আমাদের মধ্যে দেশের ক্রিকেটকে উন্নত করার সংকল্প ছিল: আকরাম

আরিফুর রহমান বাবু
আরিফুর রহমান বাবু আরিফুর রহমান বাবু , বিশেষ সংবাদদাতা
প্রকাশিত: ০৮:২১ পিএম, ২৪ মে ২০২৪

তার এক ইনিংস বেদিতেই আসলে দাঁড়ানো বাংলাদেশের ক্রিকেট। ১৯৯৭ সালের আইসিসি ট্রফিতে হল্যান্ডের বিপক্ষে খাদের কিনারায় পড়ে যাওয়া বাংলাদেশ তার হাত ধরেই অসম্ভবকে সম্ভব করে অবিস্মরণীয় জয় পেয়ে পৌঁছে গিয়েছিল সেমিফাইনালে।

১৯৯৭ সালের ৪ এপ্রিল মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরের রাবার রিসার্চ ইনস্টিটিউট মাঠে প্রথমে বাংলাদেশের টার্গেট ছিল ১৭২ রানের। ম্যাচে বৃষ্টি হানা দিলে ডিএল মেথডে টাইগারদের লক্ষ্য বেঁধে দেওয়া হয় ৩৩ ওভারে ১৪১ রান। সেই ম্যাচে আকরাম খানের খেলা ৯২ বলে ৬৮ রানের হার না মানা ইনিংসের ওপর ভর করে ৩ উইকেট আর ৮ বল হাতে রেখে জয়ের বন্দরে পৌঁছে যায় বাংলাদেশ।

এর ৩ বছর আগে কেনিয়ার নাইরোবিতে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে নিশ্চিত পরাজয়ের মুখে আকরামের সংগ্রামী ব্যাটিংয়ে (অপরাজিত ৬৪) কঠিন চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করেছিল বাংলাদেশ।

হোক তা আইসিসি ট্রফি; তারপরও ১৯৯৪ সালে যুক্তরাষ্ট্র আর ১৯৯৭ সালে হল্যান্ডের বিপক্ষে প্রায় হেরে ম্যাচ জিতিয়ে অমর হয়ে আছেন আকরাম খান। কঠিন সত্য হলো- ২৭ বছর পেরিয়ে গেলেও এখন একটা আকরাম খানের অভাব সুস্পষ্ট।

কেন এত বছরে একজন আকরাম তৈরি করতে পারেনি বাংলাদেশ? কী কারণে বিপর্যয়, সংকট আর চাপে কেউ সাহসী নাবিকের মত উত্তাল সাগরে ঢেউয়ের সঙ্গে জীবন বাজি রেখে লড়াই করে সাফল্যের পথে বাঁধা অতিক্রম করতে পারেন না? এ প্রশ্ন এখন অনেকের মনে।

আকরাম খান নিজেই দিলেন সেই প্রশ্নের উত্তর। আজ শুক্রবার জাগো নিউজের সঙ্গে একান্ত আলাপকালে আকরাম জানিয়ে দিলেন, কেন দুই যুগ পেরিয়ে গেলেও মিলছে না আরেক আকরামে দেখা?

অনেক কথার ভিড়ে আকরামের মূল কথা, তাদের মধ্যে কমিটমেন্ট ছিল। দেশের ক্রিকেটকে উন্নত করার ইচ্ছে ও সংকল্প ছিল। আর সবচেয়ে বড় কথা, তারা বোর্ড ও ক্লাবের দিকে তাকিয়ে না থেকে নিজেরা ব্যক্তিগতভাবে চেষ্টা করতেন কীভাবে নিজেকে উন্নত করা যায়। আর পরিবেশ-পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের প্রাণপণ চেষ্টাও ছিল তাদের সময়ের ক্রিকেটারদের।

আকরামের ভাষায়, ‘দেখেন সব বোর্ড বা ক্লাব করে দেবে না। আমাদের নিজেদের চেষ্টা ছিল। মেধা, কৌশল, খেলা উন্নত করতে আমরা সামর্থ্যের সবটুকু উজাড় করে চেষ্টা করেছি। জাতীয় দলের নেট এখনকার মতো এত উন্নত ও আধুনিক ছিল না।

‘আমরা মাত্র ৮ মিনিট ব্যাটিং করেছি। ১০ মিনিটও নেটে ব্যাটিং করার সুযোগ হয়নি আমাদের। এখনকার মতো ৫/৬ জন একসঙ্গে নেটে ব্যাটিং করা, বোলিং মেশিন, নেট বোলার, থ্রোয়ার কিছুই ছিল না। গদবাঁধা নেট প্র্যাকটিস চলতো। আলাদাভাবে সেন্টার উইকেটে কিংবা ইনডোরে নেটে ব্যাটিং ঝালিয়ে নেওয়ার কোনোই সুযোগ-সুবিধা ছিল না। কিন্তু আমরা ব্যক্তিগত পর্যায়ে নিজেদের ব্যাটিং মান উন্নত করা, সামর্থ্য বাড়ানোর প্রাণপণ চেষ্টা করেছি।

আকরামের স্থির বিশ্বাস, উন্নতির জন্য ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

আকরাম বলেন, ‘আমি মনে করি, ব্যক্তিগত প্রচেষ্টা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমরা ক্রিকেট নিয়ে চিন্তা ভাবনা করতাম। পারিপাশ্বিক অবস্থা নিয়ে ভাবতাম। আইসিসিতে ভিন্নভিন্ন ভেন্যুতে খেলা হতো। আমরা সে সব ভেন্যু, মাঠ ও উইকেট সম্পর্কে কিছুই জানতাম না। উইকেটের চরিত্র ও গতি-প্রকৃতি কেমন, আউটফিল্ডের সাইজ ও প্রকৃতি কেমন? ওভাল শেপের নাকি লম্বাটে; ওই সব উইকেটের গড়পড়তা স্কোর লাইন কী, ওই সব কিছুই জানতাম না। সব মিলে মাঠে নেমে ভালো খেলা এখনকার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন ছিল।

‘এখন আমরা সব আগে জেনে যাই। কম্পিউটার অ্যনালিস্ট এবং ভিডিও অ্যানালিস্ট আমাদের মাঠ ও উইকেট সম্পর্কে সব তথ্য-উপাত্ত আগেই জানিয়ে দেন। আমরা তখন কিছুই জানতাম না। কীভাবে পরিবেশ-পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে হবে, আমরা কিছুই জানতাম না। নিজের চেষ্টা ছিল, পরিবেশ-পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে ম্যাচ পরিস্থিতি ও বোলারের মান বুঝে খেলার। ওই গুণাগুণ এখন খুব কম। অবস্থা বুঝে কঠিন সময়ে শক্ত হাতে হাল ধরার ক্ষমতা অনেক কমেছে। মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা কম। অনেক খেলোয়াড় আসছে। কিন্তু পরিবেশ-পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা কম বলেই আমাদের অর্জন কম। এখনো অর্জন বা বড় সাফল্য বলতে সেই ১৯৯৭ সালের আইসিসি ট্রফি বিজয়। ক্রিকেটে এত জনপ্রিয়তা।

সাবেক বাংলাদেশ জাতীয় দলের এই অধিনায়ক আরও বলেন, ‘ব্যক্তিগতভাবে ভালো খেলোয়াড় আসছে। কিন্তু তাদের মধ্যেও সময় মতো জ্বলে ওঠার ক্ষমতা কম। কঠিন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং সংকটে হাল ধরার মানসিকতায় ঘাটতি আছে। আর সবচেয়ে বড় কথা, আমরা এখনো দল হিসেবে গড়ে উঠতে পারিনি। বড় মঞ্চে সাফল্য পেতে যে দল হয়ে খেলা খুব গুরুত্বপূর্ণ।’- যোগ করেন আকরাম।

এআরবি/এমএইচ/এএসএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।