আ’লীগের দুর্গ গফরগাঁও, একগুচ্ছ দাবি ভোটারদের

সালাহ উদ্দিন জসিম
সালাহ উদ্দিন জসিম সালাহ উদ্দিন জসিম , জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক গফরগাঁও (ময়মনসিংহ) ঘুরে
প্রকাশিত: ১১:৫০ এএম, ১৭ নভেম্বর ২০২১

## নেতা চাই মনের কথা বলার মতো
## এমপি কম আসে, বিএনপির দেখা নেই
## পাকা হয়নি ভোট কেন্দ্রে যাওয়ার রাস্তাই

জাতীয় সংসদের ১৫৫ নম্বর আসন ময়মনসিংহ-১০। যা গফরগাঁও উপজেলা নিয়ে গঠিত। আওয়ামী লীগের দুর্গ খ্যাত এই এলাকার মানুষ বেশিরভাগ কৃষিনির্ভর। এখানে ধান হয় বেশি। ’৫২ এর ভাষা আন্দোলনের শহীদ আবদুল জব্বারের পৈত্রিক ভিটাও এখানে। ইতিহাস-ঐতিহ্য আর উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের হালচাল দেখতে এবং ভোটারদের চাওয়া তুলে ধরতে সোমবার (১৫ নভেম্বর) গফরগাঁওয়ের বিভিন্ন এলাকা ঘুরেছে জাগো নিউজ টিম।

উপজেলায় ঢুকতেই রাওনা ইউনিয়নের পাঁচুয়া গ্রামের প্রবেশদ্বারে দেখা মেলে বিশাল আকৃতির তোরণ। যেখানে লেখা ‘জব্বার নগর’। ভাষা শহীদ জব্বারের নামেই এই নামকরণ। গ্রামের প্রবেশদ্বারেই কয়েকটি চা দোকান। সন্ধ্যার পর জাগো নিউজ টিমকে দেখে বেশ আড্ডা জমে সেখানে।

রাওনা ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য (মেম্বার) মো. বাবুল, স্থানীয় ব্যবসায়ী ওয়াহিদুজ্জামান কাঞ্চন, আতহার আলী খোকা, চালক অলি উল্যাহ, সুমন মিয়াসহ নাম না জানা অনেকের সঙ্গে আড্ডা হয়। চায়ের আড্ডায় একগুচ্ছ দাবি তুলে ধরেন তারা।

এগুলো হলো- জব্বার নগরে একটি কমিউনিটি ক্লিনিক, রাবেয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের (ভোট কেন্দ্র) সড়ক পাকাকরণ, জব্বারের বাড়ির আঙ্গিনায় একটি মসজিদ করা, পাঁচুয়া ইবতেদায়ি মাদরাসা ভবন ও ভাষা শহীদ আবদুল জব্বারের নামে একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা এবং এলাকার প্রধান সমস্যা গরু চুরি বন্ধ করা ইত্যাদি।

আড্ডার ফাঁকে ‘আগামী জাতীয় সংসদে কেমন নেতা চান?’ এমন প্রশ্ন করা হলে স্থানীয় ব্যবসায়ী ওয়াহিদুজ্জামান কাঞ্চন বলেন, ‘এমন নেতা চাই যিনি সব সময় জনগণের পাশে থাকেন। জনগণ সহজে সাক্ষাৎ পায়। ফ্রি মাইন্ডে কথা বলতে পারে। মনের কথা বলতে পারে।’

এমপি বা নেতাদের কাছে চাওয়া কী? জবাবে স্থানীয় নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি আতহার আলী খোকা জাগো নিউজকে বলেন, ‘আমাদের পাঁচুয়া গ্রামের মানুষেরা চিকিৎসায় কষ্ট পায়। এখানে একটা কমিউনিটি ক্লিনিক চাই। কাঁচা রাস্তাগুলো পাকাকরণ চাই। ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার রাস্তাটা আগে পাকা হোক। এছাড়া আমাদের এলাকাটা ভাষাশহীদ আবদুল জব্বারের এলাকা। অন্য ভাষাশহীদদের এলাকা যেভাবে উন্নয়ন হয়েছে, এটিতে হয়নি।’

jagonews24

তিনি বলেন, ‘আমাদের দাবি ছিল- উপজেলার ৫০০ আসনের অডিটোরিয়ামটি ভাষা শহীদ আবদুল জব্বারের নামে হোক, কিন্তু হয়নি। পাঁচুয়া ইবতেদায়ি মাদরাসাটিও তার নামে চেয়েছি, হয়নি। মাদরাসাটির আবার নেই ভবন। জীর্ণশীর্ণ টিনের ঘরে লেখাপড়া হয়। জব্বারের বাড়ির আঙিনায় পাঠাগারের কাছে একটি মসজিদ চেয়েছি, সেটাও হয়নি। জব্বারের নামে আমরা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ও চাইছি, তা হয়নি। নেতারা বলে যান হবে, আর হয় না।’

খোকা বলেন, ‘পাঁচুয়া গ্রামটার নাম পরিবর্তন করে ২০০৮ সালে জব্বার নগর হয়েছে। এখন পর্যন্ত গেজেট হয়নি। খালি একটা তোরণে লেখা আছে জব্বার নগর।’

পাশ থেকে রুবেল মিয়া বলে ওঠেন, ‘রাবেয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আমাদের ভোটকেন্দ্র। এ রাস্তাটা কাঁচা। এখান দিয়ে আমরা ভোট দিতে যাই। প্রতিদিন শিক্ষার্থীরা যায়। চেয়ারম্যান ৩০০ ফিটের মতো জায়গায় ইট বিছাইছে। আমরা চাই, পুরা রাস্তাটা পাকা করে দিক।’

তবে পুরো আড্ডাজুড়ে সবার কথা ছিল, এলাকার প্রধান সমস্যা ‘গরু চুরি’। খোদ রাওনা ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার মো. বাবুলেরও একই কথা। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘এমপি অনেক উন্নয়ন করেছেন। একটাই সমস্যা গরু চুরি। এটা বন্ধ করা যাচ্ছে না।’

এসময় সাবেক সংসদ সদস্যের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘নেতা ছিলেন আলতাফ হোসেন গোলন্দাজ। এরকম গরু চুরি হলে গোলান্দাজ বেঁচে থাকলে কইতো- ধইরা আন, আর সবগুলার বাড়িঘর পুড়িয়ে দিতো।’

আলতাফ হোসেন গোলন্দাজ ময়মনসিংহ-১০ আসনে আওয়ামী লীগের হয়ে তিন তিনবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০৭ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি মারা যান তিনি। বর্তমানে এ আসনের এমপি আলতাফ হোসেন গোলন্দাজের ছেলে ফাহমী গোলন্দাজ বাবেল।

এলাকার মানুষের সঙ্গে বর্তমান এমপির সম্পৃক্ততা নিয়ে মো. বাবুল বলেন, ‘এমপি সাহেব কম আসেন। প্রোগ্রাম থাকলে এলাকায় আসেন। তবে তিনি সবার খোঁজখবর রাখেন। যখন যেটা প্রয়োজন করে দেন। বিএনপির এ বি এম সিদ্দিকুর রহমান এলাকায় আসেন না। এলাকায় কোনো কর্মসূচি বা প্রোগ্রামে তাকে দেখি না।’

জব্বার নগর তোরণ থেকে আরও এক কিলোমিটার ভেতরে ভাষা শহীদ আবদুল জব্বারের বাড়ি। বাড়ির আঙিনায় কথা হয় স্থানীয় রুমা বেগমের সঙ্গে। তিনি চুল দিয়ে টুপি বানান। স্বামী ও দুই মেয়ে, এক ছেলে নিয়ে তার সংসার।

jagonews24

বর্তমান সরকার কী সেবা দিয়েছে? জানতে চাইলে তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘কোনো সেবা পাইনি। এমপির দেখাও পাইনি। এমপি বছরে একবার ২১ ফেব্রুয়ারির রাতে জব্বারের বাড়ির শহীদ মিনারে আসেন।’

কোন এমপি বেশি ভালো, ‘বর্তমান এমপি বাবেল না কি সাবেক এমপি গিয়াস উদ্দিন? উত্তরে তিনি বলেন, ‘দুজনেই ভালো। যেই আসুক আমাদের সমস্যা নাই।’

তবে সরকারের কাছে তার চাওয়া, কাজ যাই করুক গরু চুরিটা যেন বন্ধ হয়। এই এলাকায় গরু চুরি প্রধান সমস্যা। এজন্য কেউ ঘুমাতে পারে না।

আরেকটা সমস্যার কথা বললেন রুমা। জন্মনিবন্ধন নিয়ে। এটার জন্য না কি তার সন্তানের পড়া বন্ধ হওয়ার উপক্রম। বলেন, ‘মেয়ে ক্লাস এইটে পড়ে। তার জন্মনিবন্ধন আছে। এখন না কি ফরম ফিলাপের জন্য জন্মনিবন্ধন আবার লাগবে। তাও আবার তার বাবা-মা ও দাদা-দাদিরটাও করানো লাগবে। মেয়েরে বলছি, তোর পড়া-ই বাদ দে। আর পড়া লাগবে না।’

এদিকে গফরগাঁওয়ের লোকজন বলছেন, এখানে আওয়ামী লীগের প্রভাব বেশি। স্বৈরাচার এরশাদের আমলে তার জামাতা এনামুল হক জজ মিয়া এমপি হয়েছেন। এরপর ১৯৯১, ১৯৯৬ ও ২০০১- এ টানা তিনবারের এমপি হন আলতাফ হোসেন গোলন্দাজ। তার মৃত্যুর পর ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের এমপি হন ক্যাপ্টেন (অব.) গিয়াস উদ্দিন আহমেদ। ২০১৪ ও ২০১৮ সালে দশম ও একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফাহমী গোলন্দাজ বাবেল এমপি হন। সে হিসেবে এই আসনটি আওয়ামী লীগের দুর্গ হিসেবে খ্যাত বলে জানান এলাকার লোকজন।

গফরগাঁও উপজেলার ১৫ ইউনিয়নের দক্ষিণাঞ্চলের ৮ ইউনিয়ন নিয়ে পাগলা থানা। গফরগাঁও পৌরসভাসহ উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নে মোট ভোটার সংখ্যা তিন লাখ ২৭ হাজার ৬৬৭ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার এক লাখ ৬৬ হাজার ৬৬৬ জন। আর এক লাখ ৬১ হাজার ১ জন নারী ভোটার।

এসইউজে/জেডএইচ/এইচএ/জিকেএস

টাইমলাইন  

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।