ঢাকের হাট

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি কিশোরগঞ্জ
প্রকাশিত: ০৩:৫২ এএম, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭

দূর থেকে কানে আসছে বাদ্যের শব্দ। একসঙ্গে হাজারো বাদ্যযন্ত্রের সম্মিলিত শব্দে এক ভিন্ন আবহ সৃষ্টি হয়েছে। হঠাৎ দেখে মনে হতে পারে এখানে বড় পরিসরে কোনো উৎসবের আয়োজন করা হয়েছে। কিন্তু ভিড় ঠেলে ভেতরে ঢুকলেই বোঝা যাবে আসল  কাহিনী। এ যেন যন্ত্র আর যন্ত্রীর ভিন্ন এক প্রতিযোগিতা। যন্ত্রিরা ঢাক-ঢোল, বাঁশি, খাসি, খোলসহ বাহারি বাদ্যযন্ত্র বাজাচ্ছেন যার সুরের মূর্ছনায় নিজেরাই মাতোয়ারা।

এমন ব্যতিক্রমী দৃশ্য চোখে পড়বে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার বাদ্যযন্ত্রের হাটে। স্থানীয়ভাবে যেটি ঢাকের হাট নামে পরিচিত। প্রতি বছর শারদীয় দুর্গোৎসবকে ঘিরে ব্রহ্মপুত্র নদীর তীরে কটিয়াদী পুরান বাজারে বসে ব্যতিক্রমী এ হাট। প্রতি বছরের মতো পূজা ঘিরে জমে উঠেছে কটিয়াদীর ঢাক-ঢোলের হাট। পুরো হাট জুড়ে উৎসবের রং। যন্ত্রীরা বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে নেচে-গেয়ে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করছেন।

বাদ্যের তালে তালে মণ্ডপে নাচ-গান-আরতি আর দেবী বন্দনা দুর্গাপূজার প্রধান অনুসঙ্গ। ঢাক-ঢোলের এ হাট যেন জানান দিচ্ছে দেবী দুর্গার আগমন বার্তা। বাহারি রং আর আকারের ঢাক-ঢোল, বাঁশি , খাসি, খোলসহ অসংখ্য বাদ্যযন্ত্রের পসরা সাজিয়েছেন দোকানিরা। বাদ্যযন্ত্রসহ যন্ত্রীরা এসেছেন ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, সিলেট, ঢাকা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, নরসিংদী, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, হবিগঞ্জসহ দেশের নানা প্রান্ত থেকে।

durga-puja-(2)

প্রায় ৫শ বছরের পুরনো দেশের একমাত্র বাদ্যযন্ত্রের হাট সনাতন ধর্মাবলম্বীদের দিচ্ছে বাড়তি আনন্দ। দিনে দিনে দুর্গোৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে এ হাট। তবে মজার বিষয় হচ্ছে এ হাটে আসলে কোনো বাদ্যযন্ত্র বিক্রি হয় না। যন্ত্রসহ বিক্রি হন যন্ত্রীরা। বলা যায় পূজার জন্য যন্ত্রীসহ বাদ্যযন্ত্র ভাড়া নেয়া। যন্ত্রীসহ পছন্দের বাদ্যটি ভাড়া হয় এ হাটে। পূজা শুরুর আগে দরদাম ঠিক করে বায়নার টাকা দিয়ে বাদ্যযন্ত্রসহ যন্ত্রীদের সঙ্গে করে নিয়ে যান পূজার আয়োজকরা।

প্রশাসনের সহযোগিতা থাকায় এবার হাটে স্বাচ্ছন্দে বেচাকেনা করতে পারছেন ক্রেতা-বিক্রেতারা। দোকানিরা জানান, এ হাটে বিক্রি হচ্ছে ভালো। হাতের নাগালে পছন্দের বাদ্যসহ যন্ত্রী পেয়ে খুশি ক্রেতারাও। প্রতিজন ঢাকী ১০ থেকে ১২ হাজার, বাঁশিবাদক ৫ থেকে ৭ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছেন। আর ছোট ব্যান্ডদল ১৫ থেকে ২০ এবং ৭/৮ জনের বড় দল ৪০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকায় বিক্রি হচ্ছেন।

জানা গেছে, প্রায় ৫শ বছর ধরে কটিয়াদীতে বসছে ঢাক-ঢোলের হাট। জনশ্রুতি আছে, ষোড়শ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে স্থানীয় রাজা নবরঙ্গ রায় কটিয়াদীর চারিপাড়ায় তার রাজপ্রাসাদে প্রথম দুর্গাপূজার আয়োজন করেন। রাজবাড়ির পূজায় ঢাক, ঢোল, বাঁশিসহ অংশ নিতে খবর পাঠানো হয়, বিক্রমপুর পরগনায় যন্ত্রীদের কাছে। সেসময় বিক্রমপুর থেকে আসা যন্ত্রীরা পূজার দুইদিন আগে কটিয়াদী-মঠখোলা সড়কের পাশে ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে যাত্রাঘাট নামক স্থানে এসে জড়ো হতেন। সেই থেকে প্রতিবছর এখানে বসে বাদ্য ও বাদকের হাট।

durga-puja-(2)

পরে পার্শ্ববর্তী মসূয়া গ্রামে অস্কার বিজয়ী বরেন্য চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের পূর্বপুরুষ হরি কিশোর রায় চৌধুরী তার বাড়িতে ধুমধামে দুর্গাপূজার আয়োজন করেন। বিভিন্ন মণ্ডপে আয়োজন করা হয় ঢাকের প্রতিযোগিতার। আর তখন স্থানীয় প্রভাবশালীদের মধ্যে ঢাকের হাটের স্থান নিয়ে দ্বন্দ্ব দেখা দেয়। পরে এ হাট স্থানান্তর করা হয় আড়িয়াল খাঁ নদীর তীরবর্তী কটিয়াদীর পুরাতন বাজারের মাছ মহাল এলাকায়।

কটিয়াদী উপজেলা হিন্দু-বৌদ্ধ-খৃষ্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি বেনী মাধব ঘোষ জানান, ঢাকের হাটকে ঘিরে কটিয়াদী বাজার এলাকায় শত শত মানুষের সমাগম ঘটে। হাটের ব্যবস্থাপনায় রয়েছে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারের সমন্বয়ে একটি ব্যবস্থাপনা কমিটি। ক্রেতা-বিক্রেতাদের নিরাপত্তায় প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয় স্থানীয় প্রশাসন।

দুর্গাপূজা শুরুর আগের তিন দিন এ হাট বসে। সে অনুসারে গত রোববার হাট শুরু হয়ে আজ মঙ্গলবার শেষ হচ্ছে ঢাকের হাট।

নূর মোহাম্মদ/এফএ/জেআইএম

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।