বিদায় বেলায়ও চমক দেখানোর অপেক্ষায় ইনিয়েস্তা!

ইমাম হোসাইন সোহেল
ইমাম হোসাইন সোহেল ইমাম হোসাইন সোহেল
প্রকাশিত: ০৯:৩৮ পিএম, ১৯ মে ২০১৮

মাত্র কিছুদিন আগেই ব্যালন ডি’অর কর্তৃপক্ষ আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার ক্ষমা চেয়েছে, তাকে ২০১০ ব্যালন ডি’অরটা না দেয়ার কারণে। একই সঙ্গে এটা প্রকারান্তরে স্বীকার করে নিয়েছে যে, ব্যালন ডি’অর রাজনৈতিক এবং করপোরেট বাণিজ্যের ওপর ভিত্তি করেই দেয়া হয়। আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার ক্যারিয়ার সায়াহ্নে এসে ফ্রেঞ্চ ম্যাগাজিন কর্তৃপক্ষের এই স্বীকারোক্তি অনেকটাই তার আক্ষেপ কমিয়ে দেবে সন্দেহ নেই।

২০০৮ থেকে স্পেনকে একটি অপ্রতিরোধ্য দলে পরিণত করেছিলো এক ঝাঁক দুর্দান্ত প্রতিভাবান ফুটবলার। যাদের সোনালি প্রজন্ম বলেও উল্লেখ করা হয়। লা ফুরিয়া রোজাদের মাঝে একটি উজ্জল গোলাপ হয়েই ওই দলটিতে ফুটে থাকবে আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা লুজান। ক্যারিয়ারে এমন কোনো শিরোপা বাকি নেই যা তিনি হাতে তুলে ধরেননি। ১টি বিশ্বকাপ, ২টি ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের সঙ্গে ক্লাব ফুটবলে লিগ শিরোপা, উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, ক্লাব বিশ্বকাপ, কোপা ডেল রে, উয়েফা সুপার কাপ- সবই উঠেছে ইনিয়েস্তার হাতে।

jagonews24

অথচ, এমন একজন সোলি ফুটবলারের হাতে ব্যক্তিগত সেরা ট্রফিটাই তুলে দিতে ব্যর্থ হয়েছে ব্যালন ডি’অর কিংবা ফিফা কর্তৃপক্ষ। নিঃসন্দেহে ওটা ছিল সংশ্লিষ্ট ওই দুই প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদেরই ব্যর্থতা। বিশ্বকাপে যিনি একটি দেশকে টেনে তুলেছেন ফাইনালে এবং ফাইনালেও তার গোলে একটি দেশ জিতেছে বিশ্বকাপ শিরোপা, তিনিই কি না পেলেন না ব্যক্তিগত সেরার পুরস্কার।

শুধু তাই নয়, ২০১২ ইউরো তো একাই স্পেনকে জিতিয়েছেন ইনিয়েস্তা। সবাই ভেবে নিয়েছিল, সেবারই ব্যক্তিগত সেরার পুরস্কারটা হয়তো এবার ইনিয়েস্তার হাতে তুলে দেবে ফিফা এবং ফ্রেঞ্চ ফুটবল ম্যাগাজিনের কর্মকর্তারা; কিন্তু সবাই আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করলো, করপোরেট বাণিজ্যের কাছে এই দুটি বড় সংস্থা কিভাবে বিকিয়ে গেলো।

ক্যারিয়ারের একেবারে শেষ পর্যায়ে চলে এসেছেন ইনিয়েস্তা। নিজের দীর্ঘদিনের সহযোদ্ধা অনেককেই হারিয়েছেন ইতিমধ্যে। জাভি, ক্যাসিয়াস, ডেভিড ভিয়া থেকে শুরু করে স্পেন সোনালি প্রজন্মের বেশ কয়েকজন ফুটবলার ইতিমধ্যেই অবসর নিয়ে ফেলেছেন। ইনিয়েস্তা যেন টিকে রয়েছেন সেই প্রজন্মের শেষ প্রদীপ হিসেবে। নিজের ক্লাব বার্সেলোনা থেকে ইতোমধ্যেই বিদায় নিয়ে ফেলেছেন। খেলবেন তিনি চায়নিজ লিগে।

অথচ এখনও স্পেন দলের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে নিজেকে টিকিয়ে রেখেছেন ইনিয়েস্তা। রাশিয়া বিশ্বকাপেও অভিজ্ঞ এই মিডফিল্ডারের ওপর চোখ বন্ধ করে আস্থা রাখতে পারেন কোচ হুলেন লোপেতেগুই। মাঝ মাঠে পায়ের কারুকাজে মুগ্ধ করেন যেমন, তেমনি নিজ দলের খেলা পুরোটাই বলতে গেলে পরিচালনা হয় তাকে ঘিরে। অ্যাটাকিং মিডফিল্ডে এখনও আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার তুলনা সম্ভবত খুঁজে পাওয়া যাবে না আর।

jagonews24

স্পেনকে যে রাশিয়া বিশ্বকাপে অন্যতম ফেবারিট হিসেবে ধরা হচ্ছে, তার অন্যতম কারণও এই অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার এবং তাকে ঘিরে থাকা একঝাঁক অভিজ্ঞ ও তরুণ ফুটবলারের সমাবেশ। কিছুদিন আগেই আর্জেন্টিনার মত দলকে ৬-১ গোলে হারিয়ে স্পেন প্রমাণ করেছে, তারা কতটা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারে রাশিয়া বিশ্বকাপে। এ কারণেই তো, লিওনেল মেসি বলেছেন, বিশ্বকাপে তিনি স্পেনের মুখোমুখি হতে চান না।

খুবই নরম প্রকৃতির বিনয়ী একজন মানুষের প্রতিচ্ছবি আন্দ্রেস ইনিয়েস্তা। ছোট বেলা থেকেই তার মধ্যে ভেসে উঠেছিল এই প্রতিচ্ছবি। মাত্র ১২ বছর বয়সে নিজের জন্মস্থান আলবাসিতে ছেড়ে বার্সেলোনার লা মাসিয়ায় এসে যোগ দেন তিনি। এতটাই লাজুক আর নরম স্বভাবের যে, তিনি যখন আলবাসিতে থেকে লা মাসিয়ায় আসছিলেন, তখন তার চোখে পানি। লা মাসিয়ায় এসেও কারও সঙ্গে কথা বলেন না তিনি। লজ্জায় যেন কারও দিকে তাকানোটাও ছিল না তার।

সেই ইনিয়েস্তাকেই কি না বার্সেলোনা অনুর্ধ্ব-১৫ দলের অধিনায়ক করে পাঠিয়ে দেয়া হলো নাইকি প্রিমিয়ার কাপে। টুর্নামেন্টের ফাইনালের একেবারে শেষ মিনিটে গোল করে জেতালেন দলকে। হলেন টুর্নামেন্টের সেরা ফুটবলার। টুর্নামেন্টটা জয় করে বার্সায় ফেরার পর তখনকার বার্সেলোনা দলের অধিনায়ক পেপ গার্দিওলা তরুণ ফুটবলার জাভি হার্নান্দেজকে উদ্দেশ্য করে মজারছলে বললেন, ‘তুমি আমাকে অবসরে পাঠিয়ে দিচ্ছো। আর এই ছেলে তো আমাদের সবাইকেই অবসরে পাঠিয়ে দেয়ার বন্দোবস্ত করে ফেলেছে।’

ইনিয়েস্তার গোলেই তো ২০১০ বিশ্বকাপ জয় করে স্পেন। যারা সব সময়ই থাকতো ফেবারিটের তালিকায়, তারা কি না ২০১০ সালের আগে সেমিফাইনাল পর্যন্ত খেলতে পারেনি। ২০১০ বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠে মুখোমুখি হয় নেদারল্যান্ডসের। ডাচদের বিপক্ষে ম্যাচের অতিরিক্ত সময়ে, ১১৬তম মিনিটে গোল করে বিশ্বকাপ উপহার দেন লা ফুরিয়া রোজাদের। এরপর ২০১২ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপও এলো তার হাতে।

ইনিয়েস্তার পুরো ক্যারিয়ারই কেটেছে ন্যু ক্যাম্পে। বার্সেলোনা ‘বি’ টিম থেকে ২০০২ সালেই সিনিয়র দলে যাত্রা শুরু হয় ইনিয়েস্তার। সেই থেকে মেরুন-নেভি ব্লু জার্সিটা শরীর থেকে আর নামাতে পারেননি। খেলে গেলেন ১৬ বছরেরও বেশি সময় ধরে। অবশেষে সেই ক্লাবের সঙ্গেও বিচ্ছেদ ঘটিয়ে দিলেন তিনি। বিদায় বেলায় অধিনায়কের আর্মব্যান্ড পরে ক্লাবকে জেতালেন লা লিগা এবং কোপা ডেল রে শিরোপা।

jagonews24

ক্যারিয়ারে মোট ৩৭টি শিরোপা উঠেছে ইনিয়েস্তার হাতে। বার্সেলোনার হয়ে ৯বার লিগ শিরোপা জিতেছেন। কোপা ডেল রে ৬টি, স্প্যানিশ সুপার কোপা ৭টি, উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ৪টি, উয়েফা সুপার কাপ ৩টি এবং ক্লাব বিশ্বকাপ জিতেছেন ৩বার। একটি বিশ্বকাপের সঙ্গে দুটি ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপ। ইনিয়েস্তার ক্যারিয়ারে অপূর্ণতা বলতে আর কিছুই বাকি নেই।

রাশিয়া বিশ্বকাপটাই হয়তো তার শেষ আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্ট। এবারও হয়তো তিনি রাঙিয়ে দিতে চাইবেন নিজের ক্যারিয়ারের শেষটা এবং স্পেনকে হয়তো আবারও এনে দিতে পারবেন বিশ্বকাপের শিরোপা। কারণ, ইনিয়েস্তা এমন একজন ফুটবলার, যিনি একাই পুরো একটি ম্যাচকে ঘুরিয়ে দিতে পারেন।

২০০৬ সালে স্পেনের হয়ে অভিষেক আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার। সে থেকে খেলেছেন ১২৫টি ম্যাচ। গোল করেছেন ১৩টি। বার্সার হয়ে খেলেছেন ৪৩৫ ম্যাচ। গোল করেছেন ৩৫টি। তবে ইনিয়েস্তার ব্যক্তিগত আফসোস রয়েছে একটি। ২০১২ ইউরো প্রায় এককভাবে শিরোপা জেতানো, কিংবা ২০১০ বিশ্বকাপের ফাইনালে গোল করে স্পেনকে শিরোপা এনে দেয়ার পরও ফিফা বর্ষসেরা ফুটবলার হতে পারলেন না একবারও। জিততে পারলেন না ব্যালন ডি’অর। অনেকেই মনে করেন, এই দুই বছরের মধ্যে অন্তত একবার হলেও ইনিয়েস্তাকে সেরা হিসেবে বেছে নেয়া যেতো। তাতে হয়তো ইতিহাসের সেরা একজন ফুটবলারকেই সম্মান করা হতো।

আইএইচএস/আরআইপি

করোনা ভাইরাসের কারণে বদলে গেছে আমাদের জীবন। আনন্দ-বেদনায়, সংকটে, উৎকণ্ঠায় কাটছে সময়। আপনার সময় কাটছে কিভাবে? লিখতে পারেন জাগো নিউজে। আজই পাঠিয়ে দিন - [email protected]