বগুড়ায় ১০ টাকা কেজির চাল নিয়ে চলছে ভেলকিবাজি


প্রকাশিত: ১১:২৫ এএম, ০৮ অক্টোবর ২০১৬

১০ টাকার কেজি চাল কালোবাজারে বিক্রির অভিযোগে বগুড়ার শাজাহানপুরের খোট্রাপাড়া ইউনিয়নের ডিলার আওয়ামী লীগ নেতা আবুল বাশারকে ১৫ দিনের কারাদণ্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত।

অভিযুক্ত বাশার খোট্রাপাড়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ শাফিউল ইসলাম গত মঙ্গলবার বিকেলে এ আদেশ দেন। অভিযানকালে বিভিন্ন দোকান তল্লাশি চালিয়ে ৮ বস্তা চাল জব্দ এবং ডিলার বাশারের দোকান থেকে হতদরিদ্রদের হাফ ডজন কার্ড উদ্ধার করা হয়।

এদিকে নন্দীগ্রাম উপজেলায় ১০ টাকা কেজি দরে চাল পাওয়ার কার্ড পেয়েছেন একজন ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য। এই কার্ডের বিপরীতে ইতোমধ্যে তিনি সেপ্টেম্বর মাসের বরাদ্দের ৩০ কেজি চাল উত্তোলন করেছেন।

উপজেলার ভাটগ্রাম ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের সদস্য (মেম্বার) আবু সালাম এ কার্ড পেয়েছেন। ইউপি সদস্য আবু সালাম নিজের নামে কার্ড বরাদ্দ নেওয়া এবং প্রথম কিস্তিতে ৩০ কেজি চাল উত্তোলনের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, সামান্য কিছু জমিজমা থাকলেও আমি অভাবে আছি। অভাবের কারণেই নিজের নামে একটা কার্ড বরাদ্দ নিয়েছিলাম।
 
আর মারা যাওয়ার দুই বছর পরও ১০ টাকা কেজির চাল উত্তোলন করেছেন বগুড়ায় শেরপুর উপজেলার শাহবন্দেগী ইউনিয়নের সাধুবাড়ী গ্রামের জিয়ারুন বিবি। তবে ১০ টাকা কেজির চালের তালিকায় জিয়ারুন বিবির নাম থাকলেও তিনি কিংবা বা তার পরিবারের কোনো সদস্য এই চাল পাননি।

স্থানীয় একটি সিন্ডিকেট এই চাল উত্তোলন করে কালোবাজারে বিক্রি করেছে। একই ভাবে গাড়ীদহ ইউনিয়নেও পাঁচ মৃত ব্যক্তির নামে চাল উত্তোলন করা হয়েছে। শুধু মৃত ব্যক্তি নন, এই উপজেলার তালিকায় ব্যবসায়ী, সরকারি চাকরিজীবী, শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা উত্তোলন করছেন স্বল্পমূল্যের এই চাল। এর কারণে দুই দিনেই বিক্রি শেষ হয়ে গেছে বরাদ্দ দেয়া চলতি মাসের ৩৩৬ মেট্রিক টন চাল।
 
একই ধরনের ঘটনার ধারাবাহিকতায় বগুড়ার ধুনট উপজেলায় ব্যবসায়ীর গুদাম থেকে পাচারকালে সরকারি বরাদ্দকৃত ১০ টাকা কেজি দরের চাল বোঝাই একটি ট্রাক আটক করেছে পুলিশ। এর আগে গত ৪ অক্টোবর বিকেলে ব্যবসায়ী বাদল সাহার গুদামের সামনে থেকে ৫০ কেজি ওজনের ৯০ বস্তা চাল ভর্তি ট্রাকটি আটক করা হয়। ঘটনার সময় ব্যবসায়ী বাদলের গুদাম ঘর থেকে পাচারের উদ্দ্যেশে ১০ টাকা কেজি দরের চালের বস্তা ট্রাকে তোলা হচ্ছিল। খবর পেয়ে ধুনট থানা পুলিশ ৪ হাজার ৫০০ কেজি চালসহ ট্রাকটি আটক করে।

ব্যবসায়ী বাদল সাহা বলেন, সারাদিন কার্ডধারীদের কাছ থেকে ১০ টাকা কেজি দরের এই চাল ২৮ টাকা কেজি দরে কিনে নিয়েছি। এই চাল কেনা যাবে না, এমন আইন আমার জানা ছিল না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বগুড়ায় হতদরিদ্র পরিবারের মাঝে ‘খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির চাল বিক্রি শুরু হয়েছে। জেলার ১২ উপজেলায় মোট ২৩১ জন ডিলারের মাধ্যমে এক লাখ ৫৩ হাজার কার্ডধারীর মধ্যে এ চাল বিক্রি করা হচ্ছে। এ কর্মসূচির আওতায় সহায়-সম্বলহীন পরিবারের মাঝে ১০ টাকা কেজি দরে প্রতি মাসে ৩০ কেজি চাল সরবরাহ করা হবে।

জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রণ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ভোক্তাদের তালিকা সম্পূর্ণ না হওয়া ও ডিলার নিয়োগ-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে বগুড়ায় এ কার্যক্রম অন্যান্য জেলার চাইতে কিছুটা দেরিতে শুরু হয়।

এরই মধ্যে তালিকা অনুযায়ী মোট এক লাখ ৫৩ হাজার পরিবারের মাঝে ভোক্তা কার্ড বিতরণ করা সম্পন্ন হয়েছে। এ চাল বিক্রি করতে জেলা খাদ্য বিভাগের মাধ্যমে নিয়োগ করা হয়েছে ২৩১ জন ডিলার। তবে ভোক্তাদের স্বার্থে ডিলারের সংখ্যা আরো বাড়ানো হতে পারে।

সূত্র জানায়, চলতি মাস থেকে চার-পাঁচ মাস পর্যন্ত এ কার্যক্রম চলতে পারে।

জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. জামাল হোসেন বলেন, প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত হতদরিদ্র পরিবারের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচির ১০ টাকা কেজির চাল বিক্রি কার্যক্রম কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। এক যোগে জেলার ১০৮টি ইউনিয়নে এ চাল বিক্রি শুরু হয়েছে। জেলার খাদ্য গুদামগুলোয় পর্যাপ্ত চাল মজুদ রয়েছে। এ কার্যক্রম আগামী ছয় মাস অব্যাহত রাখলেও চালের কোনো সঙ্কট হবে না।

অনুসন্ধানকালে দেখা গেছে, বগুড়ার বিভিন্ন উপজেলায় ফেয়ার প্রাইজ কার্ডের চাল কালোবাজারী সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এই সিন্ডিকেট পরিচালিত করছেন ক্ষমতাসিন দল আওয়ামীলীগ ও তার অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীরা। তারা নিজেরা ফেয়ার প্রাইজ কার্ডের চাল ক্রয় করে আর্থিক ফায়দা লুটছে।

নন্দীগ্রাম উপজেলার ১টি পৌরসভা এলাকা ও ৫টি ইউনিয়নে মোট ৭ হাজার ৫২৮ জনকে ফেয়ার প্রাইজ কার্ড প্রদান করা হয়। ওই কার্ড প্রদানের শুরু থেকেই নানা ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ উঠে। গত ২৩ সেপ্টেম্বর এখানে চাল বিক্রয় কার্যক্রম উদ্বোধন করা হয়। ওই এলাকায় বর্তমান বাজারে চালের দর সর্বনিম্ন ৩৫-৪০ টাকা কেজি। এ কারণে কালোবাজারী সিন্ডিকেটের সদস্যরা চাল বিক্রয়ের দিন নির্ধারিত স্থানে গিয়ে ৩০ কেজি চাল ৭৫০-৮০০ টাকা দরে ক্রয় করে নিচ্ছে।

গত ৪ অক্টোবর নন্দীগ্রাম উপজেলার ১নং বুড়ইল ইউনিয়নের বীরপলি ও ধুন্দারে গিয়ে দেখা যায়, কালোবাজারীদের চাল ক্রয়ের ধুম। প্রায় সব জায়গায় একই রকম ভাবে চলছে।

অনিয়ম প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ১নং বুড়ইল ইউনিয়নের ফেয়ার প্রাইজ কার্ডের তদারকী কর্মকর্তা আকতার হোসেনের বলেন, এসব ধরার দায়িত্ব আমার না। তবে একই দিন এই উপজেলায় নির্বাহী কর্মকর্তা শরীফুন্নেসা ভ্রাম্যমাণ আদালত করে ভগবজর বাজারের ডিলার আব্দুল মজিদকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করেন।

আবার শাজাহানপুর উপজেলায় মঙ্গলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় ভ্রাম্যমাণ আদালত আমরুল ইউনিয়নের নগরহাট এলাকায় হতদরিদ্রদের কাছ থেকে চাল কেনার অভিযোগে ৬নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ সভাপতি হাফিজার রহমানকে ৩ দিনের কারাদণ্ড প্রদান করেছেন। এ সময় নগরহাট এলাকা থেকে প্রায় অর্ধটন চাল জব্দ করা হয়।

এর আগে দুপুর দেড়টায় উপজেলার খরনা ইউনিয়নের দাড়িগাছা বন্দরে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান পরিচালনা করেন ইউএনও শাফিউল ইসলাম।

এসময় তিনি হায়দার আলী নামের এক ব্যক্তির দোকান থেকে ৮১০ কেজি চাল জব্দ করেন। পরে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে হায়দার আলীকে ৭ দিনের কারাদণ্ড প্রদান করেন। হায়দার আওয়ামী লীগের স্থানীয় কর্মী। অভিযানকালে চাল বিক্রির অপরাধে ৫ জন সুবিধাভোগী দাড়িগাছা দক্ষিণ পাড়া গ্রামের কুলসুম বেগম (কার্ড নং ১০৬৮), কহিনুর বেদম (কার্ড নং ১০৭২), মনোয়ারা বেগম (কার্ড নং ১০৭৫), চায়না খাতুন (কার্ড নং ১০৬৯) এবং আব্দুর রশিদ (কার্ডনং ১০৫৭) এর কার্ড জব্দ করা হয়।

লিমন বাসার/এমএএস/আরআইপি

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।