সাতক্ষীরায় ‘বরই’ বিপ্লব, ১৬০ কোটি টাকার বাণিজ্যের আশা
দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় জেলা সাতক্ষীরা। এখানে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা কম হওয়ায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বেশি। অতিবৃষ্টি, তীব্র গরম ও নদীর লবণাক্ত পানি অনেক অঞ্চলে ফসলের উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। তবে এই চ্যালেঞ্জের মাঝেও নতুন সম্ভাবনা দেখাচ্ছে বরই চাষ। বরই গাছ স্বল্পমাত্রার লবণ ও আর্দ্রতা সহ্য করতে পারে, দ্রুত ফলন দেয় এবং ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে কম। তাই বরই শুধু মৌসুমি ফল নয়, বরং উপকূলীয় এলাকার কৃষকদের আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হয়ে উঠেছে।
সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এবছর জেলায় প্রায় ৮৪৬ হেক্টর জমিতে বরই চাষ হয়েছে, যা থেকে প্রায় ১৬০ কোটি টাকার বাণিজ্যের সম্ভাবনা দেখা দিচ্ছে। বিশেষ করে বেড বা উঁচু ঢিবি পদ্ধতিতে বরই চাষ এবং জমির আইলে সবজি ও ঘেরে মাছের এই ত্রিমুখী সমন্বয় কৃষকের ঝুঁকি কমিয়ে এনেছে। একেই বলা হয় ‘প্রকৃত অভিযোজন’। যখন একটি ফসল নষ্ট হওয়ার ভয় থাকে, তখন অন্যটি কৃষকের আয়ের উৎস হয়ে দাঁড়ায়। এই মিশ্র চাষ পদ্ধতি কেবল মাটির স্বাস্থ্য রক্ষা করছে না, বরং গ্রামীণ অর্থনীতিতে এনেছে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন।
বরই চাষে এই সাফল্য কেবল অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতেই সীমাবদ্ধ নেই, এটি তৈরি করেছে সামাজিক সুরক্ষাও। বাগানের কাজ ও বাজারজাতকরণ প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়ে এই অঞ্চলের অসংখ্য বেকার নারী স্বাবলম্বী হয়েছেন।

তবে এই বিপুল সম্ভাবনা সত্ত্বেও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। বর্তমানে স্থানীয় বাজারে ও রাজধানী ঢাকায় বরইয়ের ভালো দাম থাকলেও পচনশীল এই ফল সংরক্ষণের জন্য পর্যাপ্ত হিমাগার নেই। ফলে ভরা মৌসুমে অনেক সময় কৃষকেরা ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন। এছাড়া সাতক্ষীরার এই সুস্বাদু ও উন্নত জাতের বরই বিদেশের বাজারে রপ্তানি করতে পারলে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের এক বিশাল দ্বার উন্মোচিত হতে পারে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকার ও কৃষি মন্ত্রণালয় যদি সাতক্ষীরার বরই চাষিদের জন্য বিশেষায়িত হিমাগার নির্মাণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির জন্য বিশেষ সুযোগ তৈরি করে দেয়, তবে এটি কেবল দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চলের কৃষি নয়, পুরো দেশের রপ্তানি খাতে নতুন মাত্রা যোগ করবে।

চলতি মৌসুমে জেলার সাতটি উপজেলায় উৎপাদিত বরই বিক্রি থেকে ১৬০ কোটি টাকার বেশি লেনদেনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে কৃষি বিভাগ। ভালো ফলন ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বাড়তে থাকা চাহিদায় সাতক্ষীরা এখন বরইয়ের বড় বাজারে পরিণত হচ্ছে।
সাতক্ষীরার তালা, কলারোয়া, সদর, দেবহাটা ও অন্যান্য উপজেলায় বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে বিভিন্ন হাইব্রিড জাতের বরই। এর মধ্যে রয়েছে বিলাতি মিষ্টি বরই, থাই আপেল বরই, বল সুন্দরী, কাশমির আপেল, দেশি আপেল, নারিকেল, বোম্বাই ও টক জাতের বরই।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, স্বল্পমাত্রার লবণযুক্ত জমিতেও বরই উৎপাদন ভালো হয়। স্থানীয় কৃষকরা দীর্ঘদিন চাষ করছেন, তাই তারা অভিজ্ঞ এবং সঠিক চাষ পদ্ধতি জানেন। কৃষি বিভাগ মাঠ পর্যায়ে চারা সরবরাহ, পরিচর্যা, সার প্রয়োগ ও রোগবালাই ব্যবস্থায় নিয়মিত পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ দিচ্ছে।
আরও পড়ুন: দেড় লাখ টাকার বরই বিক্রির আশা আওলাদের
হার্টের জন্য দারুণ উপকারী বরই
বরই পাতা মেশানো পানিতে মৃতদের গোসল দেয়ার কারণ কী?
বরই চাষিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বরই চাষে এক বিঘা জমিতে খরচ হয় ৩০–৫০ হাজার টাকা আর ফলন ভালো হলে আয়ের পরিমাণ ৮০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা। প্রতিকেজি বরই বর্তমানে ৭০–১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। একই জমিতে অন্যান্য ফসল চাষের সুযোগ থাকায় অনেকে বরই চাষ করছেন।

তবে বরই চাষে সম্ভাবনার পাশাপাশি রয়েছে সংকট। জেলার স্থানীয় কোনো পাইকারি বাজার না থাকায় কৃষকরা বিক্রির জন্য সাতক্ষীরা বড় বাজার ও খুলনার আড়তের ওপর নির্ভর করছেন। এতে পরিবহন খরচ বাড়ছে এবং আড়তদার নির্ভরতায় কমছে ন্যায্য দাম। যদিও কিছু পাইকার সরাসরি বাগান থেকে বরই কিনে নেন, বাজারদরের স্বচ্ছতা না থাকায় অনেক কৃষক ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না। চাষিদের দাবি, স্থানীয় পর্যায়ে আধুনিক মানের পাইকারি বরই বাজার গড়ে তোলা হোক।
তালা উপজেলার মিঠাবাড়ি গ্রামের প্রবীণ বরই চাষি পাঞ্জাব আলী জাগো নিউজকে বলেন, ‘গত ১৫ বছর ধরে আমি সাত বিঘা জমিতে বরই চাষ করছি। আপেল বরই, বল সুন্দরী, বিলাতি মিষ্টি, কাশ্মির আপেল, দেশি ও টক জাতের বরই চাষে প্রতি মৌসুমে ১০ থেকে ১২ লাখ টাকার মতো আয় হয়। অন্যান্য ফসলের সঙ্গে তুলনা করলে বরই চাষে ঝুঁকি কম এবং লাভ বেশি। এখন বাজারও বাড়ছে, তাই পুরো এলাকায় অনেকেই বরই চাষে ঝুঁকছেন।’
একই উপজেলার বরই চাষি মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘আমার ১১ বিঘা জমিতে আপেল বরই, দেশি আপেল ও বোম্বাই বরই চাষ করি। প্রতি বিঘায় খরচ হয়েছে প্রায় ৩০ হাজার টাকা। বরইয়ের পাশাপাশি হলুদ, ওলসহ অন্যান্য ফসলও চাষ করি। তবে সার ও কীটনাশকের দাম বেড়ে যাওয়ায় খরচ বেড়েছে, যা আয়ের ওপর প্রভাব ফেলেছে।’

সমস্যার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সংরক্ষণের সুযোগ না থাকায় গাছে বরই একবার পাকা শুরু হলে দ্রুত বাজারজাত করতে হয়। কিন্তু স্থানীয় পাইকারি বাজার না থাকায় বরই বিক্রি করতে হয় খুলনা বা সাতক্ষীরার বড় বাজারে। এতে যেমন সময় ব্যয় হয় তেমনি ফলের গুণগত মান নষ্ট হয়।’
কলারোয়া উপজেলার উফাপুর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুস সাত্তার। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘বাগান থেকে অনেক পাইকার সরাসরি বরই কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। এতে পরিবহন ঝামেলা কমেছে, কিন্তু বাজারদরের স্বচ্ছতা না থাকায় সঠিক দাম পাওয়া যাচ্ছে না। আমরা চাই, স্থানীয় পর্যায়ে একটি আধুনিক পাইকারি বরই বাজার গড়ে তোলা হোক।’
কথা হয় সাতক্ষীরা শহরের খুচরা ফল বিক্রেতা লাভলু ইসলামের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে বরইয়ের চাহিদা খুব বেশি। আমি সরাসরি তালা ও কলারোয়ার বিভিন্ন বাগান থেকে বরই এনে বিক্রি করছি। এতে আমার ভালো লাভ হচ্ছে। বাজার থেকে বরই নিলে আড়তদারের কমিশন ও খাঁজনা দিতে অনেক টাকা লাগে। বাগান থেকে কিনলে সেই খরচ হয় না।’

তবে এসব বিষয়ে সুলতানপুর বড় বাজারের পাইকারি ব্যবসায়ী ইদ্রিস আলী জাগো নিউজকে বলেন, ‘বড় বাজারের আড়তগুলোতে প্রতিদিন শত শত টন বরই বেচাকেনা হচ্ছে। বরই বাজার এখন খুলনা, বরিশাল ও অন্যান্য জেলার সঙ্গে যুক্ত। সেখানকার পাইকারি ব্যবসায়ীরা এখান থেকে সরাসরি বরই কিনে নেয়। আমরা সীমিত কমিশনে বেচাকেনা করছি।’
কৃষি বিভাগ বলছে, বরই চাষকে আরও টেকসই ও লাভজনক করতে মাঠ পর্যায়ে নিয়মিত পরামর্শ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। উন্নত জাতের চারা সরবরাহ, পরিচর্যা পদ্ধতি এবং রোগবালাই ব্যবস্থায় কৃষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
সাতক্ষীরা উপকূলীয় উপজেলা শ্যামনগর কৃষি বিভাগের উপসহকারী উদ্ভিদ সংরক্ষণ কর্মকর্তা সুমন মণ্ডল জাগো নিউজকে বলেন, উপকূলীয় এলাকায় ছোট ছোট কিছু বরই বাগান গড়ে উঠেছে। এছাড়া অনেকে ঘেরের আইলে ও বাড়ির উঠানে বরইগাছ রোপণ করেন। এখানকার লবণাক্ত এলাকাগুলোতে দেশি জাতের বরইয়ের পাশাপাশি বাউকুল, আপেল কুল, বল সুন্দরি ও নারকেলি জাতের কুল এলাকায় রোপণ করা যায়। তবে মাটির প্রকার ভেদে ফলন কম বেশি হয়।

তিনি বলেন, আমরা কৃষকদের পরামর্শ দেই ফসলি জমিতে একটু উঁচু করে ছোট ছোট মাটির ডিবি তৈরি করে তাতে বরই চারা রোপণ করতে। এতে গাছের গোড়া পানি জমে না এবং গাছ জলাবদ্ধতার মধ্যেও টিকে থাকে। একই সঙ্গে ফল সংগ্রহের পর বরই গাছের নির্দিষ্ট অংশের ডাল কেটে ফেলতে হয়। এতে পরবর্তী বছরে নতুন ডালে ভালো ফলন হয়।
তালা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা হাজিরা খাতুন জাগো নিউজকে বলেন, বরই চাষিদের নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। কখন চারা রোপণ করতে হবে, কীভাবে গর্ত ও জমি প্রস্তুত করতে হবে, গাছের বয়স অনুযায়ী কতটুকু সার ও পানি প্রয়োজন, রোগ বা পোকামাকড় দেখা দিলে তা শনাক্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শও দেওয়া হচ্ছে।
জাত নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভালো ফলনের জন্য উপযোগী জাত নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বড় আকারের, মিষ্টি স্বাদের, রোগ প্রতিরোধক্ষম এবং বেশি ফলনশীল জাত চাষের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক কৃষিবিদ সাইফুল ইসলাম জাগো নিউজকে জানান, চলতি মৌসুমে সাতক্ষীরা জেলায় ৮৪৬ হেক্টর জমির বাগান থেকে ১৮ থেকে ২০ হাজার মেট্রিক টন বরই উৎপাদনের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। বর্তমানে এর বাজারমূল্য ১৬০ কোটি টাকারও বেশি। স্থানীয় পাইকারি বাজার ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা উন্নত হলে চাষিরা আরও লাভবান হবেন।
এসআর/জেআইএম