‘অভিযোগ করা ছেড়ে দিলেই সবকিছু বদলে যাবে’
ক্যারিয়ারের ১৩ বছর পার করেও নাসুম আহমেদ থেমে থাকেননি। নতুন ডেলিভারি শেখা, অভিযোগ নয় নিজেকে বদলানোর দর্শনেই বিশ্বাস করেন তিনি। বিপিএলে ইনসুইংয়ের চর্চা থেকে শুরু করে ক্রিকেটকেন্দ্রিক জীবনদর্শন, প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে পাশ কাটিয়ে মানসিক দৃঢ়তা গড়ে তোলার গল্প-সব মিলিয়ে নাসুম আহমেদ যেন বাংলাদেশের ক্রিকেটে পরিণত পেশাদারিত্বের এক শান্ত প্রতিচ্ছবি। ব্যাটিংয়েও আত্মবিশ্বাস তাকে করেছে বাকিদের থেকে আলাদা। জাগো নিউজের সঙ্গে নাসুমের লম্বা আলাপের চুম্বক অংশ এখানে তুলে ধরা হলো-
জাগো নিউজ: বিপিএলে আপনার নতুন অস্ত্র ইনসুইং...এটার বিষয়ে একটু বলেন...
নাসুম আহমেদ: আসলে এটা অনেক দিন ধরেই চেষ্টা করছি। তবে মাঠে কখনো করিনি, আত্মবিশ্বাস ছিল না। এখনো যে ১০০% এটা সঠিক হচ্ছে, তা না। এখনো কিন্তু একটু উপরে পড়ে যাচ্ছে। ওই বলটা যদি আরেকটু পেছনে পড়ে, আমি মনে করি অনেক ভালো এবং কার্যকর হবে। আমার কাছে মনে হচ্ছে আরকি! কালকেও (সোমবার) সৌম্য ভাই যেটা মারলো, একটু উপরে ছিল। এরপর রানা যেই বলটা স্লগ করতে গিয়ে বললো, সেটাও একটু উপরে ছিল। দুইটা একই লেন্থই ছিল, তবে একটা ব্যাটে লাগছে, একটা লাগে নাই আরকি! দুইটাই আউটসুইং বল ছিল। তবে আমার কাছে মনে হয় এটা লেন্থটা আরেকটু পেছনে হলে আমার মনে হয় অ্যাফেক্টিভ। আমি ওইটা ট্রাই করছি, এখনো ১০০% হয়নি।
জাগো নিউজ: বিপিএলে কী কন্ডিশন দেখে এটা অ্যাপ্লাই করলেন?
নাসুম: না, যে কেউ যদি এক্সট্রা একটা জিনিস শিখতে পারে, ওর জন্যই বেনিফিট। যেমন আমাকে আপনি এতদিন ধরে রিড করছেন একরকম করে এখন গিয়ে দেখতেছেন আমি আরেকরকম বল করে ফেলছি, এটা আপনার জন্য প্রবলেম হবে।
জাগো নিউজ: ক্যারিয়ারের ১৩ বছর পর এসেও আপনি নতুন কিছু চেষ্টা করছেন?
নাসুম: হ্যাঁ, আমি যখন প্র্যাকটিস করি বা রুমে যখন শুয়ে থাকি, আমার বিছানায় একটা বল থাকে। আমি সেটা ধরে চেষ্টা করি হাতের মধ্যেই। হাতের রিস্টের মধ্যেই চেষ্টা করি এই বলটা কিভাবে ছাড়া যায়। টিভিতে আমি লেফট আর্ম স্পিনারদের বোলিং দেখি। ও আসলে কী করছে, ওই সময় থেকেই ঐরকম ভাবে বল ধরার চেষ্টা করি। তবে বডির কোনো কিছু পরিবর্তন করি না। যা করার এই রিস্ট দিয়ে মানে আঙ্গুল দিয়েই করার চেষ্টা করি।
জাগো নিউজ: আপনার জীবনে ক্রিকেটই কি সব?
নাসুম: এক মাসের একটা ট্যুর করে বা একটা টুর্নামেন্ট শেষ করে আসলে প্ল্যান করি, এক সপ্তাহ কোথাও বেরই হব না, কিছুই করব না। কিন্তু একটা রাত যেতেই মনে হয়-নাহ, একটু দৌড়ানো দরকার। একটু বোলিং করা দরকার। আমার দ্বারা বিশ্রাম নেওয়াই হয় না। ক্রিকেট ছাড়া কিছু বুঝি না, পারি না। বলা যায় আমি ক্রিকেটকেন্দ্রিক একজন মানুষ।
জাগো নিউজ: এই যে ক্রিকেটকেন্দ্রিক চিন্তাভাবনা, এটা আপনার ক্যারিয়ারে কতটা কাজে দেয়?
নাসুম: আমি কিন্তু অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ খেলে এসেও ঢাকা ফার্স্ট ডিভিশন খেলছি। কারণ মনে হয়েছে আমি লিস্ট-এ ক্রিকেটের জন্য প্রস্তুত না। আমি ওই বছর আবার ফার্স্ট ডিভিশন খেলছি এবং প্রায় ৩৬ উইকেট পেয়ে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি হই। এবং ওইখানে প্রায় ৪০০-এর কাছাকাছি আমি রানও করছি। ওই সময় এটা আমার মনের মধ্যে আসছে যে, প্রিমিয়ার লিগ আমি এখন খেলব না, আমি আরো এক বছর পরে খেলব। এজন্য আবার আমি ফার্স্ট ডিভিশন খেলছি। আমার মনে হয় একটু পরিপূর্ণ হয়ে গেছি, ভালো একটা জায়গায় আমার অভিষেক হয়েছে। ওখানে আমি ভালো করতে পেরেছি বলে হয়তোবা আমি খারাপ সময় গেলেও ওভারকাম করতে পারছি।
জাগো নিউজ: দেশে এত বাঁহাতি স্পিনার, কখনো কখনো পারফর্ম করেও হয়তো সুযোগ মেলে না। নিজেকে মানসিকভাবে চাঙ্গা রাখেন কিভাবে?
নাসুম: আমি কাউকে দেখে যদি মনে করি আমার এর থেকে আরেকটু এই করতে হবে, ওই করতে হবে। আমি কখনো তার মতো হতে পারবো না। তাকে নিয়ে চিন্তা করা যখন আমি ছেড়ে দেব, আমার লাইফ এমনিই পরিবর্তন হয়ে যাবে। আপনাকে যখন থেকে আমি আমার প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবা বাদ দিয়ে দেব, তখন থেকে আমার সবকিছু চেঞ্জ হয়ে যাবে। আপনাকে নিয়ে যখন আমি অভিযোগ করা ছেড়ে দেব, তখন থেকে আমার সবকিছু বদলে যাবে।অভিযোগ করাটা যখন একটা মানুষ ছেড়ে দেবে, তখনই ওর লাইফে টার্নিং পয়েন্টটা শুরু হয়ে যাবে। আমি কাউকে নিয়ে কোনো অভিযোগ করতে চাই না।
জাগো নিউজ: শুরুতে মনে করা হতো যে আপনি একটু ডিফেন্সিভ বোলার, রান কম দিবেন...
নাসুম: এটা আমার হয়ে যায়। আমি খুব দ্রুতই করি। এটা সবখানে। আমি ডমেস্টিকও যখন খেলি, দ্রুতই আমার ওভার শেষ হয়ে যায়। এটা কিন্তু আমি আমার দলের স্বার্থেই করি, টিমের চিন্তাভাবনাতেই করি, আমি আমার স্বার্থে করি না। সবাই চায় উইকেট নিতে। আলহামদুলিল্লাহ আল্লাহর শুকরিয়া যে এই জিনিসটা এখন আমার ফিল হয় যে এখন আমার টিমের একটা উইকেট জরুরি। এখন আমার কেউ বলা লাগে না যে-এইখানে রান কম দে, এখানে একটা উইকেট লাগবে। এখন আর বলা লাগে না। এখন আমি বুঝি। বোলিংয়ে আসার আগেই চিন্তা করি এইখানে আমার এই ওভারে রানটা আটকাতে হবে। এই ওভারে আমার একটা উইকেট বের করতে হবে আমার টিমের জন্য অনেক হেল্প হবে। এইজন্য হয়তোবা এখন টিমও অনেক কিছু দিতে পারছি, টিমও আমাকে ট্রাস্ট করছে।
জাগো নিউজ: ব্যাটিংটা নিয়ে একটু বলবেন… কী ভাবেন ব্যাটিং নিয়ে?
নাসুম: সবাই আমাকে চেনে বোলার হিসেবে, মূল দায়িত্বও বোলিংয়েই। এখন যদি আমি আমার ব্যাটিংয়ে আর কি মনোযোগ দেই আমার এদিকে (বোলিং) সমস্যা হয়ে যাবে। হ্যাঁ, ঠিক আছে। মনোযোগ দেব না যে তা না, এটা দলের জন্য প্রয়োজন, ১০-১৫-২০ রান প্রয়োজন। তো এটা আমি করতে পারি আলহামদুলিল্লাহ। হ্যাঁ, এটার জন্য আমি আলাদাভাবে এক্সট্রা কাজ করি যাতে ওই কাজটা আমি যাতে করতে পারি।
জাগো নিউজ: শেষ দিকের ব্যাটিং নিয়ে আপনাদের বোলারদের মধ্যেও কি আলোচনা হয়?
নাসুম: হ্যাঁ, প্রচুর হয়। আমরা যদি ১০ রান করে করি, পাঁচ রান করে করে টিমের জন্য। যখন আমার দল করলো ১৪০ রান আমরা দুইজন মিলে করলাম ১০ রান। ১৫০ কিন্তু হয়ে যাচ্ছে। বা ৫০ করলে ১৮০-১৯০ কিন্তু হয়ে যাচ্ছে। এরকম করলে অনেকটা আগায়া যাবে, লাস্টের যে তিন-চারজন থাকে। তবে আমি কিন্তু একটা জায়গায় ডেঞ্জারাস ভাই, সময় পেলে কিন্তু বিপক্ষ টিমের জন্য ভয়ঙ্কর আমি।
জাগো নিউজ: সামনে বিশ্বকাপ খেলতে যাবেন। অধিনায়কের সঙ্গে কেমন কথা হয়েছে?
নাসুম: বিশ্বাস রাখতেছে। বাট আপ এন্ড ডাউন আছে। ভেতরে এতো বুঝা যায় না। তবে বাহিরেও অনেক কথা বলে, অনেক বুঝায় তো মাশাআল্লাহ।
জাগো নিউজ: ক্যাপ্টেন হিসেবে লিটন দাস মাঠের বাইরে কেমন?.
নাসুম: ভেতরে (টিভিতে খেলার সময়) এত বুঝা যায় না। বাহিরেও অনেক কথা বলে, অনেক বুঝায়, অনেক কাজ করে। একবারে সবকিছুর পর ওর নিজেরও তো কাজ করা লাগে। মাশাআল্লাহ সে সবাইকে নিয়েই বসে। পুরো দলকে এক জায়গায় নিয়ে সব আলোচনা করে। এটা আমি মনে করি ক্যাপ্টেন হিসেবে সেরা গুণাবলি।
এসকেডি/এমএমআর/এমএস