‘স্পিনার সাকিবকে’ খুব মিস করছে বাংলাদেশ

আরিফুর রহমান বাবু
আরিফুর রহমান বাবু , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০৫:৩৯ পিএম, ০২ ফেব্রুয়ারি ২০১৮

তার মেধা-প্রজ্ঞা নিয়ে নতুন করে আর কিই বা বলার আছে । ক্রিকেটার, সাকিব আল হাসান অনেক গুণে গুণান্বিত। তার গুণের শেষ নেই। প্রশংসা বা গুণবাচক নামও অনেক; বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার তো গায়ের সাথে স্থায়ীভাবে লেগে আছে। অনেকেই তাকে ডাকেন ‘সব্যসাচী ক্রিকেটার’, ‘টু ইন ওয়ান’। সবচেয়ে বড় কথা হলো পারফরমার সাকিব আল হাসান বাংলাদেশের সেরা সম্পদ। টিম বাংলাদেশের মূল চালিকাশক্তি।

ইতিহাস ও পরিসংখ্যান সাক্ষী দিচ্ছে, ব্যাটসম্যান আর স্পিনার সাকিব তিন ফরম্যাটেই বাংলাদেশের এক নম্বর পারফরমার। তার ব্যাট যেমন নির্ভরতার প্রতীক। তেমনি বোলার সাকিব তো সন্দেহাতীতভাবেই সেরা অস্ত্র। টেস্ট, ওয়ানডে আর টি-টোয়েন্টি, তিন ফরম্যাটেই রান করা ও উইকেট শিকারে সাকিব শীর্ষ দুইয়ে।

ব্যাটিং শৈলি, অ্যাপ্রোচ-অ্যাপ্লিকেশন আক্রমণাত্মক। শটস খেলার সামর্থ্য বেশি। যে কোন পরিবেশ-পরিস্থিতিতে তার ব্যাট থেকে চটকদার ও বাহারি স্ট্রোক বেরিয়েও আসে। তারপরও দলের প্রয়োজনে টেস্টে লম্বা ইনিংস খেলার সামর্থ্যও আছে। দেশের হাতেগোনা তিনজন ডাবল সেঞ্চুরিয়ানের একজন সাকিব আল হাসান।

আর তার বোলিং সাফল্যের ফিরিস্তি দিয়েও শেষ করা যাবে না। ওয়ানডে ফরম্যাটেই শুধু অধিনায়ক মাশরাফির (১৮৫ খেলায় ২৩৭ উইকেট) পিছনে থেকে (সমান ১৮৫ খেলায় ২৩৫) দ্বিতীয় স্থানে সাকিব। টেস্ট (৫১ ম্যাচে ১৮৮ উইকেট) ও টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে (৬১ ম্যাচে ৭৩ উইকেট) সাকিব বাংলাদেশের সর্বাধিক উইকেট শিকারী।

শ্রীলঙ্কার সাথে প্রথম টেস্টে এমন অতি কার্যকর অলরাউন্ডার ছাড়া বাধ্য হয়েই খেলতে নামতে হয়েছে বাংলাদেশকে। এই তো গত ২৭ জানুয়ারি মিরপুরের শেরে বাংলায় ত্রিদেশীয় ক্রিকেটের ফাইনালে ফিল্ডিং করতে গিয়ে বাঁ-হাতের কনিষ্ঠ আঙ্গুল ফেটে যাওয়ায় টেস্টে বাংলাদেশের নতুন অনিায়ক সাকিব মাঠের বাইরে। তার বদলে নেতৃত্বে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ।

টেস্ট শুরুর আগে ভক্ত ও সমর্থকদের মনে কিছুটা সংশয় ছিল। সাবেক কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহের রোষানলে পড়ে মাঝে টেস্ট দল থেকে ছিটকে পড়া মুমিনুল হক আর মাহমুদউল্লাহ কি আবার ব্যাট হাতে নিজেদের মেলে ধরতে পারবেন? সাকিব আল হাসানের অনুপস্থিতিতে তাদের ব্যাট হাতে জ্বলে ওঠা যে খুব জরুরি!

সে সংশয় কেটেছে প্রথম দিনই। দেশের টেস্ট ক্রিকেট ইতিহাসের সফলতম ব্যাটসম্যান মুমিনুল ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা ব্যাটিং নৈপুণ্য দেখিয়েছেন চট্টগ্রাম টেস্টে। সাফল্যের পয়োমন্তঃ ভেন্যু জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামে ক্যারিয়ারের চতুর্থ সেঞ্চুরি করে নিজের সাথে এ মাঠকে স্মরণীয় সাফল্যে গেঁথে রেখেছেন এ বাঁ-হাতি ব্যাটসম্যান।

আর সাকিব আল হাসানের বদলে অধিনায়ক হিসেবে মাঠে নামা মাহমুদউল্লাহও সময়মতো ঠিক কাজের কাজটি করে দিয়েছেন। শুধু এই দু'জন নন, সাত ব্যাটসম্যানের মধ্যে লিটন দাস (০) ও মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত (৮) ছাড়া বাকি পাঁচ ব্যাটসম্যান যথেষ্ঠ ভাল খেলেছেন।

সাকিবের অনুপস্থিতিতে মুমিনুল হক দারুণ ব্যাটিং করেছেন। নিজের মেধা ও সামর্থ্য প্রমাণে বদ্ধ পরিকর ও দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ বাঁ-হাতি মুমিনুলের ব্যাট থেকে বেরিয়ে এসেছে ১৭৬ রানের বিরাট ইনিংস। সেঞ্চুরি করতে না পারলেও অধিনায়কত্ব হারানো মুশফিফিকুর রহীম (৯২) আর এ টেস্টে নেতৃত্ব দেয়া মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের (৮৩*) ব্যাট থেকেও বেরিয়ে এসেছে একজোড়া ভাল এবং দীর্ঘ ইনিংস। আর ফর্মের চুড়োয় থাকা তামিম ইকবালও ফিফটি (৫২) উপহার দেয়ায় বাংলাদেশ পৌছে গেছে ৫০০‘র ঘরে ( মোট ৫১৩ রান)।

ওই চারজন মিলেই করে দিয়েছেন ৪০৩ রান। তাই সে অর্থে সাকিবের ব্যাটিংয়ের অভাব খুব একটা অনুভুত হয়নি; কিন্তু কঠিন সত্য হলো গত ২৪ ঘন্টার বেশি সময় ধরে বারবার সবাই মিস করছেন ‘বোলার সাকিবকে’। স্পিনার সাকিব যে দলের কত বড় সম্পদ, বোলিংয়ের সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র- এ টেস্টে তা হাঁড়ে হাঁড়ে টের পাওয়া যাচ্ছে।

এটা সত্য, গত এক বছরের বেশি সময়ে একই মাঠে ইংল্যান্ড আর অস্ট্রেলিয়ার সাথে খেলার সময় জহুর আহমেদ চৌধুরী স্টেডিয়ামের পিচ যত স্পিন বান্ধব ছিল, এবারের উইকেট এখনো ততটা স্পিন সহায়ক নয়। আজ তৃতীয় দিন পর্যন্ত উইকেট ব্যাটিং ফ্রেন্ডলি। পিচ যতই ফ্ল্যাট আর ব্যাটিং বান্ধব হেক না কেন, তৃতীয় দিনও স্বাগতিক কোন বোলার বিশেষ করে তিন স্পিনার তাইজুল, মিরাজ ও সানজামুলের একজন স্পিনারও লঙ্কান ব্যাটসম্যানদের কাছ থেকে সমীহ আদায় করতে পারেননি।

উইকেট স্পিন বান্ধব হবে ভেবে তিন-তিনজন স্পিনার তাইজুল, মেহেদী হাসান মিরাজ আর সানজামুল ইসলাম নয়নকে খেলানো; কিন্তু তার কোনই কার্যকরিতা পাওয়া যায়নি। তিন স্পিনার লঙ্কান ব্যাটসম্যানদের ওপর এতটুকু প্রভাব বিস্তার করতে পারেননি। তাদের বিরুদ্ধে খেলতে কোনই সমস্যা হয়নি লঙ্কান ব্যাটসম্যানদের।

তাইতো শূন্য রানে উদ্বোধনী জুটি ভাঙ্গার পরও দ্বিতীয় উইকেটে চান্দিমালের দল পেয়েছে ৩০৮ রানের বিশাল পার্টনারশিপ। নতুন বলে পেসার মোস্তাফিজ ব্রেক থ্রু উপহা না দিলে ধনঞ্জয়া ডি সিলভা নির্ঘাত ডাবল সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে বসতেন। কাটার মাস্টারের বলে পুল করতে গিয়ে আকাশে ক্যাচ দিয়ে ফেরার আগে ধনাঞ্জয়া ডি সিলভা খেলেছেন ১৭৩ রানের ইনিস। আরেক লঙ্কান কুশল মেন্ডিসও ১৯৬ রানের বড় ইনিংস উপহার দিয়েছেন। এই লঙ্কান ওপেনারের উইকেটটি অবশ্য নিয়েছেন বাঁ-হাতি স্পিনার তাইজুল; কিন্তু তারও বহু আগেই লঙ্কানরা দাঁড়িয়ে গেছে মজবুত ভিতের ওপর।

এআরবি/আইএইচএস/আইআই