নিষেধাজ্ঞা মুক্তিই কি জাতীয় দলে ফেরার নিশ্চয়তা আশরাফুলের?

আরিফুর রহমান বাবু
আরিফুর রহমান বাবু , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০২:২৫ পিএম, ১২ আগস্ট ২০১৮ | আপডেট: ০৩:০২ পিএম, ১২ আগস্ট ২০১৮

দেশের বা ঘরের ক্রিকেটে এখন কোন কার্যক্রম নেই। জাতীয় লিগ, প্রিমিয়ার লিগ, বিসিএল, বিপিএল-কোন খেলাই নেই। আর তিনিও দেশে নেই, বিদেশে। তারপরও হঠাৎ আবার তাকে নিয়ে আলোচনা। পর্যালোচনা। নানা কথাবার্তা। কেন, হঠাৎ কি এমন হলো যে আবার পাদপ্রদীপের আলোয় মোহাম্মদ আশরাফুল?

কারণ অজ্ঞাত নয়। সবার জানা। আগামীকাল মানে ১৩ আগস্ট পুরোপুরি মুক্ত বিহঙ্গ হয়ে যাচ্ছেন আশরাফুল। কাল সোমবার উঠে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তার পাঁচ বছরের দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞা।

অবশ্য তারও আগে তিনি ঘরের ক্রিকেটে খেলার অনুমতি পেয়েছেন। সেটা এক বছরেরও বেশি সময় আগে। ২০১৭ এবং ২০১৮ সালে ঢাকার ক্লাব ক্রিকেট মানে প্রিমিয়ার লিগ খেলেছেন এ অসাধারণ মেধাবী নন্দিত, নিন্দিত ক্রিকেটার।

সর্বশেষ প্রিমিয়ার লিগে সর্বাধিক ও রেকর্ড পাঁচ সেঞ্চুরি হাঁকিয়ে হৈ চৈ ফেলে দিয়েছিলেন। সেটাও চার মাস আগে। ঘরের ক্রিকেটে প্রিমিয়ার লিগ, বিসিএল আর জাতীয় লিগ খেলার অনুমতি পেলেও দুটি বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা ছিল। একটি, জাতীয় দলে ফেরা আর দুই, বিপিএল খেলা।

দুটি নিষেধাজ্ঞাই কেটে যাবে কাল। তার মানে এখন আর তার জাতীয় দলে খেলার বিষয়ে ক্রিকেটের সর্বোচ্চ সংস্থা আইসিসির কোন বাধা বিপত্তি থাকবে না। আগামী ১৪ আগস্ট থেকে আশরাফুল আবার জাতীয় দলের পোশাকে যে কোন আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে পারবেন।

আশরাফুল ভক্তরা এমন শুভক্ষণের অপেক্ষায় বহুদিন। অগনিত সমর্থক অপেক্ষার প্রহর গুনছেন কবে আবার জাতীয় দলের হয়ে মাঠে নামবেন আশরাফুল।

ভক্তরা আবেগ-ভালবাসায় অন্ধ থাকেন। তাদের ভাবনায় যুক্তি, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ, বিশেষ করে ক্রিকেটীয় চিন্তা ও যুক্তির চেয়ে আবেগ-ভালবাসাই বেশি থাকে। এক্ষেত্রেও তাই আছে। আশরাফুল ভক্তরা যুক্তি না মেনে আবেগকে বড় করে দেখছেন। তাদের ধারণা এমন, এতদিন আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলা নিষেধ ছিল। এখন আর তা নেই। তাই আশরাফুল এখন জাতীয় দলে খেলতেই পারে। ফিরতেই পারে। ভক্ত ও সমর্থকরা পারলে জোর করেই আশরাফুলকে আবার জাতীয় দলে ঢুকিয়ে দিতে বদ্ধ পরিকর।

আবেগের জোয়ারে ভাসছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমও। কারো কারো স্ট্যাটাস, পোস্ট আর কমেন্ট পড়লে মনে হয় আশরাফুল বুঝি কালকের দিন পরই আবার জাতীয় দলে ফিরে আসছেন। তারা ভাবছেন না, আইসিসির নিষেধাজ্ঞা মুক্তি মানেই ২৪ ঘন্টার মধ্যে আবার জাতীয় দলে ফেরা নয়। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা কেটে যাবার অর্থ রাতারাতি জাতীয় দলে অন্তর্ভুক্তি বা ম্যাচ খেলা নয়।

এটা সত্য, জাতীয় দলে ফেরায় এখন আর কোন আইনি জটিলতা বা আইনগত বাধ্যবোধকতা নেই আশরাফুলের। আইন তাকে জাতীয় দলে খেলা থেকে আর বিরত রাখবে না। কিন্তু তার মানে আশরাফুল ২৪ থেকে ৪৮ ঘন্টার মধ্যেই আবার জাতীয় দলে ফিরবেন, এশিয়া কাপ-জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে হোম সিরিজ কিংবা ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দেশের মাটিতে দলে ডাক পাবেন; এমনটা নয়।

কিন্তু ফেসবুকে কেউ কেউ না জেনে অবুঝের মত প্রায় জোর করেই আশরাফুলকে আবার জাতীয় দলে নিয়ে ফেলেছেন বা নিতে চাচ্ছেন। ফেসবুকে এমন অনেক স্ট্যাটাস চোখে পড়ছে। তারা মাথায় আনছেন না, তার জাতীয় দলে খেলায় যে নিষেধাজ্ঞা ছিল, তা কেটেছে। তাই বলে তার দলে ফেরা নিশ্চিত হয়নি।

তবে এতকাল জাতীয় দলে খেলায় পরিষ্কার নিষেধ ছিল। আগামীকাল থেকে আর তা থাকবে না। হ্যাঁ, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড, টিম ম্যানেজমেন্ট ও নির্বাচকরা আশরাফুলকে বিবেচনায় আনতে পারবেন। তার কথা মাথায় আসতে পারে। এক কথায় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে আশরাফুলের আবার ফেরার একটা সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এতকাল আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের দরজাটা রুদ্ধ ছিল। তা আবার খুলেছে। কিন্তু তা খোলা মানেই আবার জাতীয় দলে ফেরা নয়।

বাস্তবতা হলো, আবার সাদা পোশাক কিংবা লাল সবুজ জার্সি গায়ে ব্যাট হাতে মাঠে নামার জন্য অনেক কাঠ খড় পোড়াতে হবে আশরাফুলকে। সেটা একটা দীর্ঘ মেয়াদি প্রক্রিয়া। সবচেয়ে বড় কথা, নিষেধাজ্ঞা মুক্তির পর আশরাফুলকে সত্যিই আবার জাতীয় দলে বিবেচনা করা হবে কিনা, সেটা হচ্ছে সবার আগে বিবেচ্য।

আশরাফুল অসাধারণ প্রতিভাবান। হয়তো দেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে প্রতিভাবান ব্যাটসম্যান। ব্যাটিং মেধা, টেকনিক, স্টাইল ও প্রায়োগিক ক্ষমতায় হয়তো সবার সেরা। যদিও সে অনুপাতে প্রাপ্তি , অর্জন ও কৃতিত্ব আহামরি নয়।

তারপরও বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে আশরাফুল বড় নাম। কিছু ব্যক্তিগত সাফল্য ও অর্জন আছে। যা শুধু তাকেই না, দেশকেও করেছে বড়। টেস্ট ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ ব্যাটসম্যান হিসেবে শতরান, কার্ডিফে তখনকার অপ্রতিরোধ্য শক্তি অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ জেতানো শতরান, বিশ্বকাপ ও বিশ্ব টি-টোয়েন্টি চ্যাম্পিয়নশিপে যথাক্রমে দক্ষিণ আফ্রিকা ও ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ম্যাচ জেতানো ব্যাটিং-এমন অনেক কীর্তিতে নাম আছে তার। কিন্তু ভুলে গেলে চলবে না, ম্যাচ গড়াপেটায় যুক্ত থাকায় তাতে কাল দাগও লেগেছে। কথাটা শুনতে কানে লাগলেও নির্মম সত্য, আশরাফুলের গায়ে কিন্তু এখনো কাল দাগ, কাঁটার আঁচড় রয়ে গেছে। সে দাগমুক্তি ও আঁচড় রাতারাতি সরানো কঠিন।

সবার আগে চাই বোর্ডের অনুমতি। সেটা লিখিত বা মৌখিক নয়। নৈতিক। সবার আগে জানতে হবে বোর্ড কি ভাবছে। আশরাফুল ইস্যুতে আসলে বিসিবির অবস্থান কি। খুঁটিয়ে দেখতে হবে আশরাফুল আবার জাতীয় দলে ফিরুক, বিসিবি আদৌ তা চায় কিনা। বোর্ডের শীর্ষ কর্তা তথা নীতি নির্ধারকদের চিন্তা-ভাবনা কি। বোর্ড কি ইতিবাচক না নেতিবাচক!

বোর্ড যদি ইতিবাচক মানসিকতায় আশরাফুলের ম্যাচ গড়াপেটার সাথে জড়িত থাকার ঘটনার চেয়ে তার মেধা, সামর্থ্য ও অতীত অর্জন- কৃতিত্ব এবং সাফল্যকে বড় করে দেখে তাহলে তার জাতীয় দলে ফেরার পথ হবে নিষ্কন্টক।

আশরাফুল বড় ক্রিকেটার। তা মেধা ও সামর্থ্য প্রমাণিত। তিনি পারেন। নিজের দিনে একাই ম্যাচ জেতাতে পারেন। যা তিনি করেও দেখিয়েছেন। হঠাৎ ভুল করে বিপথগামী হয়েছিলেন। আবার ভুল বুঝতে পেরে দেশ ও জাতির কাছে ক্ষমা চেয়ে মাঠে ফিরতে চেয়েছেনি তিনি। তার অতীত অর্জন, কৃতিত্ব ও প্রাপ্তির কথা ভেবে তাকে আবার জাতীয় দলে নেয়া যেতেই পারে। যদি বিসিবির ভাবনা এমনই হয়, তাহলে ভিন্ন কথা।

আর যদি বোর্ড মনে করে, আশরাফুল জাতীয় দল তথা দেশের ক্রিকেটের গায়ে কলঙ্কের কাল চিহ্ন এঁকে দিয়েছেন। দেশের মান-মর্যাদাকে ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছেন, ক্রিকেট বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। দেশ ও জাতি হিসেবে আমরা হেয় প্রতিপন্ন হয়েছি। আমাদের ক্রিকেটে অনৈতিকতার ছোঁয়া লেগেছে। ক্রিকেটাররা ম্যাচ গড়াপেটার মত হীন ও খারাপ কাজে জড়িয়ে পড়ার কাজে লিপ্ত হবার পথও খুঁজে পেয়েছে। যা দেশের ক্রিকেটের জন্য মানহানিকর, গ্লানির, অমর্যাদার। তাকে আবার জাতীয় দলে নিলে সেই অন্ধকার জগত আবার মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে পারে। দলীয় শৃঙ্খলা ভেঙে যেতে পারে। ক্রিকেটারদের পারস্পরিক বিশ্বাস, সম্প্রীতি ও সংহতি নষ্ট হতে পারে। টিম স্পিরিট কমে যেতে পারে। তাহলে কিন্তু আশরাফুলের ফেরা কঠিন হবে।

শেষ কথা হলো-বিসিবির মনোভাব, নৈতিক অবস্থান এবং টিম ম্যানেজমেন্ট, তিন ফরম্যাটের অধিনায়ক ও নির্বাচকের মতামত; সব ইতিবাচক হলেই কেবল আশরাফুলের আবার জাতীয় দলে ফেরা হবে। অবশ্য পাশাপাশি আরও দুটি শর্তপূরণও একান্ত জরুরী। তা হলো, আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার মত শারীরিক শক্তি, সামর্থ্য, ফিটনেস এবং পারফরম্যান্স।

ঘরোয়া ক্রিকেটের ফিটনেস দিয়ে চলবে না। আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার জন্য দরকার উন্নত, আরও বেটার ফিটনেস। তার সাথে চাই ঘরোয়া ক্রিকেটে নজরকাড়া পারফরমেন্স। তবেই কেবল ভাগ্য খুলবে আশরাফুলের।

মানুষ যত কিছুই বলুক। আশরাফুল নিজেও কিন্তু এ সব জানেন, বোঝেন। মাস কয়েক আগেই যেমন জাগো নিউজের সঙ্গে আলাপে বলছিলেন, 'আমি এখন জাতীয় দলে ফেরা নিয়ে ভাবছি না। ভাবার সুযোগ নেই। জাতীয় দলে খেলতে হলে আগে আমাকে শারীরিকভাবে শতভাগ তৈরি হতে হবে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলার জন্য যেমন শারীরিক ফিটনেস, সক্ষমতা দরকার; আমার এখন তা নেই। সেটা হার্ডওয়ার্ক আর যথাযথ ট্রেনিং করেই অর্জন করতে হবে।'

সব হিসেব মিললেই কেবল জাতীয় দলে দেখা যেতে পারে আশরাফুলকে। তবে সে পথ অতটা কাছে নয়।

এআরবি/এমএমআর/পিআর

আপনার মতামত লিখুন :