রাসেলের জীবনের মূল্য নির্ধারণ করলেন দুই নেতা

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি ব্রাহ্মণবাড়িয়া
প্রকাশিত: ০৯:৩৭ পিএম, ২৭ মে ২০১৮ | আপডেট: ০৯:৪৮ পিএম, ২৭ মে ২০১৮

দুটি অস্থায়ী চাকরির আশ্বাস দিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আলোচিত নৈশপ্রহরী রাসেল মিয়ার (১৯) মৃত্যুর ঘটনা রফাদফা করা হয়েছে।

গতকাল শনিবার রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভা ভবনে মেয়রের কার্যালয়ে বৈঠকের মাধ্যমে চাঞ্চল্যকর এ মৃত্যুর ঘটনাটি রফাদফা করেন পৌরসভার মেয়র নায়ার কবির ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আল মামুন সরকার। চাকরির বিনিময়ে রাসেলের মৃত্যুর ঘটনায় কোনো মামলা না করার শর্ত জুড়ে দেয়া হয়েছে তার পরিবারকে।

রাত সাড়ে ১০টা থেকে ১২টা পর্যন্ত চলা ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন- জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল বারী চৌধুরী, সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুল আলম খোকন, সদর মডেল থানা পুলিশের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. নবীর হোসেন, পরিদর্শক (তদন্ত) জিয়াউল হক, নিহত রাসেলের বড় ভাই লিটন মিয়াসহ আরও অনেকে।

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, মৃত্যুর ঘটনা মিমাংসায় রাসেলের বড় ভাই লিটন মিয়াকে পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে এবং ছোট ভাই রুবেল মিয়াকে পৌরসভা কার্যালয়ে অস্থায়ী চাকুরি দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। এছাড়া রাসেলের মা আমেনা বেগমকে কিছু টাকা দেয়ারও সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে সূত্রটি জানিয়েছে। বৈঠকের পরই রোববার দুপুরে আমেনা বেগমকে থানায় ডেকে নিয়ে নগদ দুই লাখ টাকা দেয়া হয়। এ সময় মেয়র নায়ার কবিরের ভাতিজা আসিফ ইকবাল খানকে দায়ী করে থানায় জমা দেয়া আমেনা বেগমের লিখিত এজহারটি প্রত্যাহার করানো হয়।

বৈঠক সূত্রে আরও জানা গেছে, অনেকটা জোর করেই রাসেলের পরিবারকে মেয়র ও আওয়ামী লীগ নেতার নির্ধারণ করা রায় মানতে বাধ্য করা হয়েছে। ভাতিজা আসিফকে নির্দোষ দাবি করে পুলিশ অতি উৎসাহী হয়ে এ কাজ করেছে বলে অভিযোগ করেন মেয়র নায়ার কবির।

আওয়ামী লীগের লোকজনের প্রভাবে পুলিশ রাসেলের মায়ের এজহার হত্যা মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করছে না- এ নিয়ে সাংবাদিকরা ফোন করে বক্তব্য জানতে চাওয়ায় আওয়ামী লীগ নেতা আল মামুন সরকার সাংবাদিকদের ইঙ্গিত করে দেখে নেয়ার হুমকিও দেন।

তবে জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আল মামুন সরকার বলেন, কোনো রফাদফা হয়নি। এটা কি কোনো খুন-মার্ডারের ঘটনা? যদি হয়ে থাকে তাহলে সেটি পুলিশের হাতে হয়েছে। পাবলিকের হাতে তো কোনো কিছু হয়নি। যে কোনো একটা দুর্ঘটনায় ছেলেটা মারা গেছে। ছেলেটার পরিবারটাকে কীভাবে পুনর্বাসন করা যায় সেজন্য পৌরসভার মাস্টাররোলে এবং পুলিশের একটি চাকরির জন্য আমরা বলেছি।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভার মেয়র নায়ার কবির বলেন, মানবিক দিক বিবেচনা করে পৌরসভায় একটা ছেলেকে এবং পুলিশে আরকেটি ছেলেকে চাকরি দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।

সদর মডেল থানা পুলিশের পরিদর্শক (তদন্ত) জিয়াউল হক জাগো নিউজকে বলেন, রাসেলর মা তার পূর্বের এজহারটি প্রত্যাহারের পাশাপাশি এ ঘটনায় কোনো মামলা করবেন না মর্মে লিখিত দিয়েছেন। তবে পুলিশের দুই লাখ টাকা দেয়ার বিষয়টি সঠিক নয় বলে দাবি করেন তিনি।

তবে রাসেলের বড় ভাই লিটন মিয়ার কাছে বৈঠকের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি শাহ্জাদা নামে এক সাংবাদিকের সঙ্গে কথা বলতে বলেন।

এর আগে গত ২১ মে শহরের সিটি সেন্টারস্থ স্বপ্নলোকে ফ্যাশন হাউজে চুরির অভিযোগে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের এটিএম বুথের নৈশপ্রহরী রাসেলসহ অন্তত ৮ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করে থানায় নিয়ে যায় পুলিশ।

ওই ফ্যাশন হাউজটি মেয়রের ভাতিজা আসিফ ইকবালের মালিকানাধীন। ওইদিন রাতেই থানা ভবনের ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়ে গুরুতর আহত হয় রাসেল।

পরে ২৪ মে রাত ৩টা ২০ মিনিটে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান রাসেল। এ ঘটনায় রাসেলর মা আমেনা বেগম বাদী হয়ে সদর মডেল থানায় আসিফ ইকবালকে প্রধান আসামি করে হত্যার এজহার জমা দেন। তবে পুলিশ এজহারটি গ্রহণ করলেও হত্যা মামলা হিসেবে নথিভুক্ত করেনি।

আজিজুল সঞ্চয়/এএম/পিআর/এমএস