এক গুলিতে দুই শিকার
গত বিশ্বকাপ ক্রিকেট বদলে দিয়েছে বাংলাদেশকে। এই কথাটি আমি অনেকবার বলেছি। কিন্তু মুখে বললেই তো হবে না, বদলে যাওয়ার প্রমাণ দিতে হবে মাঠে। সেই প্রমাণ পাকিস্তান পেয়েছে, এখন ভারত পাচ্ছে। শুরুতে বললাম বটে, বিশ্বকাপ বাংলাদেশকে বদলে দিয়েছে, আসলে পুরো টুর্নামেন্ট নয়, বাংলাদেশকে বদলে দিয়েছে আসলে একটি ম্যাচ। বাংলাদেশ ইংল্যান্ডকে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় করে দিয়েছে। আফগানিস্তান, স্কটল্যান্ডকে হারিয়েছে দারুণ দক্ষতায়। কাঁপিয়ে দিয়েছিল তখন পর্যন্ত অপ্রতিরোধ্য নিউজিল্যান্ডকে। কিন্তু এইসব ম্যাচ নয়, বাংলাদেশকে বদলে দিয়েছে আসলে ১৯ মার্চ ভারতের বিপক্ষের ম্যাচটি। সেই ম্যাচে আমরা হেরেছিলাম। কিন্তু পরাজয়ের মধ্যেই লুকিয়েছিল নৈতিক জয়ের গৌরব। হেরে যাওয়া সেই ম্যাচটিই আসলে বদলে দিয়েছে বাংলাদেশকে।
বাজে আম্পায়ারিং খেলারই অংশ। কখনো আপনার পক্ষে যাবে, কখনো বিপক্ষে। কিন্তু বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালের মত গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে যখন তিনটি সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের মত ‘পুচকে’ দলের বিপক্ষে যায়, তখন বুঝতে বাকি থাকে না; এই বাজে আম্পায়ারিঙে হাত আছে আইসিসিরও। কারণ ভারত আগেভাগে বাদ পড়লে আয় কমে যাবে। কিন্তু ভদ্রলোকের খেলা ক্রিকেটে তো ক্রিকেটটাই সবার আগে বিবেচনা করার কথা। কিন্তু আইসিসির কাছে ক্রিকেট নয়, টাকাটাই আসল। যাক সেই ম্যাচে ভারত জিতলেও নৈতিক জয়টা কিন্তু বাংলাদেশেরই ছিল। আর সেই ম্যাচই আসলে বদলে দিয়েছে বাংলাদেশকে।
আমি সবসময় বলি ক্রিকেট যতটা না শারীরিক ফিটনেসের খেলা, তারচেয়ে অনেক বেশি মানসিক সামর্থের। ফুটবলে অল্প একটু ইনজুরি থাকলেই মাঠের বাইরে চলে যেতে হয়। কিন্তু তারচেয়ে অনেক বেশি ইনজুরি নিয়ে ক্রিকেটার খেলে যান। রানার নিয়ে সেঞ্চুরি করার অনেক ইতিহাস আছে। ১৯ মার্চ আমাদের সাথে যে অন্যায় করা হয়েছে, তাই আমাদের মানসিকভাবে অনেক এগিয়ে দিয়েছে। আর ম্যাচের আগে ভারতীয় সমর্থকরা যেভাবে আমাদের উস্কানি দিয়েছে, তাও তাতিয়ে দিয়েছে বাংলাদেশকে। বাংলাদেশ এখন আর কাউকেই ভয় পায় না। এমনকি সেই ম্যাচের আগে ভারতের কেউ কেউ বাংলাদেশকে বিড়াল বলে টিপ্পনী কেটেছিলেন। কেউ কেউ এমনও বলেছেন, বাংলাদেশ দেশের মাটিতে বাঘ, কিন্তু বাইরে বেড়াল। সেই জবাব বাংলাদেশ বিশ্বকাপেই দিয়ে এসেছে। অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের দ্রুতগতির পিচেও বাংলাদেশ ছিল দুর্দান্ত। আর ১৮ জুন মিরপুরে ইতিহাস গড়া ম্যাচে চার পেসার নিয়ে খেলে বাংলাদেশ বুঝিয়ে দিয়েছে শুধু স্পিনের মায়াজালের নির্ভরতার দিন শেষ। বাংলাদেশ এখন আক্রমণাত্মক ক্রিকেটেই মারতে পারে ভারতের মত ক্রিকেট দৈত্যকে।
মিরপুরেও তামিম আর সৌম্য মিলে যে ঝড়ো শুরু করেছিলেন, বৃষ্টি এসে ছন্দপতন না ঘটালে রান ৩৫০ ছাড়িয়ে যেতে পারতো। তবুও ভারতের বিপক্ষে প্রথমবারের মত ৩০০ ছাড়ানোও কম কথা নয়। যদিও সাকিব বলছিলেন, ২৫ রান কম হয়েছে। তবে অভিষেক ম্যাচ খেলতে নামা মুস্তাফিজ প্রথম ওভারেই বুঝিয়ে দিয়েছে, ভারতের তারকাখচিত ব্যাটিং লাইনআপের কোনো আলাদা মানে নেই তার কাছে। সত্যি বলতে কি, এই ব্যাটিং দেখে আমারও সাকিবের মত মনে হচ্ছিল, রান কিছুটা কম হয়েছে। কিন্তু মুস্তাফিজের প্রথম ওভারের পরই আমি বুঝে গিয়েছিলাম, আজ আমাদের দিন, আজ আমরাই জিতবো। আবার যদি প্রথম ওভারেই ভারত ১৫/১৬ রান নিয়ে নিতে পারতো, তাহলে হয়তো ম্যাচটা তাদেরও দিকেই হেলে যেতে পারতো। কিন্তু বাংলাদেশ এখন অন্য বাংলাদেশ, বদলে যাওয়া বাংলাদেশ। ম্যাচ শুরুর আগেই হেরে যাওয়ার দিন শেষ। এখন লড়াই হবে সমানে সমানে। বিনাযুদ্ধে নাহি দেব সূচাগ্র মেদিনী।
ম্যাচের আগে মহেন্দ্র সিং ধোনি বলেলিনে, ১৯ মার্চের ম্যাচটির কথা ভুলে গেছেন তিনি। কিন্তু আসলে ভুলে যে যাননি তার প্রমাণ রেখেছেন মাঠে। মুস্তাফিজের মত অভিষেক ম্যাচ খেলতে নামা পুচকে কে ধাক্কা দিয়েছেন। ধাক্কা এতটাই জোরে দিয়েছেন যে মুস্তাফিজকে মাঠের বাইরে চলে যেতে হয়। কিন্তু ফিরে এসে মুস্তাফিজ ভারতকেই ম্যাচ থেকে বের করে দিয়েছেন। আম্পায়াররা এ ঘটনার জন্য ধোনিকে দায়ী করলেও ম্যাচ রেফারি দুজনকেই সাজা দিয়েছেন। ধোনির ম্যাচ ফি’র ৭৫ শতাংশ, আর মুস্তাফিজকে ৫০ শতাংশ জরিমানা করা হয়েছে। ধোনি তো ইচ্ছা করে ধাক্কা দিয়েছেন, তাহলে মুস্তাফিজের জরিমানা হলো কেন? এখানেও সেই মোড়লিপনার গল্প। ভারতের পত্রিকায় নিউজ বেরিয়েছে, ধোনিকে সাজা দিলে ভারত টিম ম্যানেজমেন্ট প্রতিবাদ জানাবে, প্রয়োজনে আইসিসি পর্যন্ত যাবে। তাই ভারতকে ঠাণ্ডা করতেই মুস্তাফিজকেও জরিমানা করা হয়েছে। মুস্তাফিজের অপরাধ হলো, তিনি ব্যাটসম্যানদের দৌড়ের রাস্তা আটকে ছিলেন। অভিযোগ সত্যি, কিন্তু ইচ্ছাকৃত নয়। প্রথম ম্যাচ খেলতে নামা মুস্তাফিজ আসলে বেখেয়ালে অমনটা করেছে। কিন্তু পরাজয়ের শঙ্কায় ক্যাপ্টেন কুল ধোনিরও মাথা গরম হয়ে গিয়েছিল।
পাকিস্তানের এক সাবেক ক্রিকেটার সরফরাজ নেওয়াজ বলেছেন, ভারত নাকি পাকিস্তানকে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি থেকে বাদ দেয়ার জন্য ইচ্ছা করে বাংলাদেশের কাছে হেরেছে। হা হা হা। পাকিগুলা আর মানুষ হইলো না। কিন্তু আমার কথা হলো যেই ট্রফিতে খেলার জন্য আরেক দেশের পারফরম্যান্সের দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়, সেই টুর্নামেন্টে খেলার নৈতিক যোগ্যতা তো পাকিস্তানের নেই। এটা ঠিক, ভারত চাইবে পাকিস্তানের খারাপ হোক। নিজের নাক কেটে পরের যাত্রা ভঙ্গের উদাহরণও কম নেই। কিন্তু পাকিস্তানকে ঠেকাতে ভারত বাংলাদেশের কাছে ৭৯ রানে লজ্জাজনক পরাজয় চাইবে, এটা ভাবার জন্য মানুষকে যতটা পাগল হতে হয়, সরফরাজ ছাড়া আর কেউ ততটা নয়। এটা ঠিক ২০১৭ সালের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে পাকিস্তানকে খেলতে হলে এখন অন্যেও পারফরম্যান্সের দিকে তাকিয়ে থাকতে হবে। আগামী ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আইসিসি র্যাংঙ্কিঙের প্রথম আটটি দল খেলবে চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে। এখন পাকিস্তানের অবস্থান নয়। আর ভারতকে হারানোর পর ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে বাংলাদেশ উঠে গেছে সাতে।
এই সময়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের কোনো খেলা নেই। তাই তাদের পয়েন্ট ৮৮-ই থাকবে। বাংলাদেশের পয়েন্ট ৯১, আর পাকিস্তানের ৮৭। এখন বাংলাদেশ যদি ভারতের সাথে সিরিজের বাকি দুই ম্যাচ এবং দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজের সব ম্যাচ হারে এবং পাকিস্তান যদি শ্রীলঙ্কার সাথে সিরিজ জেতে তাহলেই কেবল পাকিস্তান চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে খেলতে পারবে। আর বাংলাদেশ যদি আগামী পাঁচ ম্যাচের অন্তত একটি ম্যাচও জেতে তাহলে পাকিস্তান আউট। তার মানে পাকিস্তানের চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে যাওয়া না যাওয়া এখন আমাদের ওপর নির্ভর করছে। আমি বাজি ধরে বলতে পারি, পাকিস্তান চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফিতে খেলছে না। আর এই বাজিতে আমি আজই জিতে যাবো। সরফরাজ নেওয়াজের জন্য করুণা হচ্ছে। এই পাকিরা বসে বসে আঙ্গুল চুষুক আর ষড়যন্ত্র তত্ত্ব আবিষ্কার করুক। আমরা মাঠে খেলে সবাইকে উড়িয়ে দেবো। আমরা যখন জিততে শিখেছি, তখন কেউ আর আমাদের ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না। র্যাংঙ্কিঙে আর পেছাবে না বাংলাদেশ। এখন টার্গেট ইংল্যান্ড, তাদের টপকে ছয়ে উঠতে হবে। তখন র্যাংঙ্কিঙে নয়ে থাকা দলের সাবেক খেলোয়াড়রা কী বললো, না বললো, তা নিয়ে ভাবারও সময় থাকবে না আমাদের।
আচ্ছা সরফরাজের কথাই মানলাম, ভারত না হয় পাকিস্তানকে বাদ দেয়ার জন্য হেরেছে, কিন্তু পাকিস্তান হোয়াইট ওয়াশ হয়েছিল কেন? তবে সরফরাজের ছাগলামিতে আমি খুব মজা পেয়েছি। কারণ ভারত তো হেরেছেই, এখন দেখি সেই আঘাতে পাকিস্তানও ঘায়েল। একেই বলে এক গুলিতে দুই শিকার।
শুনছি ভারত নাকি দুর্বল দল নিয়ে আসার পরিকল্পনা করছিল। কিন্তু মূল দল নিয়ে আসার পরও যেভাবে খাবি খাচ্ছে, তাতে দুর্বল দল নিয়ে আসার পরিকল্পনার জন্যও নিশ্চয়ই এখন আফসোস করছেন তারা। সিরিজে আরো দুটি ম্যাচ বাকি আছে। পাকিস্তানের পর ভারতকেও হোয়াইট ওয়াশ করতে পারলে সবচেয়ে আনন্দের হবে, নিদেনপক্ষে সিরিজ জিততে তো চাইবোই। তবে বাংলাদেশ আমার প্রত্যাশার আকাশ ছুঁয়ে ফেলেছে অনেক আগেই।
খেলায় হারজিত আছে। বাংলাদেশ বদলে গেছে বলেই যে সব ম্যাচ জিতবে এমন কোনো কথা নেই। আমি সব সময় যেটা চাইতাম, খেলা হবে সমানে সমান, শুরুর আগেই যেন হেরে না বসি। সেটা পেয়ে গেছি। এখন কোনো চাপ না নিয়ে মনের আনন্দে খেলে যেতে হবে। 
এইচআর/এমএস