বাংলা আমার প্রাণ

শান্তা মারিয়া
শান্তা মারিয়া শান্তা মারিয়া , কবি ও সাংবাদিক
প্রকাশিত: ০৯:৫৫ এএম, ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

বেশ কয়েক বছর আগের কথা। তখন আমি চীন যোগাযোগ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে কাজ করতাম। আমার ছাত্রছাত্রীরা সবাই চীনা। তাদের বাংলায় কথা-বার্তা বলতে শেখানো, বাঙালির সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয় করানো এবং বাংলাদেশ বিষয়ে ধারণা দেওয়া ছিল আমার কাজ। আমি ওদের বাংলায় প্রাত্যহিক কথাবার্তা যেমন শিখিয়েছিলাম তেমনি আবৃত্তি করতে শিখিয়েছিলাম সোনার তরী। সুদূর বেইজিং শহরে সেই বিদেশি তরুণ তরুণীদের যখন বাংলা ভাষা শেখাতাম তখন অদ্ভুত এক অনুভূতি হতো। আমাদের মাতৃভাষা যে কত মধুর, কত সুললিত তা তখন মর্মে মর্মে উপলব্ধি করি। প্রকৃত সত্য হলো মাতৃভাষার মতো আর কোন ভাষাই মানুষের হৃদয়ে, মননে ও চেতনে একই সঙ্গে সর্বোচ্চ আবেদন রাখতে পারে না।

একথা আরও একবার মনে হলো সম্প্রতি কলকাতায় গিয়ে। কলকাতায় লোয়ার সার্কুলার রোডে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের একটি পুরনো কবরস্থান রয়েছে। সেখানে মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের সমাধি রয়েছে। সেই সমাধির ফলকে লেখা রয়েছে মহাকবির অমর কবিতা ‘দাঁড়াও পথিকবর..’। এই সমাধির সামনে দাঁড়িয়েও মনে প্রবল আবেগের সৃষ্টি হয়েছিল। ‘জন্ম যদি বঙ্গে তব’ শব্দগুচ্ছ এক বিচিত্র অনুভূতির সৃষ্টি করে। সত্যি, যতই আন্তর্জাতিক হই, দেশবিদেশ ভ্রমণ করি কিংবা প্রবাসে থাকি, যে ভাষায়ই কথা বলি না কেন, বিদেশিদের সঙ্গে যতই বন্ধুত্ব হোক না কেন, জন্ম তো এই বঙ্গদেশেই। ভাষা তো আমার বাংলা। এই ভাষার মহাকবির প্রতি শ্রদ্ধায় আনত হয়েছিল শির।

জ্ঞানতাপস ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ত্রিশ থেকে চল্লিশটি ভাষা জানতেন। আর ১৮টি ভাষায় তিনি ছিলেন বিশেষজ্ঞ। কিন্তু তার হৃদয়ে যে ভাষাটি অধিষ্ঠিত ছিল সেটি বাংলা। বাংলাভাষার অধিকার ও মর্যাদা রক্ষায় তাই তিনি জীবনপণ সংগ্রামে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। মনে পড়ে সাহসী রাজনীতিবিদ ধীরেন্দ্রনাথ দত্তের কথা। পার্লামেন্টে দাঁড়িয়ে যিনি পাকিস্তানি শাসকদের রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার পক্ষে সোচ্চার হয়েছিলেন। আমাদের মহান ভাষাশহীদ ও ভাষাসংগ্রামীরা এই বাংলাভাষার মর্যাদা রক্ষায় ছিলেন আপোসহীন।

মনে আছে স্কুলে থাকতে একটি প্রবন্ধ পড়েছিলাম। শহীদ বুদ্ধিজীবী ড. মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর লেখা। সেখানে লেখা ছিল ‘আমার মাতৃভাষার ষোলশত রূপ’। সেসময় ‘তিব্বতের গুহাচারিণী’, ‘মনসার দর্পহারিণী’র মতো অনেক শব্দের সঙ্গে পরিচিত হলেও তার যথার্থতা উপলব্ধি করতে পারিনি। পরে যখন চর্যাপদ, মঙ্গলকাব্য, ময়মনসিংহ গীতিকা ইত্যাদির সঙ্গে পরিচয় হয় তখন ধীরে ধীরে প্রবন্ধটির বাণী আমার হৃদয়ে প্রবেশ করে। সত্যি আমার মাতৃভাষার ষোলশত রূপ। কত সমৃদ্ধ আমাদের এই ভাষা। সেই কবে নেপালের রাজদরবারে একটি প্রাচীন পুঁথি দেখে মহোমহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী সেটিকে বাংলাভাষার আদিরূপ বলে চিহ্নিত করলেন।

চর্যাচর্যবিনিশ্চয় নামের সেই পুঁথিতে জানা গেল বাংলার প্রথম কবি মীননাথ বা মৎস্যেন্দ্রনাথ, ভুসুকু, গোরক্ষনাথদের কথা। চর্যাপদের সেই যুগ থেকে বাংলা ভাষা হাঁটি, হাঁটি পা পা করে এগিয়েছে। মধ্যযুগের বৈষ্ণব পদাবলী, মঙ্গলকাব্য, ময়মনসিংহ গীতিকা, পালাগান, অনুবাদ কাব্যের মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়েছে বাংলা। ঊনবিংশ শতাব্দীতে সমৃদ্ধ হয়েছে গদ্যরূপেও। জ্ঞানদাস, চন্ডীদাস, জয়দেব, আলাওল, শাহ মুহম্মদ সগীর, চন্দ্রাবতী, লালন শাহর হাত থেকে এই ভাষাকে গ্রহণ করেছেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মাইকেল মধুসূদন দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্র, কালী প্রসন্ন সিংহ।

এই ভাষাতেই বাংলার রবি আলো ছড়িয়েছেন বিশ্ব আকাশে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলাভাষাকে যে উচ্চতায় স্থাপন করেছেন বিশ্বের খুব কম ভাষাই সে শিখর স্পর্শ করতে পেরেছে। এই ভাষাতেই রণতূর্য বাজিয়েছেন কাজী নজরুল ইসলাম। শরৎচন্দ্র, বিভূতিভূষণ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, তারাশঙ্কর, জীবনানন্দ, বুদ্ধদেব বসু, সুধীন দত্ত এই ভাষাকে সমৃদ্ধতর করেছেন। বিষ্ণু দে, শামসুর রাহমান, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, শওকত ওসমান, শওকত আলী, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এই ভাষাতেই লিখেছেন। বাংলাতে লিখেই কিংবদন্তিসম জনপ্রিয়তা পেয়েছেন হুমায়ূন আহমেদ।

জাতিসংঘে ১৯৭৪ সালে এই ভাষাতে ভাষণ দিয়ে বিশ্ব দরবারে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা করেছেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। একুশে ফেব্রুয়ারি এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে সারা বিশ্বে। তাহলে বাংলাকে জাতিসংঘের দাপ্তরিক ভাষা করা হবে না কেন? বাঙালি এখন ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বব্যাপী। তাই বাংলাভাষার পরিধিও প্রসারিত হয়েছে। বাংলাভাষায় এখন বিশ্বে প্রায় ৩০ কোটি লোক কথা বলে। ২০৫০ সাল নাগাদ কেবল ১৪-২৫ বছর বয়সী বাংলাভাষীর সংখ্যা দাঁড়াবে ৩১ কোটি ৬০ লক্ষ। এই অনুমানটি করেছেন পরিসংখ্যানবিদরা।

প্রচলিত ভাষার মধ্যে মাতৃভাষার বিবেচনায় বিশ্বে বাংলার স্থান চতুর্থ। আর ভাষিক বিচারে বাংলার স্থান সপ্তম। বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসামের কাছার জেলায় বিপুল সংখ্যক বাংলাভাষীর বসবাস। আফ্রিকার দেশ সিয়েরা লিওনের অন্যতম সরকারি ভাষা বাংলা। সাহিত্যগুণেও বাংলা অত্যন্ত সমৃদ্ধ একটি ভাষা। জাতিসংঘের অন্যতম দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে বাংলার দাবি তাই অতি ন্যায্য। এই দাবিতে সকল বাংলাভাষীর ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রয়োজনটাও তাই অনস্বীকার্য।

লেখক : কবি, সাংবাদিক।

এইচআর/জেআইএম

`বাংলাদেশ, পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, আসামের কাছার জেলায় বিপুল সংখ্যক বাংলাভাষীর বসবাস। আফ্রিকার দেশ সিয়েরা লিওনের অন্যতম সরকারি ভাষা বাংলা। সাহিত্যগুণেও বাংলা অত্যন্ত সমৃদ্ধ একটি ভাষা। জাতিসংঘের অন্যতম দাপ্তরিক ভাষা হিসেবে বাংলার দাবি তাই অতি ন্যায্য।‘

আপনার মতামত লিখুন :