নাহিদ একা নন, টেস্ট জয়ের নেপথ্যে এক দুর্দান্ত বোলিং ইউনিটের গল্প

আরিফুর রহমান বাবু
আরিফুর রহমান বাবু আরিফুর রহমান বাবু , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০৯:৫৪ পিএম, ১২ মে ২০২৬

মাঝে ওয়ানডে আর টি-টোয়েন্টিতে বেশ কয়েকবার খেলা হলেও ২০২৪ সালের সেই রাওয়ালপিন্ডিতে হওয়া ২ ম্যাচের টেস্ট সিরিজের পর এবারই প্রথম টেস্টে দেখা বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের এবং খুব স্বাভাবিকভাবেই এ টেস্ট সিরিজে ঘুরেফিরে ২০২৪ সালের ওই সিরিজের কথাই উঠেছে বেশি। সাথে যোগ হয়েছিল নাহিদ রানার সাম্প্রতিক বারুদে বোলিংয়ের গল্প।

তা হোক ভিন্ন ফরম্যাট মানে টি-টোয়েন্টিতে; কিন্তু পিএসএলে নাহিদ রানা সেই পাকিস্তানীদের নাজেহাল করেই ঢাকা টেস্ট খেলতে নেমেছিলেন। পিএসএলে নাহিদ রানাকে খেলতে গিয়ে মুখ থুবড়ে পড়েছেন পাকিস্তানের বাঘা বাঘা উইলোবাজরা। ধারণা করা হচ্ছিল নাহিদ রানাই হতে পারেন বাংলাদেশ অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর বোলিং ট্রাম্পকার্ড।

দেখার বিষয় ছিল, উইকেট কেমন হয়? শুধু নাহিদ রানার কথা মাথায় রেখেই কি তৈরি হবে শেরে বাংলার পিচ? শুধু নাহিদ রানা কেন? পাকিস্তানীদেরও আছে টেস্টে বেশ কার্যকর মোহাম্মদ আব্বাস ও শাহিন শাহ আফ্রিদির মতো ফাস্টবোলার আর নোমান আলির মতো কার্যকর স্পিনার।

কাজেই দেখার বিষয় ছিল, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের প্রথম টেস্টের উইকেট কেমন হয়। শুধু নাহিদ রানা একাই বাংলাদেশকে জেতাবেন- এমন ভাবার যৌক্তিকতাও খুব বেশি ছিল না। ধারণা করা হয়েছিল, রাওয়ালপিন্ডির ওই স্পোর্টিং পিচের আদলেই তৈরি হতে পারে ঢাকা টেস্টের পিচ।

এবং এটাও দেখার বিষয় ছিল, গত বছর পাকিস্তানের রাওয়ালপিন্ডির ওই স্পোর্টিং পিচে টিম পারফরম্যান্সের ওপর ভর করেই ২-০ তে পাকিস্তানীদের হোয়াইটওয়াশ করেছিল টাইগাররা।

বাংলাদেশ খেলেছিল একটা ইউনিট হয়ে। ব্যাটাররা রান করেছিলেন। যখন যার কাছ থেকে যেমন দরকার ছিল, তিনি তা করে দিয়েছেন। একইভাবে বোলাররাও পরিবেশ-পরিস্থিতি অনুযায়ী বোলিং করে দলের প্রয়োজন মিটিয়েছেন।

এবার ঘরের মাঠে টাইগাররা সেই টিম পারফরম্যান্স করে দেখাতে পারেন কিনা? ব্যাটার ও বোলাররা প্রয়োজনের সময় ব্যাট ও বল হাতে জ্বলে উঠে দল জেতাতে পারেন কিনা- সেটাই ছিল দেখার।

বলার অপেক্ষা রাখে না, ঠিক সেই টিম পারফরম্যান্সটাই হয়েছে শেরে বাংলায়। শান্তর দল একটা ইউনিট হয়েই খেলেছে। ব্যাটাররা নিজেদের কাজ করে দিয়েছেন। বোলাররা সেই পথে হেঁটে সাফল্য বয়ে এনেছেন।

আজ মঙ্গলবার পড়ন্ত বিকেলে ফাস্টবোলার নাহিদ রানার বোলিং তাণ্ডবে লণ্ডভণ্ড পাকিস্তান; কিন্তু তার আগে স্বাগতিকরা ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পায় অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত, মুমিনুল হক আর মুশফিকুর রহিমের চওড়া ব্যাটে।

অধিনায়ক শান্ত প্রথম ইনিংসে দারুণ সেঞ্চুরির পর দ্বিতীয় ইনিংসেও সামনে থেকে ব্যাট হাতে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এমনকি আজ উভয় ইনিংসে শতরানের খুব কাছে গিয়েও স্বার্থপরের মতো ব্যাট না করে রানের পিছনে ছুটে নিজের ক্যারিয়ারের এক বিরাট মাইলফলক ছোঁয়া সম্ভব হয়নি শান্তর। তার সামনে ছিল বিরাট রেকর্ডের হাতছানি।

আজ শেষ ইনিংসে আর ১৩ রান করতে পারলে সুনিল গাভাস্কার, রিকি পন্টিং আর ডেভিড ওয়ার্নারের পর চতুর্থ ব্যাটার হিসেবে টেস্টে উভয় ইনিংসে তিনবার সেঞ্চুরিয়ান হতে পারতেন শান্ত; কিন্তু যেহেতু পাকিস্তানকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেওয়ার লক্ষ্য ছিল, তাই দ্রুত রান করতে গিয়ে শান্ত ইমপ্রোভাইজ করে রিভার্স সুইপ খেলতে গিয়ে লেগবিফোর উইকেটের ফাঁদে জড়ান।

এছাড়া মুমিনুল হকও উভয় ইনিংসে হাফ সেঞ্চুরি হাঁকান। মুশফিকও একবার পঞ্চাশে পা রাখেন। অন্যদিকে প্রথম ইনিংসে ৫ উইকেট দখল করে অফস্পিনার মেহেদি হাসান মিরাজ ২৭ রানের লিড এনে দিয়েছেন।

আর আজ শেষ দিন শেষ বিকেলে নাহিদ রানা বল হাতে আগুন ঝরিয়ে পাকিস্তানিদের নাজেহাল করে ম্যাচ জিতিয়ে দিলেন।

সব মিলিয়ে একটা পরিপূর্ণ টিমওয়ার্ক, টিম পারফরম্যান্স। যখন যার কাছ থেকে যেটা দরকার ছিল সবাই তা করেছেন। মনে হলো যেন, মিরাজ আর নাহিদ রানাই বুঝি বল হাতে সব কাজ করেছেন। তা নয়। আজ ভাইটাল ব্রেকথ্রু দিয়েছেন বাঁহাতি স্পিনার তাইজুল আর ফাস্টবোলার তাসকিন।

দ্বিতীয় ইনিংসে যিনি পাকিস্তানকে আশা জাগাচ্ছিলেন, সেই ওয়ান ডাউন আব্দুল্লাহ ফজলকে (৬৬) ফিরিয়ে দিয়ে পাকিস্তানকে বেকায়দায় ফেলেন তাইজুল। ঠিক তার পরপরই সালমান আগাকে আউট করে খেলার মোড় ঘুরিয়ে দেন। বলার অপেক্ষা রাখে না, আগা সালমান আর আবদুল্লাহ ফজল পাকিস্তানকে নীরবে এগিয়ে নিচ্ছিলেন লক্ষ্যের দিকে।

চতুর্থ উইকেট জুটিতে ৫১ রান যুক্ত করে আব্দুল্লাহ ফজল আউট হওয়ার পর মাত্র ২ রানের মধ্যে তাসকিন আগা সালমানকে ফিরিয়ে দিয়েই ম্যাচের চালচিত্র পাল্টে দেন। এরপর নাহিদ রানার বারুদে বোলিং তোপে একের পর এক অসহায় আত্মসমর্পণ পাকিস্তানীদের। মানে একটা বোলিং ইউনিটের কাছেই শেষ পর্যন্ত হার পাকিস্তানের।

সেটাই আজ খেলা শেষে বারবার বলেছেন টাইগার ক্যাপ্টেন শান্ত। বলেছেন বেশ আত্মবিশ্বাস আর আস্থায়, ‘আপনার যখন একই মানের কজন সিজনড বোলার থাকবে, তাদের গড়া বোলিং ইউনিট আপনাকে দেবে বাড়তি সাহস, আস্থা আর নির্ভরতা। আমরা সেই সাহস ও শক্তিতে বলিয়ান হয়েই জয়ের স্বপ্ন দেখি। জিতেছিও।’

এআরবি/আইএইচএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।