হাত জোড় করে ক্ষমা চাইলেন ওসি-এসআই
বগুড়ার নন্দীগ্রাম উপজেলায় প্রতিমা বিসর্জনকে কেন্দ্র করে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের উপর পুলিশের লাঠিচার্জের ঘটনায় থানার ওসি ও এসআই হাত জোড় করে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। এ ঘটনায় আহত রঞ্জনা রানীকে চিকিৎসার টাকা দিয়ে সমঝোতা করেন ওসি।
এর আগে প্রতিমা বিসর্জনকে কেন্দ্র করে মঙ্গলবার রাতে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের উপর লাঠিচার্জ করে পুলিশ। নন্দীগ্রাম উপজেলার থালতা মাঝগ্রাম ইউনিয়নের চাঁনপুর হিন্দুপাড়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে।
চাঁনপুর উত্তরপাড়া বারোয়ারী দুর্গা মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক ধীরেন্দ্রনাথ ঘোষ জানান, মঙ্গলবার বিজয় দশমী শেষে হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন প্রতিমা বিসর্জনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। রাত সাড়ে ৭টার দিকে নন্দীগ্রাম থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) নুরুজ্জামানের নেতৃত্বে একদল পুলিশ সেখানে যান।
এরপর প্রতিমা বিসর্জনে দেরি হওয়ার কারণ জানতে চান এসআই নুরুজ্জামান। রাত ৮টার মধ্যে প্রতিমা বিসর্জন সম্পন্ন করা হবে বলে জানানো হয়। এতে পুলিশ সদস্যরা ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে লাঠিপেটা করে। এসময় হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যান্য লোকজন তাকে উদ্ধার করতে গেলে পুলিশের লাঠিপেটায় রঞ্জনা রানী নামে একজন জ্ঞান হারান। এছাড়াও সবুজ মহন্ত, মিঠুন ঘোষসহ বেশ কয়েকজন আহত হন।
ঘটনার পর হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে এবং তারা প্রতিমা বিসর্জন দেয়া থেকে বিরত থাকেন। একপর্যায়ে পুলিশ সদস্যরা জুতা পায়ে মন্দিরে প্রবেশ করে টেনে হিঁচড়ে প্রতিমা বের করার চেষ্টা করে। এতে সরস্বতী প্রতিমার একটি হাত ভেঙে যায়।
শেষ পর্যন্ত উত্তেজনাকর পরিস্থিতি মধ্যে রাত সাড়ে ৮টায় প্রতিমা বিসর্জন সম্পন্ন করা হয়। বিষয়টি রাতেই মন্দির কমিটির পক্ষ থেকে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এবং হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ ও পূজা উদযাপন কমিটির নেতৃবৃন্দকে জানানো হয়।
চাঁনপুর উত্তরপাড়া বারোয়ারী দুর্গা মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক ধীরেন্দ্র ঘোষ জানান, কোনো প্রকার উসকানি ছাড়াই পুলিশ নারী-পুরুষদের উপর লাঠিচার্জ শুরু করে। এ কারণে দোষীদের শাস্তির দাবিতে আমরা হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনের গণ-স্বাক্ষর করেছি।
হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদ নন্দীগ্রাম উপজেলা কমিটির সভাপতি চিত্তরঞ্জন জানান, পূজামণ্ডপে দায়িত্বরত গ্রাম পুলিশ সামছুল রহমানের উসকানিতে পুলিশ বাড়াবাড়ি করেছে। পুলিশের আচরণে হিন্দু সম্প্রদায়ের মাঝে ক্ষোভ ও চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে।
এদিকে, ঘটনার পর বুধবার (১২ অক্টোবর) বিকেলে নন্দীগ্রাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে এক সমঝোতা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শরিফুন্নেছা মারপিট করার অভিযোগ জানতে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুর রাজ্জাককে ডেকে পাঠান। সে সময় থানার ওসি আব্দুর রাজ্জাক ও অভিযুক্ত এসআই শাহিন হাত জোড় করে হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।
প্রায় ৩০ মিনিট চলা বৈঠকের পুরো সময়টাই ওই দুই পুলিশ কর্মকর্তা হাত জোড় করে দাঁড়িয়ে থাকেন। এছাড়াও পুলিশের লাঠিচার্জে আহত রঞ্জনা রানীকে ওসি চিকিৎসার জন্য চার হাজার টাকা এবং ইউপি চেয়ারম্যান দুই হাজার টাকা অনুদান প্রদান করেন।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন নন্দীগ্রাম উপজেলা হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি চিত্তরঞ্জন, সাধারণ সম্পাদক মহাদেব রায়, পূজা উদযাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ভারত চন্দ্র রায়, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আনিছুর রহমান, থালতা মাঝগ্রাম ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল মতিন, চাঁনপুর উত্তরপাড়া বারোয়ারী দুর্গা মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক ধীরেন্দ্রনাথ ঘোষ প্রমুখ।
নন্দীগ্রাম থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুর রাজ্জাক জানান, এটি একটি ভুল বোঝাবুঝি। তারপরেও পুলিশের পক্ষ থেকে ক্ষমা প্রার্থনা এবং লাঠিচার্জে আহতদের জন্য চিকিৎসার খরচ দেয়া হয়েছে। হিন্দু সম্প্রদায়ের নেতৃবৃন্দ মেনে নেয়ায় বিষয়টি নিষ্পতি হয়েছে।
এআরএ/পিআর