দায়িত্ব পাননি, তবুও তিনি পরিচালনায়!


প্রকাশিত: ০২:০০ পিএম, ১৮ মে ২০১৫

এখনো দায়িত্ব নেননি চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের (চসিক) নবনির্বাচিত মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন। মেয়াদ পূর্ণতা নিয়ে আইনি জটিলতায় আটকে আছে তার দায়িত্ব নেয়া। কিন্তু দায়িত্বগ্রহণ ছাড়াই অনানুষ্ঠানিকভাবে কর্পোরেশন পরিচালনা করছেন তিনি। কর্মকর্তা কর্মচারীদের নিয়ে কর্পোরেশনের বাইরে বৈঠক করে মৌখিক নির্দেশনা দিচ্ছেন নাছির। এক্ষেত্রে চসিকের ভারপ্রাপ্ত মেয়র এবং প্রধান নির্বাহী তার নির্দেশনা বাস্তবায়নে কাজ করছেন।

গত ২৮ এপ্রিল ঢাকা উত্তর, দক্ষিণ ও চট্টগ্রামসহ তিন সিটি কর্পোরেশনে মেয়র নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তিনটিতেই আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীরা জয়ী হন। ফল ঘোষণার ৩৬ ঘণ্টার মধ্যে তিন সিটি কর্পোরেশনে নির্বাচনে বিজয়ী প্রার্থীদের নাম-ঠিকানাসহ ৩০ এপ্রিল গেজেট প্রকাশ করেছে নির্বাচন কমিশন। আইনে গেজেট প্রকাশের এক মাসের মধ্যে শপথ গ্রহণের বাধ্যবাধকতা থাকায় ৬ মে শপথ নেন তিন মেয়রসহ নির্বাচিত কাউন্সিলররা। শপথ নিলেও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের নবনির্বাচিত মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনকে আরো প্রায় আড়াই মাস অপেক্ষা করতে হচ্ছে। স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশনে আইন), ২০০৯-এর ৬ ধারা মোতাবেক করপোরেশন গঠিত হওয়ার পর প্রথম বৈঠকের পরবর্তী পাঁচ বছর পর্যন্ত মেয়াদ নির্ধারিত থাকায় চসিক মেয়রকে জুলাই পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

আইন অনুযায়ী চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মনজুর আলম ও তার আমলের কাউন্সিলরদের মেয়াদ উত্তীর্ণ হবে আগামী ২৬ জুলাই। যেহেতু মনজুর আলম পদত্যাগ করেছেন তাই ভারপ্রাপ্ত মেয়রও ওই মেয়াদ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করবেন। আইনি বাধ্যকতার কারণে দাফতরিক কোনো কাজ করতে না পারলেও সিটি কর্পোরেশনের বাইরে থেকে কর্মকর্তাদের মৌখিক বিভিন্ন নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন নবনির্বাচিত মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন। কর্পোরেশনের বাইরে চসিকের কর্মকর্তা কর্মচারীদের নিয়ে নির্বাচনের পর কয়েকটি বৈঠক করেছেন তিনি। বৈঠকগুলোতে চসিকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জলাবদ্ধতা নিরসনে কর্মপরিকল্পনা এবং খাল-খনন ও নালা নর্দমা পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার নির্দেশনা ছাড়াও বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মকাণ্ড নিয়ে মৌখিক নির্দেশনা দেন আ জ ম নাছির উদ্দিন।

তারই ধারাবাহিকতায় সোমবার দুপুর ১টায় থিয়েটার ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন বিভাগের কর্মকর্তা ও দায়িত্বপ্রাপ্তদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন নব নির্বাচিত মেয়র। বৈঠকে নগরবাসীর নাগরিক প্রত্যাশা পূরণে গাফিলতি সহ্য করা হবে না বলে হুশিয়ারি উচ্চারণ করেন আ জ ম নাছির।

মেয়র কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেন, ‘আপনারা সিটি কর্পোরেশনের স্থায়ী কর্মকর্তা। মেয়র ও কাউন্সিলর পরিবর্তন হয় কিন্তু আপনাদের পরিবর্তন হয় না। তাই আপনাদের দায়িত্বও বেশি। আপনাদের বিভিন্ন সুবিধা অসুবিধার কথা আমি শুনেছি। কাজ করতে গেলে বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি হবে। কিন্তু যদি সিটি কর্পোরেশনের সকলে সম্মিলিতভাবে কাজ করেন তবে কোনো বাধাই উন্নয়ন কাজে অন্তরায় হতে পারবে না।’

জলাবদ্ধতা চট্টগ্রামের প্রধান সমস্যা উলে­খ করে তিনি বলেন, সামনে বর্ষা মৌসুম। নগরীর কোন কোন জায়গায় জলাবদ্ধতা সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করে সেটি শিগগিরই চিহ্নিত করতে হবে। এসব চিহ্নিত স্থানে জলাবদ্ধতা সমস্যাটি এ মৌসুমে স্থায়ীভাবে সমাধান করতে না পারলেও জনগণ যেন পানিতে না ডুবে সে ব্যবস্থা নিতে হবে। নগরীর বিভিন্ন নালা নর্দমা পরিষ্কার করে পানি চলাচলে প্রতিবন্ধকতা দূর করতে পারলে জনগণের কষ্ট কিছুটা লাঘব হবে। নবনির্বাচিত মেয়র খুব দ্রুত নগরীর ভরাট হয়ে যাওয়া খাল ও ছড়াগুলো খনন করার নির্দেশ দেন।

সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী মোহাম্মদ শফিউল আলমের সভাপতিত্বে মতবিনিময় সভায় বক্তব্য রাখেন ভারপ্রাপ্ত মেয়র মোহাম্মদ হোসেন, প্যানেল মেয়র চৌধুরী হাসান মাহমুদ হাসনী, বর্জ্য স্ট্যান্ডিং কমিটির সভাপতি হাজী নুরুল হক, চসিক সচিব রশিদ আহমেদ, মেয়রের একান্ত সচিব মোহাম্মদ মঞ্জুরুল ইসলাম।

এর আগে গত ১৩ মে সিটি করপোরেশনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে ব্যক্তিগত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে বসে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ দিয়েছেন। কর্পোরেশন সূত্র জানায়, ওই দিন সকালে বায়েজিদ বোস্তামি এলাকার ব্যক্তিগত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রেনেসকো সুয়েটার্স লিমিটেড কার্যালয়ে কর্পোরেশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে প্রায় দুই ঘণ্টা বৈঠক করেছেন নবনির্বাচিত মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন। এসময় আগ্রাবাদ এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে নাছির খাল এক সপ্তাহের মধ্যে পরিষ্কার করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন তিনি।

এছাড়া চসিকের সম্পূর্ণ কার্যক্রম কম্পিউটারাইজড কীভাবে করা যায় তা নিয়ে পরিকল্পনা তৈরি করারও নির্দেশ দেন কর্মকর্তাদের। আদালতে পক্ষে বিপক্ষে মামলার কারণে দীর্ঘদিন ধরে সিটি কর্পোরেশন পদোন্নতি ও নিয়োগ বন্ধ রয়েছে। যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী মামলা করে কর্পোরেশনে অচলাবস্থা তৈরি করেছেন তাদেরকে দ্রুত মামলা তুলে নেয়ার নির্দেশ দেন মেয়র। দায়িত্ব নেয়ার পর পর নগর ভবনকে সম্পূর্ণ ওয়াইফাই জোনে পরিণত করার আগ্রহের কথা কর্মকর্তাদের জানান আ জ ম নাছির।  বিভিন্ন ওয়ার্ডের জরাজীর্ণ কার্যালয়গুলোর তালিকা করে প্রকল্প তৈরি করার জন্য বলেন। এছাড়া কর্মকর্তাদের নিজ নিজ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালনের জন্য কঠোর নির্দেশ দেন তিনি।

কর্পোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম জানান, মেয়র মহোদয় নাছির খাল পরিষ্কারসহ জলাবদ্ধতা নিরসন করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। আমরা আজকে খালটি পরিদর্শন করেছি। খুব দ্রুত কাজ শুরু করা হবে।
বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন এমন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের অবহেলা সহ্য করা হবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন নবনির্বাচিত মেয়র।

তিনি বলেছেন, আগে কী হয়েছে না হয়েছে আমি তা দেখবো না। কিন্তু এখন কোনো ধরনের গাফিলতি সহ্য করা হবে না। ক্রমান্বয়ে তিনি সবস্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে বৈঠক করবেন বলে জানিয়েছেন। এছাড়া যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্পোরেশনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছেন তাদেরকে মামলা উঠিয়ে নিতে বলা হয়েছে। মেয়র বলেছেন, কোনো ঝামেলা থাকলে তা কর্পোরেশনে বসে সমাধান করা হবে।

ওই বৈঠকেও ভারপ্রাপ্ত মেয়র মোহাম্মদ হোসেন, কর্পোরেশনের সচিব রশিদ আহমদ, প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ স্থপতি এ কে এম রেজাউল করিম, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. রফিকুল ইসলাম, প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) আহমদুল হক, নির্বাহী প্রকৌশলী মনিরুল হুদা, মোহাম্মদ আবু ছালেহ ও মো. কামরুল ইসলাম প্রমুখ।

এ ব্যাপারে ভারপ্রাপ্ত মেয়র মোহাম্মদ হোসেন সোমবার জাগো নিউজকে বলেন, ‘নব নির্বাচিত মেয়র দায়িত্ব নেয়ার আগে কর্পোরেশনের সব কিছু বুঝে নিচ্ছেন। দায়িত্বগ্রহণের পর যাতে কোনো সমন্বয়হীনতা না হয়। সোমবার ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বসেছেন-দিক নির্দেশনা দিয়েছেন।’

তিনি বলেন, ‘নতুন মেয়রের নির্দেশনা মোতাবেক আমরা কাজ শুরু করে দিয়েছি। কয়েকটি নির্দেশনা বাস্তবায়নও করেছি।’ পর্যায়ক্রমে সব বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বসবেন বলে জানালেন ভারপ্রাপ্ত মেয়র।

বিএ/আরআইপি

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।