলিশ তদন্ত কেন্দ্র স্থাপন, উপকূলীয় প্রতি জেলায় ওয়ার্ড-পর্যায়ে মানব পাচার প্রতিরোধ কমিটি গঠন, টেকনাফ ও উখিয়া উপকূলের ৮০ কিলোমিটার সীমান্তে মিয়ানমারের নাগরিকদের অনুপ্রবেশ রোধ ও মানব পাচার ঠেকাতে নৌ-পুলিশের ইউনিট স্থাপন এবং হুন্ডি ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা।

অন্য সূত্র মতে, মৃত্যু এবং নিখোঁজ সংবাদ প্রচার পাওয়ায় আগের মতো জমজমাট ভাবে মানবপাচার না হলেও পাচারের ধারাবাহিকতা কমেনি। কিছু ভিকটিম উদ্ধার ও পাচারসহায়ক আটক হলেও সিন্ডিকেটের মূল হোতারা ধরা ছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছেন। ফলে পয়েন্ট পরিবর্তন করে পাচার অব্যাহত রয়েছে। সেভাবে অব্যাহত রয়েছে থাইল্যান্ড এবং ভারতের আন্দামানে আটকে রেখে পরিবার থেকে মোটা অঙ্কের টাকা আদায় এবং টাকা দিতে ব্যর্থ হলেই চলে নির্যাতন, যার পরিণতি মৃত্যু ও গণকবর।

কক্সবাজার পুলিশ সুপার শ্যামল কান্তি নাথ জাগো নিউজকে জানান, পুলিশের ধারাবাহিক অভিযানের ফলে সাগরপথে মানবপাচার আগের তুলনায় কমেছে। গত এক বছরে সহস্রাধিক পাচার ভিকটিম উদ্ধার করেছে পুলিশ। এসময় ৩৫ দালালকে আটক করে তাদের বিরুদ্ধে ৩০টি মামলা  করা হয়। এছাড়াও পুলিশ ৬ মে  টেকনাফ, উখিয়া ও কক্সবাজার সদরে অভিযান চালিয়ে ৬ পাচারকারিকে আটক করেছে। তাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে।

পাচারকারিদের কাছ থেকে পুলিশের কোন সদস্য সুবিধা নিয়েছে বলে তার জানা নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন,  কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে তৎক্ষণাত ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান।  

একাধিক বেসরকারি সংস্থা ও মানবাধিকার সংগঠন সূত্র জানায়, মানবপাচার প্রতিরোধে ২০১২ সালে প্রণীত নতুন আইনের সঠিক প্রয়োগ না হওয়ার কারণেই দিন দিন মানবপাচার বাড়ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সমুদ্রপথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ অন্যান্য সরকারি সংস্থার দুর্বল টহলের কারণে গত ৮ বছরে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার থেকে ট্রলারযোগে প্রায় আড়াই লাখ মানুষ মালয়েশিয়া যাওয়ার জন্য থাইল্যান্ডের জঙ্গলকে ল্যান্ড রুট হিসেবে ব্যবহার করে। সেখানে মুক্তিপণের টাকা দিয়ে কেউ কেউ মালয়েশিয়া যেতে পেরেছেন। কেউ মালয়েশিয়ায় গিয়ে ধরা পড়াসহ মানবেতর জীবনযাপন করছেন। কারও হয়েছে করুণ মৃত্যু। যেমনটি ঘটেছে থাইল্যান্ডের গণকবরে। গত বছর সেপ্টেম্বরেও ওই জঙ্গল থেকে বাংলাদেশিসহ ৩৭ জন আটক হন।

মানবপাচার নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর মাইগ্রেশনের (আইএমও) মতে, মানবপাচার প্রতিরোধে ২০১২ সালের নতুন আইনের কঠোর প্রয়োগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জোর তৎপরতা এবং শক্তিশালী সীমান্ত ব্যবস্থাপনা থাকলেই এটা বন্ধ করা সম্ভব। এ ছাড়া দেশব্যাপী জনসচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন বিশেষ করে পথনাটক, সিনেমা, কমিউনিটি ওরিয়েনটেশনে মানবপাচারের ক্ষতিকারক দিক তুলে ধরলেও মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি হবে। এ সংক্রান্ত আইন সম্পর্কে উচ্চ এবং নিম্ন আদালতের বিচারপতিদের ব্রিফ করাও উচিত বলে মনে করে আইওএম।

বাংলাদেশ সরকারের ২০১৩ সালের মানব পাচারবিরোধী এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ওই বছর সারা দেশে মোট ৩৬৬টি মানবপাচারের মামলার বিপরীতে ৪৫৮ জন গ্রেফতার হন। এর মধ্যে ১০৬টি মামলার চার্জশিট, ২০টি মামলার ফাইনাল রিপোর্ট দাখিল হয়েছে। এখনো তদন্তাধীন ২২০টি মামলা। পুলিশ, র্যা ব, বিজিবি, কোস্টগার্ড, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার সহায়তায় তৈরি ওই রিপোর্টে নতুন আইন প্রয়োগ করে মানবপাচারে রোধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সুপারিশ করা হয়।

এসব বিষয়ে দৃষ্টিপাত করা হলে বিজিবি কক্সবাজার সেক্টর কমান্ডার কর্নেল মো. খালেকুজ্জামান জাগো নিউজকে বলেন, দক্ষিণে বিশাল নীল জলরাশি, পূর্বদিকে মিয়ানমারের স্থল ও জলসীমানা এ দুই মিলে ভৌগোলিকভাবে কক্সবাজারের গুরুত্ব অপরিসীম। আর যেহেতু মানব পাচারকারিরা এ সীমান্ত ও জল পয়েন্টকে উপজীব্য হিসেবে বেছে নিয়েছনি সেহেতু সীমান্ত প্রহরী হিসেবে বিজিবি প্রাণান্ত চেষ্টায় পাচার রোধে কাজ করছে। সম্প্রতি পাচার ভিকটিম ও পাচারকারি আটক করতে গিয়ে বিজিবির এক সদস্য হাতির আক্রমণে নিহত হয়েছেন। এতে বোঝা উচিত পাচার রোধে বিজিবি প্রাণ দিতেও কুণ্ঠাবোধ করছে না।

তিনি আরো বলেন, গত ৬ মাসে বিজিবি সদস্যরা উপকূলীয় এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৭৮ জন মালয়েশিয়াগামী যাত্রীকে উদ্ধার করেছে। এসময় ৩৫ দালালকে আটক করে থানায় সোপর্দ করে তাদের বিরুদ্ধে মানবপাচার আইনে ৩০টি মামলা রুজু করে। পালিয়ে যাওয়া আরো ২৪ দালালের বিরুদ্ধেও মামলা করা হয়েছে।

বিজিবি সদস্যরা পাচারকারিদের কাছ থেকে টাকা পাওয়ার অভিযোগ সম্পর্কে সেক্টর কমান্ডার বলেন, অপরাধীদের বিরুদ্ধে কাজ করতে গেলে অনেক ধরণের প্রপাগান্ডা হয়। আসল কথা হলো, পাচারকারি চক্রের সদস্যদের আইনের আওতায় আনার পাশাপাশি জল ও স্থল দিয়ে পাচারের প্রাথমিক রুটটি বন্ধ করতে বিজিবির পাশাপাশি পুলিশ, কোস্টগার্ড, নৌবাহিনীসহ বিভিন্ন সংস্থা আলাদাভাবে তৎপর রয়েছে।

এমজেড/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।