উত্তাপ ছড়াচ্ছে ছায়েদুল-মোকতাদির দ্বন্দ্ব
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী অ্যাড. ছায়েদুল হক এমপি ও ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ (সদর ও বিজয়নগর) আসনের সংসদ সদস্য র আ ম উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরীর রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এবার উত্তাপ ছড়াচ্ছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রাজনৈতিক অঙ্গনে।
বিগত জেলা পরিষদ নির্বাচনে ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’ শফিকুল আলম বিজয়ী হওয়ার পর জেলা আওয়ামী লীগের তিন পদধারী নেতা এখন মন্ত্রী ছায়েদুল হকের কাছে গিয়ে ভিড়েছেন। পাশাপাশি মন্ত্রীর সঙ্গে বিভিন্ন সভা-সমাবেশে গিয়ে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাংসদ মোকতাদির চৌধুরী এবং সাধারণ সম্পাদক আল মামুন সরকারকে তুলোধুনো করছেন দলে দীর্ঘদিন ধরে কোণঠাসা হয়ে থাকা ওই নেতারা।
সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় জেলার আশুগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের একাংশ আয়োজিত এক সুধী সমাবেশে জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা আমানুল হক সেন্টু, জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন ও সহ-সভাপতি তাজ মোহাম্মদ ইয়াছিন দলের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে ব্যঅপক সমালোচনা করেন।
বিগত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দলের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের মনোনয়ন বাণিজ্যের বিষয়টিও উঠে আসে তাদের বক্তব্যে। নিজেদের বক্তব্যের পুরো সময় জুড়েই সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের প্রতি দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা মনের ক্ষোভ প্রকাশ করেন সুধী সমাবেশে।
মন্ত্রীর সঙ্গে আওয়ামী লীগের দ্বন্দ্বের সূত্রপাত
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী অ্যাড. ছায়েদুল হকের সঙ্গে বিগত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে দুই ইউপিতে প্রার্থী মনোনয়ন নিয়েই মূলত দ্বন্দ্বে জড়ান জেলা আওয়ামী লীগ ও সাংসদ মোকতাদির চৌধুরী। জেলার নাসিরনগর উপজেলার হরিপুর ও গুনিয়াউক ইউনিয়নে মন্ত্রীর পছন্দের প্রার্থীদের বাদ দিয়ে নিজেদের পছন্দ করা প্রার্থীর নাম সুপারিশ করে কেন্দ্রে পাঠায় জেলা আওয়ামী লীগ।
এর মধ্যে একটিতে জেলা আওয়ামী লীগের পছন্দের প্রার্থী পরাজিত হন। এরপর দলের শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগ এনে মন্ত্রী ছায়েদুল হককে জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য পদ থেকে অব্যাহতি দিয়ে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের কাছে সুপারিশ পাঠায় জেলা আওয়ামী লীগ।
মন্ত্রী ছায়েদুল হক এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে ঢাকায় একটি গণমাধ্যমের কাছে নাসিরনগরের হরিপুর ও গুনিয়াউক ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মোকতাদির চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক আল মামুন সরকার ১ কোটি ১৫ লাখ টাকার মনোনয়ন বাণিজ্য করেছেন বলে দাবি করেন। এ ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদরে মন্ত্রী ছায়েদুল হকের অপসারণ চেয়ে মানববন্ধনও করে জেলা যুবলীগ। মূলত এসব বিষয় নিয়েই মন্ত্রীর সঙ্গে জেলা আওয়ামী লীগ ও সাংসদ মোকতাদির চৌধুরীর দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে রূপ নেয়।
নাসিরনগর হামলায় মোকতাদিরকে মন্ত্রীর দোষারোপ
গেল বছরের ৩০ অক্টোবর নাসিরনগর উপজেলা সদরে হিন্দু সম্প্রদায়ের ঘর-বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় মোকতাদির চৌধুরী ও তার সমর্থকদের দায়ী করে আসছিলেন মন্ত্রী ছায়েদুল হক। নাসিরনগরকে বিশ্বসংবাদে পরিণত করার দায় মোকতাদির চৌধুরীর বলেও দাবি করেন মন্ত্রী।
অবশ্য নাসিরনগরের ঘটনায় মোকতাদির চৌধুরীর ওপর ক্ষুব্ধ হন খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও। পাশাপাশি দলের উপদেষ্টা পরিষদ থেকে ছায়েদুল হককে অব্যাহতির সুপারিশের ঘটনায়ও মোকতাদির চৌধুরীর ওপর দলের কার্যনির্বাহী সংসদের একটি মুলতবি সভা শেষে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।
নাসিরনগরের হামলার ঘটনায় সন্দেহভাজন ‘মূল হোতা’ হরিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান দেওয়ান আতিকুর রহমান আঁখি বর্তমানে কারাভোগ করছেন। এ ঘটনায় আরেক অভিযুক্ত আওয়ামী লীগ নেতা মো. সুরুজ আলীও বর্তমানে কারান্তরীণ। তবে এ মামলায় কারাভোগ করে বর্তমানে জামিনে আছেন আওয়ামী লীগ নেতা শেখ আবদুল আহাদ।
ফের আলোচনায় ছায়েদুল-মোকতাদির দ্বন্দ্ব
নাসিরনগরের হামলার ঘটনার পর সম্প্রতি আবারও মন্ত্রী ছায়েদুল হক ও সাংসদ মোকতাদির চৌধুরীর দ্বন্দ্বের বিষয়টি সবার সামনে উঠে এসেছে। জেলার আশুগঞ্জ ও বিজয়নগর উপজেলায় পৃথক দুটি অনুষ্ঠানকে ঘিরে গত কয়েকদিন ধরেই উত্তপ্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রাজনৈতিক অঙ্গন।
গত বৃহস্পতিবার আশুগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগ আয়োজিত একটি সুধি সমাবেশকে কেন্দ্র করে মন্ত্রী ছায়েদুল সমর্থক ও সাংসদ মোকতাদির সমর্থকদের মধ্যে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত প্রশাসনের তৎপরতায় কোনো প্রকার অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই আশুগঞ্জ শ্রম কল্যাণ কেন্দ্র মাঠে মন্ত্রী ছায়েদুল হকের সুধি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে।
তবে আগামীকাল রোববার বিজয়নগর উপজেলা প্রাণিসম্পদ হাসপাতাল উদ্বোধন ও সুধি সমাবেশ নিয়ে উত্তেজনা এখনো কাটেনি। গত বৃহস্পতিবার দুপুরে সংবাদ সম্মেলন করে বিজয়নগর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অ্যাড. মো. তানভীর ভূঁইয়া ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি অ্যাড. জহিরুল ইসলাম ভূঁইয়া সাংসদ মোকতাদির চৌধুরীকে সঙ্গে না নিয়ে এলে মন্ত্রীর অনুষ্ঠান বর্জনের ঘোষণা দেন।
এদিন বিকেলেই মন্ত্রীর অনুষ্ঠান ঠেকাতে রোববার সকাল-সন্ধ্যা বিজয়নগর উপজেলায় হরতাল কর্মসূচি ঘোষণা করে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসহযোগী সংগঠন। এছাড়া গতকাল শুক্রবার দুপুরে বিজয়নগর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাকে মারধর ও কার্যালয় ভাঙচুর করে দুর্বৃত্তরা। এসময় দুর্বৃত্তরা হাসপাতাল উদ্বোধনের জন্য বসানো মন্ত্রী ছায়েদুল হকের নামফলকটিও ভেঙে ফেলে।
এ অবস্থায় মন্ত্রী ছায়েদুল হকের অনুষ্ঠান নিয়ে উত্তপ্ত হয়ে উঠছে বিজয়নগর উপজেলা। মন্ত্রী তার নির্ধারিত অনুষ্ঠানে সাংসদ মোকতাদির চৌধুরীকে ছাড়াই যোগ দেয়ার সিদ্ধান্তে এখনও অনড় আছেন। তবে বিষয়টি নিয়ে বিজয়নগর উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের পাশাপাশি জেলা আওয়ামী লীগেও ক্ষোভ বিরাজ করছে।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক শাহ্আলম সরকার জাগো নিউজকে বলেন, মন্ত্রী ছায়েদুল হক সাংসদ মোকতাদির চৌধুরীকে ছাড়াই তার নির্বাচনী এলাকায় গিয়ে কর্মসূচি পালন করবেন এটি দলীয় নেতাকর্মীরা কোনোভাবেই মেনে নেবে না।
মন্ত্রীর উচিত সাংসদ মোকতাদির চৌধুরীর সঙ্গে কথা বলে তাকে নিয়ে বিজয়নগরের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা। সাংসদ মোকতাদির চৌধুরীকে পাশ কাটিয়ে তার নির্বাচনী এলাকায় কর্মসূচি দেয়া মন্ত্রীর ঠিক হয়নি বলেও জানান জেলা আওয়ামী লীগের এ নেতা।
এফএ/এমএস