আশঙ্কা খাত সংশ্লিষ্টদের

মধ‌্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ চললে আমিরাতে ২০ লাখ বাংলাদেশি ঝুঁকিতে পড়তে পারেন

কূটনৈতিক প্রতিবেদক কূটনৈতিক প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০২:২২ পিএম, ১৩ মে ২০২৬
যুদ্ধের কারণে উপসাগরীয় শ্রমবাজারে অনিশ্চয়তা দেখা দিতে পারে/ ছবি- সংগৃহীত

মধ‌্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ চলতে থাকলে উপসাগরীয় শ্রমবাজারে ব্যাপক অনিশ্চয়তা দেখা দেবে। শুধু সংযুক্ত আরব আমিরাতে বসবাসকারী ২০ লাখ বাংলাদেশির জীবন ও জীবিকা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

বুধবার (১৩ মে) জাতীয় প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে এ শঙ্কার কথা জা‌নিয়েছে রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস্ রিসার্চ ইউনিট (রামরু)। ‘ইরান ও উপসাগরীয় অঞ্চলের চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতি: বাংলাদেশি অভিবাসী কর্মীদের ওপর প্রভাব ও করণীয়’ নিয়ে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, যুদ্ধ চলতে থাকলে উপসাগরীয় শ্রমবাজারে ব্যাপক অনিশ্চয়তা দেখা দেবে। এই সংঘাত উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে ব্যবসায় ব্যাপক বিঘ্ন ঘটিয়েছে। সৌদি আরবের ভিশন ২০৩০ মেগাপ্রকল্পগুলো— যার মধ্যে রয়েছে নিওম (৫০০ বিলিয়ন ডলার), রেড সি ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট এবং কিদ্দিয়া এন্টারটেইনমেন্ট সিটি- বাংলাদেশের নির্মাণ ও পরিষেবা খাতের কর্মীদের জন্য বৃহৎ পরিসরে দীর্ঘমেয়াদি কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে বলে আশা করা হয়েছিল।

রামরু বলছে, বিনিয়োগকারীদের আস্থার পতন, ব্যয় বৃদ্ধি বা সরাসরি অবকাঠামোগত ক্ষতির কারণে এসব প্রকল্প ব্যাহত হলে প্রত্যাশিত কর্মসংস্থানের সুযোগ বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

সংগঠনটি আরও জানায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পক্ষ নিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতও এই যুদ্ধে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ায় ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলার শিকার হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা রয়েছে। এর ফলে সংযুক্ত আরব আমিরাতে বসবাসকারী ২০ লাখ বাংলাদেশির জীবন ও জীবিকা ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

রামরু জানায়, চলাচলে ব্যাঘাত ঘটায় খোদ অভিবাসন কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়ার মধ্যেই একটি দ্বিতীয় সংকট সৃষ্টি হয়েছে। কর্মী নিয়োগে বিলম্ব বা বাতিলের ক্ষেত্রে নিয়োগ খরচ পরিশোধ নিয়ে এজেন্ট এবং সম্ভাব্য অভিবাসী কর্মীদের মধ্যে বিরোধ দেখা দিচ্ছে। এই সংঘাত অব্যাহত থাকলে এই প্রবণতা আরও তীব্র হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

আরও পড়ুন
আমিরাতকে কেন টার্গেট করলো ইরান, আরও বড় হামলার হুমকি 
ইরানে হামলা চালায় সৌদি আরব ও আমিরাত 

সংবাদ সম্মেলনে সরকারের কিছু ঘাটতির কথা তুলে ধরা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে, সংঘাত-সম্পর্কিত আঘাত, চাকরি হারানো বা জোরপূর্বক প্রত্যাবর্তনের জন্য কোনো নির্দিষ্ট সংকট প্রতিক্রিয়া তহবিল নে। বাতিল হওয়া যাত্রা, আটকে পড়া অভিবাসী বা প্রত্যাবর্তনের প্রবাহের জন্য কোনো রিয়েল টাইম পর্যবেক্ষণ ড্যাশবোর্ড নেই। কোনো সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত, জনসমক্ষে প্রচারিত সমন্বিত প্রতিক্রিয়া পরিকল্পনা নেই। ইরান বা উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে প্রত্যাবর্তনকারীদের জন্য সংঘাত-নির্দিষ্ট কোনো পুনঃএকত্রীকরণ মডিউল নেই। যেসব কর্মী আয় হারিয়েছেন কিন্তু এখনো ফিরতে পারছেন না, তাদের জন্য আগে থেকে প্রস্তুত কোনো জরুরি খাদ্য, স্বাস্থ্যসেবা বা আশ্রয়ের ব্যবস্থা নেই।

রামরু আরও জানায়, গৃহকর্মীরা যারা সবচেয়ে বিচ্ছিন্ন এবং ঝুঁকিপূর্ণ তারা হোয়াটসঅ্যাপ-গ্রুপ ভিত্তিক সংকটকালীন যোগাযোগের আওতায় নেই। ফ্লাইটের টিকিটের পূর্বশর্তের কারণে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের ঋণ বিতরণ কার্যত বন্ধ রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ও রামরুর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ার ড. তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে প্রবাসী কর্মীদের সহায়তার জন্য সরকারের বাজেটে আলাদা একটি লাইন থাকা উচিত। এ ধরনের সংকটে দ্রুত সহায়তা নিশ্চিত করতে একটি নির্দিষ্ট তহবিল বা বাজেট কাঠামো থাকা প্রয়োজন, যা রাষ্ট্রীয়ভাবে পরিচালিত হবে।

তি‌নি বলেন, যুদ্ধ বা সংকটকালীন পরিস্থিতিতে বিভিন্ন দেশে আটক বা সাজাপ্রাপ্ত প্রবাসীদের ক্ষেত্রে অতীতে দেখা গেছে সংকটের সময় অনেককে মুক্তি দিয়ে দেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে কোভিড-১৯ মহামারির সময় কারাগার থেকে অনেক বন্দিকে মুক্তি দিয়ে নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ঘটনাও উল্লেখ করেন তিনি।

তবে একই অপরাধের জন্য দুই দেশে আলাদা শাস্তি কার্যকর করার বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনের সীমাবদ্ধতার কথাও উল্লেখ করেন তাসনিম সিদ্দিকী। তিনি আরও বলেন, শ্রমবাজার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনায় বলা হয়, যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে প্রবাসী শ্রমিকদের একটি অংশ কর্মহীন হয়ে পড়েছে এবং দেশে ফেরত আসছে। আনুমানিক প্রায় ১০ হাজারের মতো শ্রমিক আটকে থাকার তথ্য উল্লেখ করা হলেও এটি চূড়ান্ত নয়। এ সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

কারণ, অনেক দেশে এখনো নিয়োগদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো ঝুঁকির কারণে শ্রমিক নিয়োগে অনাগ্রহ দেখাচ্ছে। তাসনিম সিদ্দিকী বলেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অনেকেই নিরাপত্তাজনিত কারণে কিছু অঞ্চলে কার্যক্রম সীমিত করে অন্য দেশে, বিশেষ করে তুরস্কে ব্যবসা স্থানান্তর করছে। এর ফলে শ্রমবাজারেও দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।

তিনি বলেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি শুধু তাৎক্ষণিক সংকট নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক শ্রমবাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারে। তাই নতুন শ্রমবাজার খোঁজা, দক্ষতা উন্নয়ন, ভাষা শিক্ষা এবং শিক্ষা ব্যবস্থার আধুনিকায়নের ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন।

জেপিআই/কেএসআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।