ক্ষতে ফের ‘পুরনো মলম’, ১০ দিন বন্ধ থাকবে কালুরঘাট সেতু

নিজস্ব প্রতিবেদক
নিজস্ব প্রতিবেদক নিজস্ব প্রতিবেদক চট্টগ্রাম
প্রকাশিত: ১১:১০ এএম, ১০ জুলাই ২০২০

চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর উপর ৯০ বছর আগে নির্মিত সেতু, যা কালুরঘাট সেতু নামে পরিচিত। বয়সের ভার আর বিপুল যানবাহনের চাপে ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়া এই একমুখী রেলসেতুটি আবারও সংস্কার কাজের জন্য ১০ দিনের জন্য বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের চট্টগ্রামের বিভাগীয় ব্যবস্থাপক সাদেকুর রহমান জানান, সংস্কার কাজের জন্য আগামী ২৩ জুলাই থেকে ২ আগস্ট পর্যন্ত সেতুটিতে যান চলাচল বন্ধ থাকবে। ইতোমধ্যে কালুরঘাট সেতুর মেরামতের জন্য টেন্ডার হয়েছে।

দীর্ঘসময় ধরে দক্ষিণ চট্টগ্রামের একাংশের জনগণের বহুমুখী দুর্ভোগের নাম কালুরঘাট সেতু। বোয়ালখালী-পটিয়া উপজেলাসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামের মানুষের প্রধান দাবি একটি রেল ও সড়কপথসহ বহুমুখী সেতু, যা গত প্রায় ৩০ বছর ধরে প্রতিটি সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীদের মূল প্রতিশ্রুতি হয়ে আসছে। কিন্তু প্রতিশ্রুতি থেকে গেছে প্রতিশ্রুতির জায়গায়, সেটার বাস্তব প্রতিফলন দক্ষিণ চট্টগ্রামবাসী দেখেনি গত ৩০ বছরেও।

মেয়াদোত্তীর্ণ ও শত বছরের পুরনো এই রেল সেতুর ওপর দিয়ে ঝুঁকি ও ভোগান্তি মাথায় নিয়ে দিনে প্রায় ১ লাখ লোক চলাচল করছে। বোয়ালখালী ও পটিয়ার প্রায় ২০ লাখ মানুষ এই সেতুর ওপর সরাসরি নির্ভরশীল। এছাড়া দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিভিন্ন রুটের গাড়িও এই সেতু দিয়ে বিভিন্ন সময় চলাচল করে। সেতুর পূর্ব পাড়ে বোয়ালখালী অংশে প্রায় ৫০টি কলকারখানা রয়েছে। সেতু নড়বড়ে হওয়ায় এসব কারখানা পণ্য পরিবহন করতে পারে না।

১৯১৪ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে বার্মা ফ্রন্টের সৈন্য পরিচালনা করার জন্য কর্ণফুলী নদীতে ব্রিজ নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ১৯৩০ সালে ব্রুনিক অ্যান্ড কোম্পানি ব্রিজ বিল্ডার্স নামে একটি সেতু নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান এটি নির্মাণ করে। মূলত ট্রেন চলাচলের জন্য ৭০০ গজ লম্বা সেতুটি ১৯৩০ সালের ৪ জুন উদ্বোধন করা হয়। পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পুনরায় বার্মা ফ্রন্টের যুদ্ধে মোটরযান চলাচলের জন্য ডেক বসানো হয়। দেশ বিভাগের পর ডেক তুলে ফেলা হয়।

১৯৫৮ সালে সব রকম যানবাহন চলাচলের যোগ্য করে সেতুটির বর্তমান রূপ দেয়া হয়। ব্রিটিশ আমলে নির্মিত ব্রিজটির রয়েছে ২টি এব্যাটমেট, ৬টি ব্রিক পিলার, ১২টি স্টিল পিলার ও ১৯টি স্প্যান। জরাজীর্ণ সেতুটির বয়স এখন ৯০ বছর।

নব্বইয়ের দশকের শুরুতে দেশ গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরুর পর ১৯৯১ সালে প্রথম সংসদ নির্বাচন থেকে কালুরঘাট সেতুর বিষয়টি রাজনৈতিক দল নির্বিশেষে প্রার্থীদের প্রচারণা ও প্রতিশ্রুতিতে গুরুত্ব পেয়ে আসছে। ১৯৯৬ সালের সংসদ নির্বাচনেও ছিল একই প্রতিশ্রুতি। ১৯৯৬-২০০১ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কালুরঘাটে রেলওয়ে সেতুর পাশে রেল কাম সড়ক সেতু নির্মাণের জন্য দক্ষিণ জেলা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে আবেদন জানানো হয়। কিন্তু সে সময় পাঁচ বছরে তারাও এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ নেয়নি।

Kalurghat-bridge-2

কালুরঘাট সেতুতে এভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে থাকা দক্ষিণ চট্টগ্রামবাসীর জন্য নিত্য ঘটনা

এরপর ২০০৮ সালে নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা লালদীঘিতে এক জনসভায় চট্টগ্রামের উন্নয়ন পরিকল্পনার মধ্যে কালুরঘাটে সেতু নির্মাণের কথা জানিয়েছিলেন। ২০১০ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রথম বর্ষপূতিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতির উদ্দেশে দেয়া বক্তব্যে কর্ণফুলী নদীর উপর আরেক কংক্রিট সেতু নির্মাণের আশ্বাস দিয়েছিলেন।

তবে আওয়ামী লীগ সরকারের প্রথম মেয়াদে কোনো অগ্রগতি না দেখে ২০১৪ সালে মাঠে নামে বোয়ালখালী-পটিয়াসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষ। বোয়ালখালী-কালুরঘাট সেতু বাস্তবায়ন পরিষদ নামে একটি নাগরিক সংগঠন গড়ে তুলে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন শুরু হয়। মূলত এর মাধ্যমেই প্রতিশ্রুতির গণ্ডি থেকে বেরিয়ে জোরালো হয় সেতুর ইস্যু। সংসদে সরব হন বোয়ালখালী-চান্দগাঁও আসনের সংসদ সদস্য জাসদ নেতা মঈনউদ্দিন খান বাদল। এরপর থেকে বারবার আশ্বাসের বৃত্তেই এখনও বন্দি হয়ে আছে কালুরঘাট সেতু।

২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনে কালুরঘাট সেতু প্রার্থীদের প্রথম ও প্রধান প্রতিশ্রুতিতে পরিণত হয়। গত ৭ নভেম্বর সংসদ সদস্য মঈনউদ্দিন খান বাদল মারা গেছেন। শূন্য হওয়া বোয়ালখালী-চান্দগাঁও আসনের উপ-নির্বাচন ১৩ জানুয়ারি। উপ-নির্বাচনের ডামাডোলে আবারও প্রার্থীদের মুখে উচ্চারিত হয় সেতুর প্রতিশ্রুতি। কিন্তু বছর পেরুতে গেলেও এ নিয়ে এখন আর কেউ উচ্চবাক্য করছেন না। বরং ভাঙা সেই সেতুতে আবারও ‘পুরনো মলম’ লাগানোর তোড়জোরই শুরু করেছে রেল কর্তৃপক্ষ।

বোয়ালখালী-কালুরঘাট সেতু বাস্তবায়ন পরিষদের আহ্বায়ক মো. আব্দুল মোমিন বলেন, গত ৩০ বছর ধরে বোয়ালখালী ও পটিয়ার মানুষের একটাই দাবি, কালুরঘাট সেতু। কিন্তু সেই সেতুর কোনো খবর নেই, এখন আবার সংস্কারের কথা বলা হচ্ছে। কথার ফুলঝুরি আর মানুষ শুনতে চায় না। যদি জনগণের প্রতি দায়িত্ববোধ থাকে, তাহলে সরকারের উচিত আমাদের জন্য একটি সেতুর বন্দবস্ত করা।

আবু আজাদ/এমএসএইচ/এমএস

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]