ক্রিকেট

চমক দিয়ে বছর শুরু, হতাশায় শেষ

আরিফুর রহমান বাবু
আরিফুর রহমান বাবু আরিফুর রহমান বাবু , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০৮:০৬ পিএম, ৩১ ডিসেম্বর ২০২২

ক্যালেন্ডারের পাতা ঝরে কেটে গেলো আরও একটি বছর। ৩১ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় সুর্য্য ডোবার মধ্য দিয়ে বিদায় নিলো ২০২২। ভোরের সূর্য্য আকাশ আলোকিত করে উঠবে ২০২৩। বছর সায়াহ্নে নতুন বছরের পূর্বাহ্নে চলছে নানা হিসেব নিকেশ।

কেমন কাটলো পুরোন বছর। খেলাপ্রেমি বাংলাদেশের মানুষ বসে পর্যালোচনায় ব্যস্ত ফুটবল, ক্রিকেট, হকিসহ অন্যান্য খেলায় কেমন কাটিয়েছে বাংলাদেশ? ক্রিকেট অনুরাগিরা জের টানছেন বছরটা টাইগারদের পারফরমেন্স আর ফল কেমন ছিল- তা নিয়ে।

বছর শুরু হয়েছিল চমকে। ২০২২ সালে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের পারফরমেন্স নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা করতে গেলে শুরুতেই চলে আসছে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম টেস্ট জয়ের স্মৃতি। জানুয়ারি মাসে মাউন্ট মঙ্গানুইয়ে নিউজল্যান্ডের বিপক্ষে ৮ উইকেটের দারুন জয়ে শুরু হয়েছিল ২০২২।

Cricket

চার ব্যাটার মাহমুদুল হাসান জয়, মুমিনুল হক, নাজমুল হোসেন শান্ত আর লিটন দাস ব্যাট হাতে জ্বলে উঠে সাফল্যর ভিত গড়ে দেন। আর সে সাফল্য ত্বরান্বিত হয় ৪ বোলার এবাদত, তাসকিন, শরিফুল ও মিরাজের বোলিংয়ে।

কেউ সেঞ্চুরি করতে না পারলেও টেস্ট জীবন শুরু করা মাহমুদুল হাসান জয় (৭৮) অধিনায়ক মুমিনুল হক (৮৮), নাজমুল হোসেন শান্ত (৬৪) আর লিটন দাস (৮৬) চারজনের ফিফটিতে ৪৫৮ রানের মজবুত ভিত পায় বাংলাদেশ।

পরবর্তীতে পেসার এবাদত হোসেন (৬/৪৬), তাসকিন (৩/৩৬), শরিফুল (৩/৬৯) আর অফস্পিনার মিরাজরা (৩/৮৬) বল হাতে জ্বলে উঠলে ৮ উইকেটের দারুন জয় পায় মুমিনুল হকের দল।

অমন উদ্ভাসিত জয়ে শুরু ২০২২। মনে হচ্ছিলো সাফল্যের সোনালী আভায় রাঙানো থাকবে গোটা বছর; কিন্তু তা আর হয়নি। উল্টো সময় গড়ানোর সাথে সাথে সাফল্যর ঔজ্জ্বল্য কমতে থাকে।

১ থেকে ৫ জানুয়ারি বছরের প্রথম টেস্টে কিউইদের হারানোর পর সপ্তাহ না ঘুরতেই পারফরমেন্স নুয়ে পড়ে। দ্বিতীয় টেস্টেই ইনিংসে হেরে বসে টাইগাররা (৯-১১ জানুয়ারি ক্রাইস্টচার্চে ইনিংস ও ১১৭ রানের ব্যবধানে)।

শুধু বছরের দ্বিতীয় টেস্টেই নয়, পরে সারা বছরে এমন করুণ পরিণতিই ছিল সঙ্গী। আর একবারের জন্যও জয়ের দেখা মেলেনি। মে মাসে চট্টগ্রামে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে একটি টেস্ট ড্র করতে পারলেও একই মাসে (২৩-২৭ মে) পরের টেস্টে শেরে বাংলায় লঙ্কানদের কাছেই ১০ উইকেটে পরাজিত হয় টাইগাররা।

Cricket

এছাড়া এ বছর ৮ টেস্টের মধ্যে দক্ষিণ আফ্রিকা (মার্চ এপ্রিল ২২০ ও ৩৩২ রানে), ওয়েস্ট ইন্ডিজ (জুন ৭ উইকেট ও ১০ উইকেট) ও ভারতের কাছে (ডিসেম্বর ১৮৮ রান ও ৩ উইকেটে) ২ ম্যাচের টেস্ট সিরিজে একটি টেস্ট ড্র করাও সম্ভব হয়নি। সবগুলোতেই হেরেছে টিম বাংলাদেশ।

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ সামনে রেখে এ বছর টি-টোয়েন্টি চর্চা হয়েছে বেশি। সেখানেও সাফল্য বেশ কম। ২১টি ম্যাচে জয় মাত্র ৬টিতে। এবছর টাইগাররা যে ৬টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ জিতেছে তার সবকটাই দুর্বল বা কমজোরি দলের (জিম্বাবুয়ে ও আরব আমিরাতের সাথে দুটি করে আর আফগানিস্তান এবং নেদারল্যান্ডসের সাথে একটি করে) বিপক্ষে।

কিন্তু ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা, পাকিস্তান, ওয়েস্ট ইন্ডিজ ও শ্রীলঙ্কার মত প্রতিষ্ঠিত ও বড় দলের বিপক্ষে একটি ম্যাচও জেতা সম্ভব হয়নি। এর মধ্যে অক্টোবর-নভেম্বরে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডস (৯ রান) আর জিম্বাবুয়ের (৩ রান) বিপক্ষে জয় ধরা দিলেও দক্ষিণ অফ্রিকা (১০৪ রান), ভারত (৫ রান) ও পাকিস্তানের (৫ উইকেট) কাছে হারতে হয়েছে।

Cricket

টেস্ট আর টি-টোয়েন্টির তুলনায় বরাবরের মত ওয়ানডেতে ভাল খেলা ও সাফল্য দুই’ই বেশি বাংলাদেশের। এ বছর ১৫ ওয়ানডের ১০টিতে জয়ের রেকর্ড আছে টাইগরদের। সবচেয়ে বেশি তিনটি জয় ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে। দ্বিতীয় সর্বাধিক দুটি করে জয় আছে দক্ষিণ আফ্রিকা এবং আফগানিস্তানের বিপক্ষে।

এর মধ্যে জুলাই মাসে ওয়েস্ট ইন্ডিজের মাটিতে তিন ম্যাচের সিরিজে (৬ উইকেট, ৯ উইকেট ও ৪ উইকেটে) ক্যারিবীয়দের ‘বাংলাওয়াশ’ করে ছেড়েছে টাইগাররা। তার আগে মার্চে দক্ষিণ অফ্রিকার মাটিতে প্রোটিয়াদের ২-১ ’এ সিরিজ হারিয়ে বড় চমক দেখায় টিম বাংলাদেশ।

আর বছরের শেষ মাস ডিসেম্বরে তিন ম্যাচের সিরিজে ভারতের বিপকেষ ২-১‘এ সিরিজ বিজয়ের কৃতিত্ব দেখায় লিটন দাসের দল। এ বছর অপর জয়টি আসে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। তাদের মাটিতে খেলতে গিয়ে (১০ আগস্ট হারারে স্পোর্টস ক্লাব মাঠে ১০৫ রানে) জয় পায় বাংলাদেশ।

Cricket

মোটকথা, এবছর টেস্ট আর ওয়ানডেতে সেরা ও স্মরণয় সাফল্য চারটি। যার তিনটি ওয়ানডেতে। একটি টেস্টে।

এক. মাউন্ট মঙ্গানুইয়ে নিউজিল্যান্ডের মাটিতে ব্ল্যাক ক্যাপ্সদের টেস্টে ৮ উইকেটে হারানো।

দুই. মার্চে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ২-১‘এ ওয়ানডে সিরিজ বিজয়।

তিন . জুলাইতে ওয়েষ্ট ইন্ডিজের মাটিতে ক্যারবীয়দের বিপক্ষে তিন ম্যাচের সিরিজে তুলোধুনো করা।

চার . ডিসেম্বরে দেশের মাটিতে ভারতের বিপক্ষে তিন ম্যাচের সিরিজে ২-১ ব্যবধানে জয়।

তবে এসব সাফল্যর বিপরিত চিত্রও আছে। তাহলো অনেকদিন পর এবছর জিম্বাবুয়ের কাছে ওয়ানডে আর টি টোয়েন্টি সিরিজ পরাজয়। এ বছর জুলাই ও আগস্টে জিম্বাবুয়ের মাটিতে টি-টোয়েন্টি এবং ওয়ানডেতে সমান ২-১ ব্যবধানে সিরিজ পরাজিত হয় টাইগাররা।

আগের বছর গুলোর মত এবারও টিম বাংলাদেশের সাফল্য মূলতঃ ওয়ানডেতেই বেশি। টেস্টে তবু একটি স্মরণীয় জয় আছে। বছরের শেষ ভাগে ঢাকার শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে ভারতের সাথে আর একটি টেস্টে জয়ের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। জয়ের খুব কাছে গিয়েও তা ছুঁতে পারেনি সাকিবের দল; কিন্তু টি-টোয়েন্টিতে কোনো বড় ও স্মরণীয় জয় নেই।

মানে টি-টোয়েন্টিতে এখনো টাইগাররা সেই তিমিরেই আছে। সাফল্য ও ব্যর্থতা ছাড়াও এ বছর বাংলাদেশের ক্রিকেটে আরও কটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছে।

দেশের এক নম্বর ওপেনার তামিম ইকবাল টি-টোয়েন্টি ফরম্যাট থেকে অবসর নিয়েছেন। একই পথে হেঁটেছেন মুশফিকুর রহিমও। এশিয়া কাপে বাজে পারফরম্যান্স করে আসার পর টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ দলে জায়গা পাবেন না, এ সম্ভাবনা দেখা দেয়ায় আহেই এই ফরম্যাট থেকে সরে দাঁড়ান মুশফিক।

Cricket

অন্যদিকে প্রায় তিন বছর অধিনায়ক থাকার পর টি-টোয়েন্টি ফরম্যাটে জাতীয় দলের ক্যাপ্টেন্সি হারিয়েছেন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। তার পরিবর্তে টি-টোয়েন্টি ক্যাপ্টেন হয়েছেন সাকিব আল হাসান। শুধু তাই নয়, বিশ্বকাপের দলে পর্যন্ত নেয়া হয়নি মাহমুদউল্লাহ রিয়াদকে।

এ বছর বিভিন্ন সময় নুরুল হাসান সোহান, লিটন দাস আর মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত জাতীয় দলের ভারপ্রাপ্ত অধিনায়কত্ব করেছেন। এর মধ্যে সোহান জিম্বাবুয়ের মাটিতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে আর লিটন দাস ভারতের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে তামিম ইকবালের জায়গায় জাতীয় দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। বছরের মাঝামাঝি মুমিনুল হক টেস্ট ক্যাপ্টেন্সি ছেড়েছেন। তার পরিবর্তে টেস্ট ক্যাপ্টেন হয়েছেন সাকিব আল হাসান।

এছাড়া ২০২২ সালে বাংলাদেশ জাতীয় দলের কোচিং স্টাফেও বড় ধরনের পরিবর্তনের ছোঁয়া লেগেছে। মহিলা দলে কোচ হয়ে এসেছেন সাবেক শ্রীলঙ্কান টেস্ট ক্রিকেটার হাসান তিলকারত্নে। একদম বছরের শুরুতে পদত্যাগ করেন পেস বোলিং কোচ অটিস গিবসন। এরপরই সরে দাঁড়ান ব্যাটিং কোচ অ্যাশওয়েল প্রিন্স। বছরের শুরুতে ওটিস গিবসনের জায়গায় ফাস্টবোলিং কোচ হিসেবে নিয়োগ পান অ্যালান ডোনাল্ড।

Cricket

আর দক্ষিণ আফ্রিকার ফিল্ডিং কোচ রায়ান কুককে বিদায় করে দেয়া হয়। তিনি পরে নেদারল্যান্ডসের হেড কোচ হন। তার জায়গায় দায়িত্ব নেন শেন ম্যাকডারমট।

আর বছরের শেষ ভাগে এসে পদত্যাগ করলেন হেড কোচ রাসেল ডোমিঙ্গো। তার পরিবর্তে নতুন কোচ নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে। নতুন বছরে দেখা যাবে টাইগারদের নতুন কোচকে।

এআরবি/আইএইচএস/

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।