শিকলমুক্ত হলো সেই ফাতেমা

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি কিশোরগঞ্জ
প্রকাশিত: ০৭:০৬ এএম, ১৮ জুলাই ২০১৭

অবশেষে দুর্বিসহ শিকলবন্দি জীবন থেকে মুক্তি পেয়েছে কিশোরগঞ্জের সেই ফাতেমা। প্রায় তিন বছর পর বসতঘরের অন্ধকার থেকে মুক্ত আকাশ দেখার সুযোগ মিললো ফাতেমার। চিকিৎসার জন্য তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। 

কিশোরগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. মো. হাবিবুর রহমানের উদ্যোগে সোমবার ফাতেমাকে বাড়ি থেকে নিয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। দরিদ্র পরিবারের মানসিক ভারসাম্যহীন ফামেতার চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছেন সিভিল সার্জন।

কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলার জিনারী ইউনিয়নের চরকাটিহারি গ্রামের মহিবুর রহমান সরদারের মেয়ে ফাতেমা। মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ায় তিন বছর ধরে তাকে পায়ে লোহার শিকল বেঁধে রাখা হয়েছিল। সম্ভব হচ্ছিল না উন্নত চিকিৎসার। বিষয়টি নিয়ে ‘৩ বছর ধরে শিকলে বাঁধা জীবন তার!’ শিরোনামে গত ৩ জুলাই জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগো নিউজে সংবাদ প্রকাশের এ নিয়ে চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। সংবাদ প্রকাশের পর মেয়েটির চিকিৎসার দায়িত্ব নিলেন সিভিল সার্জন।

কিশোরগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. মো. হাবিবুর রহমান জানান, খবরটি পড়ে এ বিষয়ে খোঁজ-খবর নেয়ার জন্য আমার অফিস থেকে লোক পাঠানো হয়। তাদের মতামতের ভিত্তিতে সোমবার সরকারি অ্যাম্বুলেন্স পাঠিয়ে হোসেনপুর থেকে মেয়েটিকে কিশোরগঞ্জে আনা হয়। সেখানে ফামেতার শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করেন কিশোরগঞ্জ শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেকিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মবিন উদ্দিন।

প্রাথমিক পরীক্ষার পর ফাতেমাকে বাড়িতে রেখে চিকিৎসা দেয়া সম্ভব নয় বলে মত দেন চিকিৎসক। ফলে অ্যাম্বুলেন্সে করেই তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। হাসপাতালের মানসিক রোগ ইউনিটে তাকে ভর্তি করা হয়। ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপ-পরিচালক প্রফেসর ডা. আব্দুল গণির তত্ত্বাবধানে ফামেতার চিকিৎসা চলছে। 

fatema

সিভিল সার্জন বলেন, আমি ব্যক্তিগতভাবে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতলের উপ-পরিচালকের সাথে কথা বলেছি। তারা আন্তরিকভাবে মেয়েটির চিকিৎসার বিষয়টি দেখছেন।

কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলার জিনারী ইউনিয়নের চরকাটিহারি গ্রামের মহিবুর রহমান সরদারের ৬ ছেলে-মেয়ের মধ্যে ফাতেমা সবার ছোট। ভাই বাবুল সরদার (৪০) কৃষি কাজ করেন। আরেক ভাই রফিক সরদার (৩৩) সড়ক দুর্ঘটনায় পঙ্গু। বড় বোন সালমা আক্তারকে (২৮) বিয়ের কয়েক বছর পর স্বামীর বাড়ি থেকে ফেরত পাঠানো হয়েছে। অপরাধ ছোট বোন ফাতেমা মানসিক প্রতিবন্ধী। আরেক বোন নাজমা আক্তারও কিছুটা মানসিক প্রতিবন্ধী ছিল। ছোট ভাই পাপ্পু সরদার (১৪) স্থানীয় একটি হাই স্কুলে নবম শ্রেণিতে পড়ছে।

বাবা মহিবুর রহমান সরদার বয়সের ভারে শয্যাশায়ী। পরিবারে উপার্জনক্ষম মানুষ নেই। বাবার যা কিছু ছিল সবই গেছে মেয়ের চিকিৎসার পেছনে। এখন পরিবারটিতে কারো চোখের পানি সরছে না। থামছে না কান্না।

বাবার অভাব-অনটনের সংসার হলেও সবার ছোট হওয়ায় সবার আদর স্নেহেই শৈশব কাটে ফাতেমার। যথারীতি এসএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিল সে। কিন্তু হঠাৎ করেই যেনো সবকিছু ওলট-পালট হয়ে পড়ে। সবার আদরের মেয়েকে এক সময় যেনো পরিবারের বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। তাইতো নূপূরের বদলে তার কোমল পায়ে পরানো হয় লোহার শিকল! মানসিক ভারসাম্য হয়ে পড়ার পর তিন বছর ধরেই এমন দুঃসহ জীবন কাটছিল ফামেতার।

২০১১ সালে হোসেনপুর হুগলাকান্দি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষা দেয়ার কথা ছিল ফাতেমার। কিন্তু, নির্বাচনী পরীক্ষায় সে উত্তীর্ণ হতে পারেনি। এর পরই মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে ফাতেমা। প্রথম দিকে তার আচরণে কিছুটা অস্বাভাবিকতা দেখা দিলেও এক পর্যায়ে মেয়েটি মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে। 

ফামেতার মা আছিয়া আক্তার জানান, আল্লাহ আমাদের দিকে মুখ তুলে চেয়েছেন। আমার মেয়েটা সুস্থ হলে আমাদের আর কোনো কষ্ট থাকবে না। না খেয়ে থাকলেও নিজের মনকে বোঝাতে পারবো। মেয়েটির কষ্ট আর সহ্য করতে পারছি না।

নূর মোহাম্মদ/আরএআর/পিআর

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।