ডাক্তার নন, মুমূর্ষু সন্তান নিয়ে মা-বাবাই দৌড়াচ্ছেন…

আমীন আল রশীদ
আমীন আল রশীদ আমীন আল রশীদ , সাংবাদিক, কলামিস্ট
প্রকাশিত: ১২:০১ পিএম, ১৮ মে ২০২৬

গত মাসের মাঝামাঝি চার হাসপাতাল ঘুরে রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল অ্যান্ড ইনস্টিটিউটের আরআইসিইউতে মারা যায় শিশু সোহা মনি। গুরুতর ফুসফুস বা শ্বাসকষ্টের রোগীদের ভেন্টিলেটরসহ ফুসফুস কার্যক্ষম রাখার বিশেষ সুবিধা আছে এ কেন্দ্রে। কিন্তু প্রথমবার এখানে তার ভর্তির সুযোগ হয়নি।

এরপর এ মাসের প্রথম সপ্তাহে হাম ও জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে মারা যায় পাঁচ মাস বয়সী শিশু মো. তাকরিম। তিনটি হাসপাতাল ঘুরেও শেষ পর্যন্ত শিশুটিকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি। শিশুটির বাবার অভিযোগ, ভোলায় প্রথম পর্যায়ে রোগটি শনাক্ত করা যায়নি। সময়মতো হাম শনাক্ত হলে হয়তো পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারতে। তিনি বলেন, ‘ডাক্তারের কাছে ১০০ বার জিজ্ঞেস করেছি বাচ্চাটার কি হাম হয়েছে? ডাক্তার শুধু বলছে অ্যালার্জি হয়েছে। একবারও যদি হামের কথা বলত, তাহলে ছেলেকে আরও আগেই ঢাকায় নিয়ে আসতাম।’

ঝিনাইদহে চিকিৎসা হবে না। ফলে শিশু জিনাসকে ঢাকায় নিয়ে এসেছিলো তার পরিবার। কিন্তু রাজধানীর চারটি হাসপাতাল ঘুরেও শিশুটির জন্য একটি পিআইসিইউর ব্যবস্থা হয়নি। বাধ্য হয়ে সন্তানকে নিয়ে আবার ঝিনাইদহে ফিরে যান তার অভিভাবকরা। ভর্তি করা হয় ঝিনাইদহ সরকারি হাসপাতালে। এ নিয়ে একটি টেলিভিশন চ্যানেলে সংবাদ প্রচারের পরে জিসানের চিকিৎসার দায়িত্ব নেয় নারায়ণগঞ্জে অবস্থিত বাংলাদেশ নবজাতক হাসপাতাল। সেখানে তার জন্য একটি পিআইসিইউর ব্যবস্থা হয়।

এগুলো সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের কিছু খণ্ডচিত্র। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের যেসব হাসাপাতালে হাম বা হামের উপসর্গে আক্রান্ত শিশুরা ভর্তি আছে, সেখানে গেলে বোঝা যাবে দেশ কী একটা ভয়াবহ স্বাস্থ্য সমস্যার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে এবং অবুঝ সন্তানকে জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রেখে বাবা-মা কতটা অসহায়। বিশেষ করে যেসব শিশুর আইসিইউ সাপোর্ট প্রয়োজন, তাদের অধিকাংশই টাকা দিয়েও এই সেবা পাচ্ছে না। কারণ এই মুহূর্তে যে পরিমাণ শিশুদের আইসিইউ প্রয়োজন, তা কোনো হাসপাতালেই নেই।

করোনার সময়ে যেমন দেশের সব হাসপাতালে করোনার চিকিৎসার জন্য ডেডিকেটেড ওয়ার্ড তৈরি করা হয়েছিল বা করোনা চিকিৎসার জন্য উপযোগী করা হয়েছিল; শিশুদের হাম প্রায় মহামারি আকার ধারণ করলেও সরকারি প্রস্তুতি এবং সরকারের কর্তা ব্যক্তিদের কথাবার্তায় মনে হয় না তারা হাম ও হামের উপসর্গে সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় সাড়ে চারশো শিশুর মৃত্যুতে ব্যথিত বা লজ্জিত।

স্মরণ করা যেতে পারে, দায়িত্ব নেয়ার কয়েক দিন পরেই নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলায় এক অনুষ্ঠানে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছিলেন, ‘মানুষকে যাতে ডাক্তারের পেছনে ঘুরতে না হয়, ডাক্তারই মানুষের পেছনে ঘুরবে। সহজলভ্য ও সর্বজনীন করার মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়ার মনমানসিকতা নিয়েই আমরা সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। আমরা আশা করছি, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে আমাদের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণরূপে পূরণ হবে।’

তখন মন্ত্রীর এই বক্তব্য বেশ প্রশংসিত হয়েছিল। চিকিৎসাসেবা মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে তিনি প্রতীকি  অর্থে যে কথাটি বলেছিলেন যে ‘ডাক্তারই মানুষের পেছনে ঘুরবে’—এই কথার  তাৎপর্য অনেক। যদিও এটা বাংলাদেশের বাস্তবতায় একটি অসম্ভব ব্যাপার। যে দেশের মাথপিছু রোগীর তুলনায় ডাক্তার ও নার্সের সংখ্যা যথেষ্ট কম; যে দেশের মানুষ অনেকে বেশি অসুখ-বিসুখে আক্রান্ত হয় এবং মাত্র ৫৬ হাজার বর্গমাইলের যে দেশে প্রায় ২০ কোটি মানুষ বসবাস করে—সেই দেশে ডাক্তাররা রোগীদের পেছনে ঘুরবে, এটা আদৌ বাস্তবসম্মত নয়। পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি ১০ হাজার মানুষের জন্য দেশে চিকিৎসক আছেন মাত্র সাতজন। নার্স আরও কম।  কিন্তু তারপরও স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এই কথা প্রশংসিত হয়েছিল এই কারণে যে, এই কথার ভেতরে মানুষের স্বাস্থ্যের অধিকার নিশ্চিতে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী অন্তত এমন একটি কথা বললেন, যা মানুষকে আনন্দ দিয়েছে। আশাবাদি করেছে।

কিন্তু এর দুই মাসের মধ্যেই দেখা গেল যে, রোগীর পেছনে ডাক্তার তো ঘুরছেই না, বরং রোগীরা এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতাল ঘুরেও চিকিৎসা পাচ্ছে না। আইসিইউ পাচ্ছে না। করোনার সময়ে যেমন আইসিইউর হাহাকার তৈরি হয়েছিল, এবার তৈরি হয়েছে শিশুদের পিআইসিইউ সংকট। হামে আক্রান্ত শিশুদের অবস্থা সংকটাপন্ন হলে তাদের এই সাপোর্ট প্রয়োজন হয়। কিন্তু টাকা দিয়েও এখন এই সেবা মিলছে না।

এর একটি বড় কারণ, দেশে বিলাসবহুল অসংখ্য বেসরকারি হাসপাতাল গড়ে উঠলেও সেখানে অধিকাংশ মানুষেরই প্রবেশাধিকার নেই। অধিকাংশ বেসরকারি হাসপাতাল হামের রোগী ভর্তি নিচ্ছে না—এমন সংবাদও গণমাধ্যমে এসেছে। উপরন্তু বেসরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে রেখে কোনো রোগীকে এক সপ্তাহ বা ১৫ দিন চিকিৎসা করাতে হলে গরিব মানুষকে জমি বিক্রি করতে হবে। আবার সরকারি হাসপাতালে আইসিইউ তো দূরে থাক, একটা সাধারণ বেড পেতেও রীতিমতো যুদ্ধ করতে হয়।

দ্বিতীয়ত, চিকিৎসাকে রাষ্ট্র বরাবরই সেবা মনে করে। অর্থাৎ যখন এটি সেবা, তখন সেটি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দয়ার ওপর নির্ভর করে। অথচ সংবিধান বলছে, চিকিৎসা হচ্ছে নাগরিকের মৌলিক অধিকার। সুতরাং এটা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। এখানে দয়ার কোনো বিষয় নেই। কিন্তু হাম বা হামের উপসর্গে আক্রান্ত শিশু এবং তাদের অভিভাবকদের যেসব লড়াইয়ের চিত্র প্রতিদিন গণমাধ্যমে আসছে, তাতে মনে হয় না রাষ্ট্র এই শিশুদের চিকিৎসাকে তাদের সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে স্বীকার করে।

সরকারি পরিসংখ্যান বলছে, ঢাকায় হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা কমেছে। কিন্তু বেড়েছে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা থেকে আসা রোগীর সংখ্যা। হামের প্রাদুর্ভাব ছড়িয়েছে দেশজুড়ে। বরিশাল, খুলনা, ময়মনসিংহ ও সিলেটে আক্রান্তের হার সবচেয়ে বেশি। রেডজোন হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ ও সাভার। কিন্তু দেশের ভালো বা ভরসা করার মতো হাসপাতালগুলোর সবই ঢাকায়। ফলে হামে আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে ঢাকামুখী হচ্ছেন স্বজনরা। জেলা-উপজেলার হাসপাতালগুলোতে পর্যাপ্ত চিকিৎসা না পেয়ে তারা বাধ্য হচ্ছেন মুমূর্ষু সন্তানদের নিয়ে রাজধানীতে আসতে। অন্যদিকে চিকিৎসকরা বলছেন, হামের টিকা না নেওয়া বা অসম্পূর্ণ টিকাদান, শিশুদের কম রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং জনাকীর্ণ পরিবেশের কারণে দ্রুত ছড়াচ্ছে এই রোগ।

বাস্তবতা হলো, হামের মতো একটা নিরীহ অসুখে, অর্থাৎ যে অসুখে সাধারণত শিশুদের মৃত্যু হয় না বা যে মৃত্যুটা প্রতিরোধযোগ্য, সেটি যে মহামারি আকারণ ধারণ করলো এবং তারপরেও রাষ্ট্রযন্ত্রের তরফে যে পরিমাণ সিরিয়াসনেস দরকার ছিল সেটি অনুপস্থিত। কারণ কি এই যে, হামে এখন পর্যন্ত যাদের মৃত্যু হয়েছে তাদের অধিকংশই সমাজের প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের সন্তান বলে? কোনো ‍গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির সন্তান সাম্প্রতিক হামে মারা যায়নি বলে? মনে রাখতে হবে, অতি সাধারণ অসুখে ভিআিইপিরও মৃত্যু হতে পারে। সম্প্রতি রাজধানীর একটি অভিজাত হাসপাতালে ম্যালেরিয়ায় মারা গেছেন বাণিজ্য সচিব মাহবুবুর রহমান। যেটি মূলত মশাবাহিত রোগ। সুতরাং কে কখন কীভাবে মারা যাবেন, কোন ভিআইপির সন্তানকে কখন কোন উসিলায় আজরাইল ডেকে নিয়ে যাবে—তা কেউ জানে না।

ঝিনাইদহের ৯ মাস বয়সী শিশু জিসান, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার শিশু মেহেরিন কিংবা বরিশালের আদিব—যে শিশুদের নাম আমরা জেনে গেছি টেলিভিশনের সংবাদ দেখে, তাদের প্রতি রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা যদি মমত্ববোধ বা দরদ অনুভব না করেন; চিকিৎসাকে যদি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে স্বীকার করে সেটি নিশ্চিতে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা গ্রহণ না করেন; শুধু ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে গালভরা কথা বলতে থাকেন—তাহলে হামের মতো একটি অতি সাধারণ অসুখেও শিশুদের মৃত্যুর সংখ্যাগুলো সরকারি পরিসংখ্যান হিসেবেই পরিগণিত হবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর প্রতিদিন বিকালে সবশেষ ২৪ ঘণ্টায় কত শিশু মারা গেলো, সেই সংখ্যা হালনাগাদ করে গণমাধ্যমে বিবৃতি পাঠাতে থাকবে এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সেই বাণী ‘ডাক্তারই মানুষের পেছনে ঘুরবে’—এটি কেতাবী কথা হয়েই থাকবে। ভবিষ্যতে মানুষ ওনার এই কথা নিয়ে রসিকতা করবে। যে রসিকতার আড়ালে চাপা পড়ে যাবে শত শত মায়ের কান্না।

আমীন আল রশীদ: সাংবাদিক ও লেখক।

এইচআর/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।