নন্দিত-নিন্দিত এক ফুটবলার লুইস সুয়ারেজ

ইমাম হোসাইন সোহেল
ইমাম হোসাইন সোহেল ইমাম হোসাইন সোহেল
প্রকাশিত: ০২:০৮ পিএম, ২২ মে ২০১৮

কিছু কিছু ফুটবলারের দুর্ভাগ্য, তারা অনেক বড় মাপের অথচ একক নৈপুণ্যে দলকে বিশ্বকাপ জেতানোর ক্ষমতা নেই। ফুটবল তো একটি দলীয় খেলা। পেলে, গ্যারিঞ্চা কিংবা ম্যারাডোনাদের বলা হয় একক নৈপুণ্যে দলকে বিশ্বকাপ জিতিয়েছিলেন। তবুও তাদের পেছনে ছিল পুরো দলের সাপোর্ট। একক নৈপুণ্যে হয়তো সবাইকে ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন তারা; কিন্তু দলীয় সহযোগিতা ছাড়া বিশ্বকাপ জয় সম্ভবত হতো না তাদের পক্ষে।

যেমনটা পারবেন না ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো, রবার্ট লেওয়াডস্কি কিংবা লুইস সুয়ারেজদের মতো ফুটবলাররা। বিশ্বসেরা হওয়ার জন্য যেসব উপাদানগুলি থাকতে হয়, সেগুলো নেই তাদের দলে। এ কারণে লুইস সুয়ারেজেরও হয়তো আক্ষেপ থেকে যাবে, বিশ্বের অন্যতম সেরা স্ট্রাইকার হওয়া সত্ত্বেও হয়তো বিশ্বকাপ ট্রফিটা কখনোই তুলে ধরা হবে না তার।

বর্তমান সময়ের সেরা স্ট্রাইকার তো বটেই, উরুগুয়ের সর্বকালের সেরা স্ট্রাইকারদের মধ্যে একজন লুইস সুয়ারেজ। বার্সেলোনায় লিওনেল মেসির মত বিশ্বসেরা ফুটবলারের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে খেলে যাচ্ছেন। সমানতালে গোল করে যাচ্ছেন।

জাতীয় দলের হয়েও একইভাবে প্রতিপক্ষের রক্ষণে বিধ্বংসী এক স্ট্রাইকার। বলের জন্য ওঁতপেতে থাকেন। পেলেই ছোঁ-মেরে নিয়ে সেটাকে প্রতিপক্ষের জালে জড়িয়ে দিতে জুড়ি মেলা ভার তার। রাশিয়া থেকে উরুগুয়ে বিশ্বকাপ জিতবে কি না, সে সম্পর্কে হয়তো বাজির দর থাকবে অনেক কম; কিন্তু উরুগুয়ে নিয়ে যারাই বাজি ধরতে চাইবেন, তাদের মূল ভরসার কেন্দ্রবিন্দুই হবেন লুইস সুয়ারেজ।

Suarez

এমন এক স্ট্রাইকার ভক্তদের কাছে যতটা নন্দিত, তার চেয়েও বেশি নিন্দিত তার বাজে কর্মকাণ্ডের জন্য। বিশেষ করে ফুটবল মাঠে প্রতিপক্ষ ফুটবলারকে কামড়ে দেয়ার মত উগ্রতা রয়েছে তার মধ্যে। ব্রাজিল বিশ্বকাপেই তো ইতালিয়ান ফুটবলার জিওর্জিও কিয়েল্লিনির কাঁধে কামড়ে দিয়েছিলেন তিনি। যেটা আবার ঠাঁই পেয়েছে বিশ্বকাপের সবচেয়ে বাজে ঘটনাগুলোর মধ্যে। চরম উগ্রতা সত্ত্বেও অসাধারণ গোল করার ক্ষমতা, ক্ষিপ্রতা এবং খেলার প্রতি নিবেদন- সব কিছু মিলিয়ে লুইস সুয়ারেজের ঠাঁই মিলেছে বার্সেলোনা শিবিরে।

বিশ্বকাপটাই শুধু জেতা হয়নি সুয়ারেজের। এছাড়া তার শো-কেসে শোভা পাচ্ছে ১৬টি ট্রফি। এর মধ্যে রয়েছে পাঁচটি লিগ শিরোপা, উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ এবং কোপা আমেরিকাও। সুয়ারেজই পেরেছেন স্প্যানিশ লা লিগায় মেসি-রোনালদোর ৬ বছরের আধিপত্যের অবসান ঘটাতে। বিশ্বসেরা এই দুই ফুটবলারকে পেছনে ফেলে ২০১৬ সালে তিনি জিতে নিয়েছিলেন পিচিচি ট্রফি।

সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার শুধু স্প্যানিশ লিগেই নয়, তার আগেও উঠেছে সুয়ারেজের হাতে। ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে প্রিমিয়ার লিগ গোল্ডেন বুট এবং ডাচ ফুটবলে আর্ডিভাইজ গোল্ডেন বুটের পুরস্কার উঠে তার হাতে। সুয়ারেজের কাছে অবশ্য রয়েছে বারও বড় দুটো ব্যাক্তিগত সাফল্যের স্বীকৃতি, ইউরোপিয়ান গোল্ডেন সুজ। ২০১৩-১৪, ২০১৫-১৬ মৌসুমে দু’বার জিতেছেন ইউরোপের সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার।

সোনার চামুচ মুখে দিয়ে জন্ম নেয়ার মত ফুটবল হাতে করে জন্ম নিয়েছিলেন যেন সুয়ারেজ। শিশুকাল থেকেই ফুটবলার। ১৪ বছর বয়সে স্থানীয় ক্লাব ন্যাসিওনেলের হয়ে শুরু দলটির যুব দলের হয়ে খেলা। ওই সময় থেকেই উগ্রতার বহিঃপ্রকাশ দেখা যায় সুয়ারেজের মধ্যে।

Suarez

মাত্র ১৬ বছর বয়সেই লাল কার্ড দেখেন তিনি। কিন্তু বিষয়টাকে খুব সহজভাবে নিতে পারেননি। লাল কার্ড দেখানোর কারণে রেফারিকে হেড বাট মেরে বসেন সুয়ারেজ। এ অপরাধে যখন তার কোচ হুমকি দিয়ে বসেন, ভবিষ্যতে তিনি আর কখনো ফুটবলই খেলতে পারবেন না, তখন রাগে-ক্ষোভে পানাসলায় যেতে শুরু করেন নিন্দিত এই ফুটবলার এবং এক রাতে সুয়ারেজ ধরা পড়েন মাতাল অবস্থায় এক পার্টিতে।

সুয়ারেজের ফুটবল কিন্তু থেমে থাকেনি। উগ্রতার সঙ্গে তাল মিলিয়েই এগিয়ে গেছে তার ফুটবল ক্যারিয়ার। যে কারণে ২০০৭ সালের ফেব্রুয়ারিতেই উরুগুয়ে জাতীয় দলের হয়ে ২০ বছর বয়সেই অভিষেক ঘটে তার। কিন্তু রক্তে যার উগ্রতা মিশে থাকে, তার মধ্যে কি জাতীয় দল আর ক্লাব ফুটবল ভেদাভেদ থাকে? কলম্বিয়ার বিপক্ষে অভিষেক ম্যাচেই ৮৫ মিনিটের সময় লাল কার্ড দেখে মাঠ থেকে বহিস্কার হন তিনি। রেফারির সঙ্গে বাদানুবাদে জড়িয়ে পড়েছিলেন তিনি।

২০১০ বিশ্বকাপ বাছাই পর্বের ১৯টি ম্যাচ খেলেছিলেন সুয়ারেজ। প্লে-অফ সহ এই ১৯ ম্যাচ সর্বোচ্চ ৫ গোল এসেছে তার পা থেকে। ২০১০ বিশ্বকাপে উরুগুয়ের ২৩ সদস্যের স্কোয়াডে ঠাঁই মেলে সুয়ারেজের। বিশ্বকাপে উরুগুয়ে শুরু করে ফ্রান্সের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র দিয়ে। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষেদ্বিতীয় ম্যাচে ৩-০ গোরে জয় পায় লা সেলেস্তেরা। একটি গোল নিজে পেনাল্টি থেকে করেছেন এবং আলভারো পেরেইরাকে একটি গোলের অ্যাসিস্টও করেন তিনি। মেক্সিকোর বিপক্ষে গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে কাভানির ক্রস থেকে ভেসে আসা বলে হেড করে গোল করেন এবং ম্যাচ সেরা নির্বাচিত হন।

দ্বিতীয় রাউন্ডে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে জোড়া গোল করেন সুয়ারেজ। তোর জোড়া গোলে ১৯৭০ সালের পর প্রথম বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নেয় উরুগুয়ে। কোয়ার্টারে উরুগুয়ে মুখোমুখি হয় ঘানার। এই ম্যাচে লাল কার্ড দেখলেও, তার ওই লাল কার্ডটি ছিল উরুগুয়ের জন্য গৌরবেরই।

Suarez

আফ্রিকান দেশ ঘানার বিপক্ষে ১-১ গোলে ড্র থাকার কারণে খেলা গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। আক্রমণ আর প্রতি আক্রমণের এক মুহূর্তে স্টিফেন আফিয়ার একটি ফ্রি কিক গোল লাইনে দাঁড়িয়ে ফিরিয়ে দেন সুয়ারেজ। ফিরতি বলে ডোমিনিখ আদিয়াহ শট নিলে একেবারে গোললাইনে দাঁড়িয়ে হাত দিয়ে ফেরান তিনি। গুরুতর এই অপরাধে সঙ্গে সঙ্গে লাল কার্ড দেখিয়ে দেন রেফারি।

সুয়ারেজ লাল কার্ড দেখে হাসি মুখেই ফিরে যান। আসামোয়াহ গায়ান এসে পেনাল্টি শ্যুট নিলে সেটা ক্রসবারে লেগে ফিরে আসে। এই দৃশ্য দেখার পর ড্রেসিংরুমের টানেলের মুখে দাঁড়িয়ে উল্লাসে ফেটে পড়েন সুয়ারেজ। এরপর পেনাল্টি শ্যুটআউটে বিদায় নেয় ঘানা। উরুগুয়ে উঠে যায় সেমিফাইনালে। সুয়ারেজ বলেছিলেন, ‘লাল কার্ড দেখে আমি উরুগুয়েকেই বাঁচিয়ে দিলাম। ওই সময় হাত দিয়ে বলটি ফেরানো ছাড়া আমার আর কোনো উপায় ছিল না।’ শুধু তাই নয়, দলকে বাঁচানোর জন্য সুযোগ পেলে এমন কাজ আরও করতে চান বলেও জানিয়ে রাখেন উরুগুয়ের এই স্ট্রাইকার।

সেমিফাইনালে সুয়ারেজ খেলতে পারেননি। উরুগুয়েও পরিণত হয় দুর্বল দলে। তবুও নেদারল্যান্ডসকে ২ গোল দিয়েছিল উরুগুইয়নরা। যদিও হজম করতে হয়েছিল ৩ গোল। ৩-২ গোলে হেরে বিদায় নেয় তারা। তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে জার্মানির বিপক্ষে ফিরলেও তিনি ছিলেন কড়া মার্কিংয়ে। তবুও কাভানিকে একটি গোলের সহযোগিতা করেছিলেন।

২০১১ সালে সুয়ারেজের নৈপুণ্যেই কোপা আমেরিকা জয় করে উরুগুয়ে। চার গোল করে তিনি হলেন টুর্নামেন্ট সেরা ফুটবলার। এরপর ২০১২ অলিম্পিক গেমস, ২০১৪ বিশ্বকাপেও খেলেন তিনি। ২০১৪ বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের ম্যাচেই ইতালিয়ান ফুটবলার কিয়েল্লিনির ঘাড়ে কামড় দিয়ে বসেন সুয়ারেজ। এই কামড়কাণ্ডের কারণে খেলতে পারেননি পরের দুই কোপা আমেরিকা। ফিফা তাকে ৯ ম্যাচের জন্য নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।

Suarez

ক্লাব ফুটবলও তার নানা ঘটনায় পরিপূর্ণ। ১৮ বছর বয়সে জুনিয়র ডি বারানকুইলার বিপক্ষে কোপা লিবার্তোদেরেসে পেশাদার ক্যারিয়ার শুরু সুারেজের। ২০০৫-০৬ মৌসুমে ২৭ ম্যাচে ১০ গোল করে ন্যাসিওনেলকে উরুগুইয়ান প্রিমিয়ার লিগ উপহার দেন তিনি। ওই সময়ই ডাচদের নজরে পড়েন তিনি এবং ২০০৬ সালেই ৮ লাখ ইউরোর বিনিময়ে ডাচ ক্লাব গ্রনোইনগেনে নাম লেখান তিনি।

যাদের হাত ধরে ইউরোপে আসা, তাদের হয়ে মাত্র ১ মৌসুম খেললেন। ২৯ ম্যাচে করলেন ১০ গোল। এরপরই চলে আসেন আয়াক্স ৭.৫ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে। ৫ বছরের চুক্তি হলেও ২০১১ সাল পর্যন্ত আয়াক্সে খেলেন তিনি। ১১০ ম্যাচে করেন ৮১ গোল। এই চার বছরে নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গেছে তার ক্যারিয়ার। দু’বার টানা হয়েছেন আয়াক্স ফুটবলার অব দ্য ইয়ার। একবার হয়েছেন ডাচ ফুটবলার অব দ্য ইয়ার। ২০১০-১১ মৌসুমে প্রথমবারের মত প্রতিপক্ষ ফুটবলারের কাঁধে কামড় দেয়ার ঘটনা ঘটান তিনি। যে কারণে তাকে নিষিদ্ধ থাকতে হয়েছে সাত ম্যাচ। এরই মধ্যে লিভারপুলে নাম লেখান তিনি, ২৬.৫ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে।

লিভারপুলেও তার ক্যারিয়ারটা মিশ্র অভিজ্ঞতায় ভরা। এখানেও দিলেন উগ্রতার পরিচয়। ম্যানইউ ফুটবলার প্যাট্রিস এভরার সঙ্গে বর্ণবাদী আচরণ করে বসেন তিনি। যে কারণে আট ম্যাচ নিষিদ্ধ থাকতে হলো সুয়ারেজকে। সঙ্গে জরিমানা ৪০ হাজার পাউন্ড। ২০১৩ সালেই দ্বিতীয় কামড়কাণ্ডের ঘটনা ঘটান সুয়ারেজ। চেলসি ফুটবরার ব্রানিস্লাভ ইভানোভিচের কাঁধে কামড় বসিয়ে দেন তিনি। যে ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরনও। সুয়ারেজকে ১০ ম্যাচের নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয় ওই ঘটনায়।

সব বিতর্ক ছাপিয়ে ২০১৩-১৪ মৌসুমে ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের সেরা ফুটবলারের পুরস্কার জেতেন সুয়ারেজ। জিতলেন প্রিমিয়ার লিগের গোল্ডেন বুটও। ২০১৪ সালে, ফিফা বিশ্বকাপের পরই বার্সেলোনায় নাম লেখান সুয়ারেজ। এরই মধ্যে অবশ্য, বিশ্বকাপে আরও একবার কামড়কাণ্ডের জন্ম দেন তিনি। তবুও বার্সেলোনা তাকে ৮২.৩ মিলিয়ন ইউরোয় কিনে নেয় লিভারপুল থেকে। যদিও বার্সেলোনা তাকে শর্ত দিয়েছিল, কামড়কাণ্ড আর না ঘটানোর বিষয়ে।

বার্সায় এসে এখনও পর্যন্ত ১৯৮ ম্যাচে করলেন ১৫২ গোল। জিতেছেন তিনটি লা লিগা, চারটি কোপা ডেল রে, সুপার কোপা ১টি, চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ১টি, সুপার কাপ ১টি এবং ফিফা ক্লাব বিশ্বকাপ ১টি। উরুগুয়ের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতাও তিনি। ৯৭ ম্যাচে করেছেন ৫০ গোল। এবার রাশিয়ায় কী করবেন সুয়ারেজ?

আইএইচএস/জেআইএম

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]