শাহ মখদুমের (রহ.) ইসলাম প্রচার ও লড়াই

আহমাদ সাব্বির
আহমাদ সাব্বির আহমাদ সাব্বির , আলেম, লেখক ও অনুবাদক
প্রকাশিত: ০৬:৪১ পিএম, ০৩ মে ২০২৬
শাহ মখদুমের (রহ.) মাজার ছবি: উইকিপিডিয়া

বাংলার ইতিহাসে সুফি সাধকদের অবদান গভীর ও সুদূরপ্রসারী। তাদের আত্মিক শক্তি, মানবিকতা, ন্যায়বোধ এবং সমাজসংস্কারমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ইসলাম বাংলাদেশে শুধু একটি ধর্মীয় পরিচয় হিসেবেই নয়, বরং একটি জীবনব্যবস্থা হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। এই মহান ধারার অন্যতম উজ্জ্বল নক্ষত্র হলেন শাহ মখদুম রুপোশ (রহ.)বাংলায়, বিশেষত রাজশাহী অঞ্চলে ইসলাম প্রতিষ্ঠা ও বিস্তারের ক্ষেত্রে তার ভূমিকা ছিল অনন্য।

শাহ মখদুম রুপোশের (রহ.) প্রকৃত নাম ছিল আব্দুল কুদ্দুস। তার জন্ম ১২১৬ খ্রিষ্টাব্দে বাগদাদের এক প্রসিদ্ধ সুফী পরিবারে। বংশপরিচয়ের দিক থেকে তিনি ছিলেন অত্যন্ত সম্মানিত; তিনি হজরত আলীর (রা.) বংশধর এবং তার দাদা ছিলেন বিশ্ববিখ্যাত সুফীসাধক আব্দুল কাদির জিলানী (রহ.)। এই পারিবারিক ঐতিহ্য তার জীবনের আধ্যাত্মিক ভিত্তিকে সুদৃঢ় করে তোলে। তার পিতা সায়্যিদ আযাল্লাহ শাহ ছিলেন একজন প্রখ্যাত আলেম ও সুফী, যার তত্ত্বাবধানে শাহ মখদুমের প্রাথমিক শিক্ষার সূচনা হয়।

শৈশব থেকেই শাহ মখদুম (রহ.) ছিলেন মেধাবী ও জ্ঞানপিপাসু। তিনি অল্প বয়সেই কোরআন, হাদিস, ফিকহ, আরবি ভাষা ও সুফিতত্ত্বে পারদর্শিতা অর্জন করেন। তার শিক্ষাজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল কাদেরিয়া তরিকার অন্তর্ভুক্ত হওয়া, যা তাকে আধ্যাত্মিক উৎকর্ষের উচ্চতায় পৌঁছে দেয়। পরবর্তীতে তিনি ‘মখদুম’ উপাধি লাভ করেন, যা তার জ্ঞান ও সাধনার স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত।

তার জীবনে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে যখন তাতারদের আক্রমণে বাগদাদ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। এই অস্থির পরিস্থিতিতে তিনি তার পরিবারসহ বাগদাদ ত্যাগ করে ভারত উপমহাদেশের দিকে রওনা হন। তিনি প্রথমে সিন্ধুতে অবস্থান করে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন এবং পরে দিল্লিতে আসেন, যেখানে সে সময় শাসন করছিলেন গিয়াসুদ্দীন বলবন। দিল্লিতে অবস্থানকালে তিনি রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার সাথে পরিচিত হন এবং পরবর্তীতে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে পূর্বভারত তথা বাংলার দিকে যাত্রা করেন।

বাংলায় তার আগমন ঘটে ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষার্ধে। সে সময় বাংলায় রাজনৈতিক অস্থিরতা বিরাজ করছিল, বিশেষ করে তুঘরিল খান-এর বিদ্রোহের প্রেক্ষাপটে বাংলা অশান্ত ছিল। গিয়াসুদ্দীন বলবন বাংলায় অভিযান চালালে শাহ মখদুম (রহ.) বলবনের অভিযানে সঙ্গী হয়ে বাংলায় আসেন এবং পরে গৌড় অঞ্চলে বসতি স্থাপন করেন। এখান থেকেই তার ধর্মপ্রচার কার্যক্রমের সূচনা হয়।

প্রথমে তিনি নোয়াখালীর শ্যামপুর অঞ্চলে খানকা প্রতিষ্ঠা করে ইসলাম প্রচার শুরু করেন। তার অনুপম চরিত্র, আধ্যাত্মিক শক্তি এবং মানবিক আচরণে মুগ্ধ হয়ে অসংখ্য মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে। কিছুদিন পর তিনি রাজশাহী অঞ্চলে আসেন, যা তখন মহাকালগড় নামে পরিচিত ছিল এবং যেখানে অত্যাচারী সামন্ত শাসন বিদ্যমান ছিল।

রাজশাহীতে এসে তিনি শুধু ধর্মপ্রচারই করেননি, বরং সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াইও করেছেন। স্থানীয় শাসকদের অত্যাচার, নরবলি প্রথার বিরুদ্ধে তিনি জনগণকে সংগঠিত করেন। তার নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী বাহিনী গড়ে ওঠে, যা নৌ, অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনীতে বিভক্ত ছিল। এই বাহিনীর মাধ্যমে তিনি স্থানীয় শাসকদের বিরুদ্ধে একাধিক যুদ্ধে অবতীর্ণ হন।

প্রথম যুদ্ধে তিনি নৌ, অশ্বারোহী ও পদাতিক বাহিনী নিয়ে বাঘা থেকে মহাকালগড়ে অগ্রসর হন। উভয় পক্ষের মধ্যে ভয়াবহ সংঘর্ষ হয়, বহু লোক হতাহত হয় এবং অসংখ্য ঘোড়াও মারা যায়। এই ঘটনা থেকেই বর্তমান রাজশাহীর ‘ঘোড়ামারা’ এলাকার নামের উৎপত্তি বলে জনশ্রুতি আছে। যুদ্ধ শেষে তিনি বাঘায় ফিরে যান।

পরবর্তীতে দেওরাজরা প্রতিশোধের জন্য পুনরায় শক্তি সঞ্চয় করলে শাহ মখদুমও অত্যাচারিত জনগণকে সঙ্গে নিয়ে শক্তিশালী বাহিনী গঠন করেন। দ্বিতীয় যুদ্ধে তিনি বিজয় অর্জন করেন এবং শাসকগোষ্ঠী পরাজিত হয়ে পালিয়ে যায়। এই বিজয়ের ফলে ওই অঞ্চলে ইসলামের ভিত্তি সুদৃঢ় হয়।

তৃতীয় ও শেষ যুদ্ধে দেওরাজরা আবার পরাজিত হয় এবং তাদের অনেকেই বন্দী হয়। তবে শাহ মখদুম তাদের হত্যা না করে ক্ষমা করে দেন এবং আহতদের সেবা করেন। তার এই মহানুভব আচরণে মুগ্ধ হয়ে অনেকেই ইসলাম গ্রহণ করে।

শাহ মখদুম রুপোশ (রহ.) প্রায় ৪৪ বছর রাজশাহীতে অবস্থান করেন এবং এই সময়ে তিনি ইসলাম প্রচার, সমাজ সংস্কার এবং আধ্যাত্মিক সাধনায় নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। তার জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি ইবাদত-বন্দেগিতে অধিক মনোনিবেশ করেন এবং তার শিষ্যদের বিভিন্ন অঞ্চলে ইসলাম প্রচারের দায়িত্ব অর্পণ করেন।

১৩১৩ খ্রিষ্টাব্দে (৭১৩ হিজরি) তিনি ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর পূর্বে তিনি নিজেই তার কবরের স্থান নির্ধারণ করে যান। বর্তমানে তার মাজার রাজশাহী শহরের দরগাপাড়ায় অবস্থিত, যার দক্ষিণে পদ্মা নদী এবং পূর্বে রাজশাহী কলেজ। প্রতি বছর হিজরি রজব মাসের ২৭ তারিখ তার মাজারে উরস পালিত হয়। এই উরস উপলক্ষে দেশ-বিদেশ থেকে হাজার হাজার মানুষ সমবেত হয়। এটি শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, বরং একটি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মিলনমেলাও বটে।

তার জীবনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কিছু অলৌকিক কাহিনিও, যেমন কুমিরের পিঠে চড়ে নদী পার হওয়া। যদিও এসব কাহিনীর ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই, তবুও এগুলো তার প্রতি মানুষের গভীর বিশ্বাস ও ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।

শাহ মখদুম রুপোশের (রহ.) জীবন একদিকে যেমন আধ্যাত্মিক সাধনার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, অন্যদিকে তেমনি সামাজিক ন্যায় ও মানবতার প্রতীক। তিনি ধর্মপ্রচারকে কেবল উপদেশে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং মজলুম মানুষকে সংঘটিত করে জুলুমের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন, নববলি প্রথার মত নিকৃষ্ট কুসংস্কার ও জুলুম বন্ধ করেছেন। তার অবদানেই বরেন্দ্র ও গৌড় অঞ্চলে ইসলাম সুপ্রতিষ্ঠিত হয় এবং আজও তার স্মৃতি ও শিক্ষা মানুষের মাঝে প্রেরণা জাগিয়ে চলেছে।

ওএফএফ

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।