নোয়াখালীতে দাদনের টাকা নিয়ে বিপাকে জেলে-আড়ৎদাররা
নোয়াখালীর মেঘনা নদীতে চলছে ইলিশ ধরার ব্যাপক প্রস্তুতি। গত বছর নদীতে জেলেদের জালে ব্যাপক ইলিশ ধরা পড়ায় এবারও জেলেরা আশাবাদী। ইতোমধ্যে জেলেরা জাল ও নৌকা মেরামত করতে শুরু করেছেন। অনেকেই মাছ ধরার নতুন বোট বা নৌকা তৈরি করছেন।
সরেজমিনে নোয়াখালীর বিচ্ছিন্ন দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার চেয়ারম্যান ও ট্যাঙ্কির ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, শত শত জেলে মেঘনা নদীতে ইলিশ ধরার জন্য সব ধরনের প্রস্ততি শেষ করেছে।
কথা হয় হাতিয়ার ওছখালীর জেলে জগদীস চন্দ্র দাসের (৩০) সঙ্গে। তিনি জানান, সামনে ইলিশ ধরার ভরা মৌসুম। বিষেশ করে বর্ষা মৌসুমে ইলিশ গভীর নদী থেকে মিঠা পানিতে আসে। আর তখনই জালে ধরা পড়ে। আরও দেড় মাস বাকি আছে। তারপর মাছের আশায় তারা নদীতে যান। কিন্তু সে পরিমাণ মাছ জালে ধরা পড়ছে না।
হরিদাস নামে এক জেলে জানান, এখন ইলিশের আকাল চলছে। তারপরও তারা নদীতে যান মাছ ধরার জন্য। মাছ না ধরলে সংসার কীভাবে চালাবেন। কিন্তু যে পরিমাণ খরচ হয় বিশেষ করে নৌকার তেল, মাঝিমাল্লাদের খাবার সেই পরিমাণ মাছ কিন্তু জালে ধরা পড়ছে না। তাই বাধ্য হয়ে তারা মহাজনের কাছ থেকে দাদন নিয়ে বাড়িতে সংসার খরচের জন্য টাকা পাঠাচ্ছেন।
তিনি আরও জানান, আগের নেয়া দাদন (ঋণ) এখনও পরিশোধ করতে পারেননি। সামনে মাছ বিক্রি করে সে দাদনের টাকা পরিশোধ করতে পারবেন কি না দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন। 
নদী থেকে ফেরা আবুল হাসেম নামে এক মাঝি জানান, সারাদিনে তার ছবিল (জ্বালানিসহ অন্যান্য খরচ) হয়েছে ৯০০ টাকা। আর মাছ বিক্রি করে পেয়েছেন প্রায় সাড়ে ৬শ টাকা। জালে ইলিশ ধরা না পড়ায় তাদের মনে কোনো আনন্দ নেই।
তাছাড়া গত কয়েকদিন ধরে সাগর উত্তাল থাকায় মাঝিমাল্লারা সাগরে গিয়ে মাছ ধরতে সাহস পাচ্ছেন না। সর্বশেষ গত সোমবার বিকেল থেকে ঘূর্ণিঝড় মোরার প্রভাবে মেঘনা নদী উত্তাল রয়েছে। সাগরে সিগন্যাল থাকায় কেউই ভয়ে মাছ ধরতে সাহস পাচ্ছে না। এভাবে আর কতদিন বসে বসে খাবে তার কোনো সময় তাদের জানা নেই।
নোয়াখালীর উপকূলীয় এলাকার বিভিন্ন মৎস্যঘাট ঘুরে জানা যায়, দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার বাংলাবাজার, নলচিরা, সূর্যমুখী, কাজির বাজার, জাহাজমারা রাস্তার চর, তমরুদ্দীন আজমার খাল, সুখচর চেয়ারম্যান বাজার, চান্দালী ঘাট ও বগুলার খালসহ আশপাশের ঘাটগুলো থেকে মেঘনায় ইলিশ ধরতে যাওয়া নৌকার সংখ্যা আড়াই হাজারেরও বেশি।
এছাড়া বয়াচরের চেয়াম্যান ঘাট ও ট্যাঙ্কির মাথা ঘাট থেকে তিন শতাধিক নৌকা নিয়ে জেলেরা প্রতিদিনই ছুটে যায় নদীতে। ঘাট থেকে জেলে নৌকাগুলো জোয়ারের আগে ছেড়ে যায়। কেউ একটি আবার কেউ একাধিক জোয়ারের অপেক্ষায় থেকে মাছ ধরে ফিরে আসে। কিন্তু বর্তমানে নদীতে মাছ ধরতে না পারায় সবাই অলস সময় পার করছেন।
এদিকে প্রতি বছর ইলিশ ধরার সময় আসলে কিছু দাদন ব্যবসায়ী উঠে পড়ে লেগে যায় জেলেদের দাদন দেয়া জন্য। 
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভোলার দৌলতখাঁ, লক্ষ্মীপুরের রামগতি, মুন্সিগঞ্জ, শ্রীপুর, ইলিশা, ফরিদপুর, শিবচর ও হাতিয়া এলাকার এসব নৌকার মাঝিরা মৌসুমের শুরুতে দাদন নেয়ায় জালে ধরাপড়া ইলিশ সরবরাহ করতে হচ্ছে নির্ধারিত আড়ৎদার ও মহাজনের গদিতেই। আড়ৎগুলোতে আবার দুই ধরনের ব্যবস্থা চালু। একটি হচ্ছে পণ আরেকটি হচ্ছে মণ হিসেবে। পণ হিসেবে মাছ বিক্রি করলে আবার আড়ৎদারদের কমিশন দিতে হয়।
দৌলতখাঁর ইকবাল মাঝি জানান, আগে যেখানে ৭/৮শ টাকার তেল লাগত সেখানে এখন ১৫শ টাকার তেলেও হয় না। যদি তিনটি জোয়ার অপেক্ষা করে মাছ ধরতে হয় তাহলে আরও বেশি লাগে। কিন্তু এখনও আশানুরূপ হারে মাছ ধরা না পড়ায় কোনো কোনো ট্রিপে লোকসান গুণতে হয়।
তিনি বলেন, আগে জ্বালানি তেলের দাম কম ছিল এবং জেলেও কমছিল। তাই মাছ পড়তো বেশি। এখন তেলের দাম বেশি এবং জেলেও বেশি। কখনও কখনও দেখা যায় ৩/৪টি মাছ নিয়েই নদী থেকে ফেরৎ আসতে হচ্ছে।
মুন্সিগঞ্জের জুলহাস মিয়া জানান তার নৌকায় ১১ জন জেলে ও মাঝিমাল্লা রযেছে। জ্বালানি তেলের খরচ এবং নৌকায় খাদ্যসামগ্রীর দাম বেড়ে যাওয়ায় তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। সামনে মৌসুম আছে এ আশায় এখন বসে বসে খাচ্ছেন।
কমিশন প্রসঙ্গে চেয়ারম্যান ঘাটের আড়ৎদার হেলাল জানান, চেয়ারম্যান ঘাটে প্রকাশ্যে নিলামের মাধ্যমে মাছ পাইকারদের কাছে বিক্রি করা হয়। ফলে জেলেরাও ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে। আড়ৎদাররা দাম নির্ধারণ না করায় কর্মচারী, ঘর-ভাড়া, বরফসহ নানাবিধ খরচের কারণে ৮ পার্সেন্ট কমিশন নেয়া হয়। যার মধ্যে আবার ঘাটের ইজারাদারকে টাকা দিতে হয়। তবে জ্বালানি খরচ বেড়ে যাওয়ায় জেলেদের হিমশিম খেতে হয়। এখনও পুরোদমে মাছ পেতে আরও এক থেকে দেড় মাস লাগবে।
হাতিয়ার কাজির বাজার ঘাটে মাছ দেন রফিক মাঝি। তিনি জানান, মৌসুমের শুরুতে মহাজনের কাছ থেকে দাদন নেয়ার কারণে তাদের আড়তেই জেলেদের মাছ দিতে হয়। আড়ৎদারদের নির্ধারিত দামে মণ হিসেবে তারা মাছ সরবরাহ করেন। তবে তাদের কমিশন দিতে হয় না।
হাতিয়ার আড়ৎগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সেখানে জেলেদের কাছ থেকে গড়ে ৭ থেকে সাড়ে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত ইলিশের মণ কেনা হয়। দাদন নেয়ার কারণে মহাজনের বেঁধে দেয়া দামেই মাছ বিক্রি করতে বাধ্য হন জেলেরা। জেলেদের কাছ থেকে মাছ কেনার পর মহাজন ও আড়ৎদাররা তা বরফকলে মজুত করে রাখেন। পরবর্তীতে তা নোয়াখালীসহ বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়।
সুখচর চান্দালী ঘাটের আড়ৎদার কাসেম হাজি জানান, জেলেদের কাছ থেকে মাছ কেনার পর বরফের দাম, কর্মচারী খরচ, গদি খরচসহ নানা খরচ যোগ করতে গেলে মাছের দাম পড়ে যায় মণ প্রতি ১০ হাজার টাকারও বেশি। জেলেদেরকে নির্ধারিত দামে মাছ বিক্রিতে বাধ্য করার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, প্রতিটি আড়ৎ থেকে দাদন নেয়া জেলেরাই ঠিক করে দেয় মাছের দাম।
মানিক নামে একজন আড়ৎদার জানালেন, গত বছরে দেয়া দাদনের ১৫/১৬ লাখ টাকা জেলেদের কাছ থেকে এখনও উত্তোলন করা যায়নি। চলতি মৌসুমেও ইলিশ তেমন ধরা না পড়ায় জেলেদের পাশাপাশি তারাও খুবই চিন্তিত।
এছাড়া একদিকে ইলিশের আকাল, অপরদিকে জলদুস্যদের ভয়ে অনেকে সাহস করে মাছ ধরার জন্য গভীর সমুদ্রে যায় না। সামনের দিকে ইলিশ ধরা পড়লে তারা সে ধার-দেনা পরিশোধ করতে পারবে এই আশায় অনেকে জেলেদেরকে তারা জ্বালানি তেল, খাদ্যসামগ্রী কেনার জন্য নগদ টাকাসহ বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করে যাচ্ছে।
তিনি আরও জানান, নোয়াখালী উপকূলীয় এলাকায় ইলিশ মাছ সংরক্ষণ করে রাখার মতো কোনো ব্যবস্থা নেই। নদী থেকে মাছগুলো ধরে আনার পর তারা কোনো মতে দু-একদিন মাছগুলো রাখার পর দাদন নেয়া বড় বড় ব্যবসায়ীদের কাছে ঢাকা চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্নস্থানে পাঠিয়ে দেন।
এমএএস/এমএস