সংকট আর অনিয়মে একাকার রায়পুর মৎস্য প্রজনন কেন্দ্র

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ১১:০৪ এএম, ২৬ ডিসেম্বর ২০১৬

জনবল সংকট আর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনিয়ম-দুর্নীতিতে একাকার দেশের অন্যতম লক্ষ্মীপুরের রায়পুর মৎস্য প্রজনন ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র। ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন কার্যক্রমও। রাজস্ব হারাচ্ছে সরকার। এতে বিপুল সম্ভাবনাময় এই প্রতিষ্ঠানকে ঘিরে সরকারের উদ্দেশ্য ভেস্তে যেতে বসেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চাঁদপুর সেচ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ প্রকল্পের ২ হাজার ৪২৮ হেক্টর জলাবদ্ধ, ২ হাজার হেক্টর জমির বোরোপিট ও প্রধান খালগুলোতে মাছ চাষের লক্ষ্যে এ কেন্দ্র করার উদ্যোগ নেয় সরকার। রুই জাতীয় মাছের রেণু ও পোনা সরবরাহ করে মাছের উৎপাদন বাড়ানোর উদ্দেশ্যে ১৯৭৯ সালে এটি স্থাপন করা হয়। তখন ৪ কোটি ৩০ লাখ টাকা ব্যয়ে করা এ কেন্দ্রে উৎপাদন কার্যক্রম শুরু হয় ৯২ সালে। ২১.৮৩ হেক্টর আয়তনের এ জমিতে মোট পুকুর রয়েছে ৭৫টি।

মৎস্য প্রজনন ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র সূত্র জানায়, এখানে ৮১ জন কর্মকর্তা-কর্মচারীর অনুমোদিত পদ রয়েছে। বর্তমানে ২৮ জন কর্মরত থাকলেও ৫৩টি পদে দীর্ঘদিন ধরে লোকবল নেই। এর মধ্যে শূন্য পদ রয়েছে-বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ৬টি, মৎস্য সম্প্রসারণ সুপারভাইজার ৪টি, ক্ষেত্র যোগ গবেষণাগার সহকারী ৫টি, দক্ষ ফিসারম্যান ৬টি, অফিস সহায়ক, হ্যাচারী গার্ড, নৈশ প্রহরী চারজন করে, পাম্প অপারেটর ও কুক-কাম বেয়ারার দুইজন করে, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, হিসাররক্ষণ কর্মকর্তা, উপ-সহকারী প্রকৌশলী (বিদ্যুৎ), উপ-সহকারী প্রকৌশলী (সিভিল) প্রতিপদে একজন করে।

জাগো নিউজের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, সাম্প্রতিককালে রশিদ ছাড়া রেণু বিক্রি, টেন্ডার ছাড়াই মৎস্যজাত দ্রব্য (ওষুধ) ক্রয় ও উন্নয়ন কাজ করা, পুকুরে পরিকল্পিতভাবে অতিরিক্ত চুন দিয়ে মা মাছ মেরে তা বাইরে বিক্রি করে দেয়ার ঘটনা ঘটছে।

প্রতিষ্ঠানটির সম্প্রসারণ সুপার ভাইজার মো. কামাল উদ্দিন গত ১৪ মে নোয়াখালী সদর উপজেলার মৎস্যচাষী জালাল/নাজমুলের কাছে রুই, কাতলা, মৃগেল ও কালি বাউসের রেণু বিক্রি করেন ১৫৬৫০ টাকার। তাদের ০০১৫৯৮৯ নম্বর রশিদও দেয়া হয়। কিন্তু সরকারি হিসেবের মূল্য তালিকার একই নম্বর রশিদে উল্লেখ করা হয়েছে ২ হাজার ২০ টাকা।

একই কর্মকর্তা ৮ মে লক্ষ্মীপুরের রামগতির ইউছুফের কাছে রুইসহ ৪ প্রজাতির রেণু বিক্রি করেন ৭ হাজার ২৪০ টাকার। তাদের ০০১৫৯৩৫ নম্বর রশিদও দেয়া হয়। কিন্তু সরকারি হিসেবের মূল্য তালিকার অংশে একই নম্বর রশিদে উল্লেখ করা হয়েছে ৬৫৫ টাকা। এছাড়া নোয়াখালীর জালাল উদ্দিন নামের এক মৎস্য খামারীর কাছে ৪ কেজি ১৫ হাজার ৬৫০ টাকার রশিদেও মাধ্যমে বিক্রি করা হলেও সরকারি হিসেবে উঠানো হয়েছে মাত্র ৬২০ টাকা।

সরকারি হিসেবের অংশে রেণুর পরিমাণ লেখা হয়েছে মাত্র ৫০০ গ্রাম। ১ অক্টোবর বিকেলে আলোনিয়া এলাকার এক মৎস্যচাষীর কাছে প্রায় ১০ হাজার রুই ও কাতলের রেণু রশিদ ছাড়াই বিক্রি করা হয়। পরে স্থানীয় এক সংবাদকর্মী বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নজরে আনলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি। এভাবে অনেক খামারীর ক্রয় রশিদে বেশি অঙ্কের টাকা আর সরকারি রশিদে টাকার পরিমাণ কম এবং রশিদ ছাড়া রেণু বিক্রির প্রমাণ মিলেছে। এতে সরকারি অর্থ আত্মসাতের ঘটনা ঘটছে।

এদিকে টাকায় গড়মিলের বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির সম্প্রসারণ সুপার ভাইজার মো. কামাল উদ্দিন বলেন,‘দু-একটি রশিদে ভুলে টাকার অঙ্ক গরমিল থাকতে পারে। এছাড়া আমার বিরুদ্ধে বিভ্রান্তি ছড়ানো হচ্ছে’।

অভিযোগ রয়েছে, মার্চ মাসে অক্সিজেনের অভাবে কেন্দ্রের ৩ ও ৩৫ নম্বর পুকুরের অন্তত ৫ মণ রুই, কাতল, মৃগেল ও সিলভারের মা মাছ মারা গেছে। প্রতিটি মাছের ওজন ৫-৮ কেজি। কর্মকর্তাদের যোগসাযোসে কর্মচারীরা রাতের আঁধারে ওই পুকুরগুলোতে অতিরিক্ত চুন ফেলে পরিকল্পিতভাবে মা মাছগুলো মেরে বাহিরে বিক্রি করা হয়েছে।

টেন্ডার ছাড়াই কেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ইচ্ছেমত সীমানা প্রাচীর নির্মাণ ও পুকুরের সংস্কারসহ ৪টি ৪০ লাখ টাকার কাজ করিয়েছেন। এছাড়া গত ১০ মার্চ মৎস্য অধিদফতর থেকে মৎস্য ও মৎস্যজাত দ্রব্যের (ওষুধ) জন্য রায়পুরের এ কেন্দ্রে ৪ লাখ ৮০ হাজার টাকা বরাদ্দ হয়। কোনো টেন্ডার ছাড়া প্রধান কর্মকর্তা এ দ্রব্য ক্রয় করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

লক্ষ্মীপুর জজ আদালতের আইনজীবী আনোয়ার হোসেন মৃধা বলেন, দেশের অন্যতম রায়পুর মৎস্য প্রজনন ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটি বিপুল সম্ভাবনাময় প্রতিষ্ঠান। এখানে উৎপাদিত রেণু-পোনা উন্নতমানের হওয়ায় সারাদেশে এর ব্যাপক চাহিদাও রয়েছে। সরকার এদিকে একটু নজর দিলে মৎস্যখাতে আরো বিপ্লব ঘটানো সম্ভব। পাশাপাশি বেকার সমস্যা দূরীকরণেও এটি ভূমিকা রাখতে পারে।

জানতে চাইলে রায়পুর মৎস্য প্রজনন ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. জসিম উদ্দিন বলেন, আমি কোনো অনিয়মের সঙ্গে জড়িত নেই। রেণু বিক্রির রশিদে টাকার অঙ্গের গরমিল থাকায় কামাল উদ্দিনকে শোকজ করা হয়েছে। জনবল সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এটি নিরসনের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে একাধিকবার চিঠি দিয়ে জানানো হয়েছে।

এ ব্যাপারে মৎস্য বিভাগের কুমিল্লা বিভাগীয় মৎস্য উপ-পরিচালক ড. কাজী ইকবাল আজম বলেন, রায়পুর মৎস্য প্রজনন ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়টি কেউ জানায় নি। তবে এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এআরএ/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।