এক ঝাঁক কিশোরীর অন্ধকার থেকে আলোর পথে ফেরার গল্প

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি ফরিদপুর
প্রকাশিত: ০৪:১৯ পিএম, ১৭ জুন ২০১৮

আদিম অন্ধকার গুহা থেকে রোদ ঝলমল আলোর দুনিয়ায় ফিরতে চায় এক দল কিশোরী। তাদের ফুটফুটে চেহারায় চকিত চাহনীর আড়ালে গভীর আকুতি-ভয়াল আর্তনাদ। শত বছরের তমসার ধূম্রজালকে আঘাত হানবে কে? একদিন ঠিকই অচলায়তন ভাঙতে শুরু করলো কেউ একজন, সঙ্গে সায় দিলো ক’জনা।

১৮১৫ সালে ব্রিটিশরা ফরিদপুর জেলা শহরের গোড়াপত্তন করলেও এই শহরের ইতিহাস আরও পুরনো। পদ্মা তীরের এই অঞ্চলটি দেশের অনেক জেলায় যাওয়া আসার ট্রানজিট রুট। এ কারণেই হয়তো এখানে ৩০ বর্গ কিলোমিটারের মধ্যে গড়ে উঠেছিলো তিনটি যৌনপল্লী, যা এখনও বিদ্যমান। পদ্মাপাড়ের গোয়ালন্দ ও সিঅ্যান্ডবি ঘাট আর শহরের রথখোলা পল্লী। দুই শতাধিক বছরের আনুষ্ঠানিক পথচলায় এই পল্লীগুলোতে কালের বিবর্তনে ঠাঁই মিলেছে হাজারো হতভাগ্য নারীর। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আরও অনেক অনুষঙ্গ, যেমন মাদক, দালাল, পাচার, প্রতারণা ইত্যাদি।

আমাদের তথাকথিত সমাজের চোখে নিষিদ্ধ পল্লী হিসেবে পরিচিত ওই আচ্ছাদিত বসতিগুলোর ভেতরের কান্না আমরা শুনতে চাইনি।

সেক্ষেত্রে এখনও উদাসিন রাষ্ট্র, প্রশাসন ও সমাজ। বারবার মানবতা উপেক্ষিত হয়ে এসেছে সেখানে। বিশেষ করে ফরিদপুর শহরের রথখোলা যৌনপল্লী যেখানে হাজারের বেশি নারীর অবস্থান। চাকরি দেয়ার নাম করে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে দরিদ্র ও হতাশাগ্রস্ত কিশোরীদের ফুঁসলিয়ে নিয়ে এসে বিক্রি করে দেয়া হচ্ছে রথখোলায়। আইনি ভাষায় ১৮ বছরের নিচের এই শিশুদের পাচার করে নেয়া হচ্ছে সেখানে। তারপর সেখানকার বাড়িওয়ালী, সর্দারনী, তাদের পোষা মাস্তানদের কঠোর বেষ্টনির মধ্যে লীন হয়ে যায় কচি কণ্ঠের আর্তনাদ।

এই পেশা কতটুকু বৈধ, যৌনপল্লীগুলোর ভবিষ্যৎ কি হবে সেটা ভিন্ন বিষয়। প্রতারণার জাল পেতে কোমলমতি শিশুদের অন্ধকার জীবনে ঠেলে দেয়ার এই ঘৃণ্য প্রক্রিয়া সুস্থ বিবেকবান কোনো মানুষ কি সমর্থন করতে পারে? হ্যা, পেরেছে এতদিন। কারণ জায়গাটা আমাদের মতো ভদ্দরলোকদের কাছে অচ্ছুত। সেখানে যা খুশি তাই হউক, ওদিকে যেন নজর দিতে নেই, ভাবটা এমনি ছিল। নিস্পাপ কিশোরীদের প্রতারিত হয়ে ড্রেনে ছিটকে পড়ার গল্প কেউ শুনতে চাইনি আমরা। তবু অনেকের বিবেক কেঁদেছে, সুযোগ খুঁজেছে ওই অসহায় মেয়েদের জন্য কিছু করার। এমনি একজন পার্শ্ববর্তী শহরের সিংপাড়া মহল্লার শ্যামল প্রকাশ অধিকারি।

বিদেশি একটি এনজিওতে কাজ করতেন শ্যামল। ভালো বেতনে চাকরি করে স্বচ্ছলতার মধ্যেই চলছিল তার সংসার। কিন্তু বাড়ির মাত্র ২শ গজ দূরেই রথখোলা পল্লী। সেখানে হরহামেশাই হচ্ছে শিশু পাচার। সেখানে পল্লীর ছোট ছোট ছেলে মেয়েরাই শিক্ষা ও চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। এরাই রাস্তায় ঘুরছে টোকাই নামে, যারা করছে চুরি-ছিনতাই ও মাদক ব্যবসা। নষ্ট হয়ে যাচ্ছে শহরের পরিবেশ। বিষয়টি নাড়া দেয় শ্যামলকে। চাকরি ছেড়ে দিয়ে তিনি কাজ শুরু করেন ওই যৌনপল্লীতে।

প্রথম দু’বছর স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে স্ত্রী ও পাড়া প্রতিবেশীদের কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে যৌনপল্লীর সুস্থ পরিবেশ ফিরিয়ে আনার চেষ্টা শুরু করেন। এই প্রচেষ্টাকে আনুষ্ঠানিক রূপ দিতে ১৯৯৭ সালে প্রতিষ্ঠা করেন শাপলা মহিলা সংস্থা নামের একটি অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। শহরের রথখোলা ও শহরতলীর সিঅ্যান্ডবি ঘাট এই দুটি পল্লীর যৌনকর্মী ও তাদের শিশুদের উন্নয়নে নানা কর্মসূচি নিয়ে শুরু হয় শাপলার পথ চলা। সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে সমমর্যাদায় জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন করার জন্য কাজ করছে সংস্থাটি।

faridpur-sapla

বিশেষ করে যে কাজটি কেউ এর আগে করেনি, সেই চ্যালেঞ্জিং কাজে হাত দেন শ্যামল ও তার সহধর্মনী। দু’শ বছরের ধারাবাহিকতায় ছেদ টানতে চেষ্টা করেন তারা। শিশু ও কিশোরীদের পাচার রোধ ও প্রতারিত হয়ে আসা কিশোরীদের কৌশলে উদ্ধার করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার পরিকল্পনা করেন তারা। সহযোগিতা কামনা করেন স্থানীয় জেলা ও পুলিশ প্রশাসনের কাছে। তাদের এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে স্থানীয় পৌর কাউন্সিলর, দুই জন আইনজীবী, একজন সংবাদকর্মীসহ বেশ ক’জন বিশিষ্ট নাগরিক মিলে গড়ে তোলেন কমিউনিটি ভিত্তিক শিশু সুরক্ষা কমিটি।

সেফ দ্যা চিল্ড্রেন নামের একটি আন্তর্জাতিক সংস্থার দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তারা এই প্রচেষ্টাকে সহায়তা দিতে চুক্তিবন্ধ হয়। তিন বছর আগে জোড়ে সোরে কাজ শুরু করে শাপলা। শুরু হয় গোপন অভিযান। কিন্তু প্রথম ধাক্কা সামলিয়ে উঠতে বেশ বেগ পেতে হয় তাদের। পল্লীর সুবিধাভোগী বাড়িওয়ালী, সর্দারনী, মাস্তান, পুলিশ ও অদৃশ্য হাতের ইশারা এই উদ্ধার অভিযানকে ভণ্ডুল করার চেষ্টা চালায়। আসতে থাকে হুমকি ধামকি। কথা উঠে এসব উদ্ধার কাজ পুলিশের দায়িত্ব, সুরক্ষা কমিটি একাজ করার কে? বিষয়টি নিয়ে জেলা পর্যায়ের প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করে শিশু সুরক্ষা কমিটি।

কয়েক হাত ‘বদল’ হয়ে মোটা অংকের টাকার লেনদেনের পর অন্ধকার কুঠুরিতে বন্দী হতে থাকা কিশোরীদের মুক্ত করার কাজটি বাধাগ্রস্ত হতে থাকে বিভিন্ন পর্যায়ে। হঠাৎ করে একটি ঘটনায় টনক নড়ে প্রশাসনের। দেড় বছর আগে দেশের কোনো একটি থানার ওসির কিশোরী কন্যার খোঁজ মিলে শহরতলীর সিঅ্যান্ডবি ঘাট পল্লীতে। শিশু সুরক্ষা কমিটির কাছে গোপনে খবরটি পৌঁছে দেয় শাপলার কর্মীরা। মেয়েটিকে কড়া নিরাপত্তায় ও কঠোর গোপনীয়তার সঙ্গে উদ্ধার করে পুলিশ। পরে তাকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেয়া হয়। এরপর পুলিশের পক্ষ থেকে সহযোগিতার মাত্রা বাড়তে থাকে কিশোরীদের উদ্ধার কাজে।

মাদারীপুর থেকে মা ছদ্মবেশি এক দালালের কাছ থেকে তের বছরের এক কিশোরীকে উদ্ধারকাজে প্রশাসনের গড়িমসির খবর পৌঁছে দেশ বরেণ্য মানবাধিকার কর্মী অ্যাডভোকেট সালমা আলীর কাছে। তিনি নিজে প্রশাসন ও পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিষয়টি জানানোর পর পরিস্থিতি অনেকটাই পাল্টে গেছে। এখন শিশু সুরক্ষা কমিটি ও শাপলা সংস্থার কিশোরী উদ্ধারের গল্পটা কারও কাছে অজানা নয়। এরসঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিনামূল্যে আইনি সহায়তা প্রদানকারী সংস্থা বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট), সমাজ সেবা অধিদপ্তর, জেলা স্বাস্থ্য বিভাগসহ জেলা ও পুলিশ প্রশাসন।

গত তিন বছর ফরিদপুর শহরের রথখোলা ও সিঅ্যান্ডবি ঘাট পল্লীতে সদ্য প্রবেশ করা অথবা পাচার হবার পথে উদ্ধার করা হয়েছে মোট ৯৫ জন কিশোরীকে। অল্পের জন্য অন্ধকার নর্দমায় পা পিছলে পড়তে পড়তে বেঁচে গেছে ওরা। ওদের মধ্যে ৭৫ জনকে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে নিজ নিজ পরিবারের সদস্যদের কাছে।

faridpur-sapla

সমাজসেবা অধিদফতর পরিচালিত সামাজিক প্রতিবন্ধী মেয়েদের প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে ২৫ জনকে। সমাজ সেবার সেফ হোমে রয়েছে ২০ জন এবং বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির মাধ্যমে ৫ জন কিশোরীকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এসব উদ্ধারকাজ পরিচালনা করা হয় বিশেষ কৌশল ও গোপনীয়তার মাধ্যমে। এমনকি উদ্ধার হওয়া মেয়েদের নাম ও ঠিকানা গণমাধ্যমকেও সরবরাহ করা হয়নি। এসব কিশোরীর ভবিষ্যত জীবন ও আমাদের সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনা করে রক্ষা করা হয় এই গোপনীয়তা।

কম বয়সী কোনো মেয়েকে পল্লীর ভেতর দেখা গেলে কৌশলে তাকে ‘সেফ স্পেস’ নামের একটি কক্ষে নিয়ে কাউন্সিলিং করতে শুরু করে শাপলা সংস্থার প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মীরা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সত্য তথ্য দেয় না নিষ্ঠুর ভাগ্য বিড়ম্বনার শিকার ওই মেয়েরা। পাচার ও প্রতারণার বিষয়টি নিশ্চিত হবার পর ‘সেফ স্পেস’ থেকে কঠোর নিরাপত্তা ও শারীরিক মানসিক সুরক্ষা নিশ্চিত করে একজন নারী কর্মীর সার্বক্ষণিক তত্ত্বাবধানে কিশোরীদের আস্থা অর্জনের চেষ্টা করা হয়। একপর্যায়ে ওরা নিজেদের পাচার হয়ে আসার প্রকৃত কাহিনী ও সঠিক নাম পরিচয় প্রকাশ করে। তাদেরকে আশ্বস্ত করা হয় নিরাপত্তার সকল পর্যায়ে। পরিবারে ফিরিয়ে দেয়ার সময় উদ্ধারের স্থান দেখানো হয় বাসস্ট্যান্ড, বাজার অথবা কোনো পাবলিক প্লেস-এ। সংস্থার পক্ষ থেকে বাড়ি ফিরে যাবার পরও অভিভাবকদের সঙ্গে ফলোআপ করা হয় ওদের অবস্থা সম্পর্কে।

সমাজসেবা দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, তাদের পরিচালিত শহরের বায়তুল আমানে সামাজিক প্রতিবন্ধী মেয়েদের প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের ১শ আসনের অর্ধেকেরও বেশি এখনও শূন্য পরে আছে।

শাপলা মহিলা সংস্থার নির্বাহী পরিচালক চঞ্চলা মণ্ডল বলেন, যৌনপল্লী থেকে কিশোরী উদ্ধারই নয়, যৌনপল্লীতে থাকা যৌনকর্মীদের স্বাস্থ্য, চিকিৎসা, লেখাপড়াসহ বিভিন্ন বিষয়ে কাজ করছে শাপলা মহিলা সংস্থা। তিনি বলেন, যৌনকর্মীদের সন্তানদের বিভিন্ন স্কুলে লেখাপড়ার সুযোগও করে দেয়া হচ্ছে।

নির্বাহী পরিচালক আরও বলেন, যৌনকর্মীরা শিক্ষার অভাবে মানুষকে বিশ্বাস করে তাদের টাকা জমা রাখতো বা কোনো বাক্সে রেখে দিত। পরে সেই টাকা পয়সা বেশির ভাগ সময় খোয়া যেত। প্রতারণার শিকার হতে হত তাদের।

তিনি বলেন, শিক্ষার ফলে যৌনকর্মীরা এখন ব্যাংক একাউন্টে টাকা জমাতে শুরু করেছে। নাম স্বাক্ষর করতে শিখেছে তারা। যৌনকর্মীদের মধ্যে কেউ কেউ নিজের ভুল বুঝতে পেরে সন্তানকে শিক্ষার মাধ্যমে সুপথে নেয়ারও চেষ্টা করছে। এছাড়া যৌনকর্মীরা যাতে নির্যাতিত না হয় সেই বিষয়ে তাদের পাশে থাকেন শাপলা মহিলা সংস্থার কর্মীরা।

শাপলা মহিলা সংস্থার প্রকল্প পরিচালক প্রশান্ত সাহা জানান, সমাজের সুবিধাবঞ্চিত এই যৌনকর্মীদের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে দীর্ঘদিন যাবৎ কাজ করে আসছে শাপলা। জন্ম নিবন্ধন না থাকায় এই শিশুরা শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন নাগরিক সেবাপ্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হচ্ছিল। এরই ধারাবাহিকতায় তাদের সন্তানদের জন্ম নিবন্ধনের আওতায় আনা হয়েছে।

প্রকল্প পরিচালক আরও জানান, সচেতনতার অভাবে যৌনকর্মীরা তাদের পল্লীতে জন্ম নেয়া শিশুদের জন্ম নিবন্ধন করার ব্যাপারে অনাগ্রহী ছিল। এছাড়া নির্ধারিত সময়ের পরে জন্ম নিবন্ধন করতে গেলে যে বাড়তি অর্থ দিতে হয় সেই কারণেও তাদের অনাগ্রহ ছিল।

তিনি জানান, পৌর মেয়র বিনামূল্যে জন্ম নিবন্ধন সনদ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিলে আমরা তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে জন্ম নিবন্ধন করতে উদ্বুদ্ধ করি।

জেলা সমাজসেবা অধিদফতরের উপ-পরিচালক এস এম আলী আহসান জানান, দেশের বিভিন্নস্থান থেকে পাচার হয়ে যৌনপল্লীতে আসা কিশোরীদের উদ্ধার করে পরিবার ও সেফহোমে ফিরিয়ে দেয়ার কাজটি করে আসছে ফরিদপুরের শাপলা মহিলা সংস্থা। পাশাপাশি উদ্ধার হওয়া কিশোরীদের স্বাবলম্বী হতে তাদের পাশে থেকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করছে প্রতিষ্ঠানটি। তিনি আরও জানান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ তাদের আলোর পথে নিয়ে আসতে কাজ করছে শাপলা।

আমাদের প্রত্যাশা, শাপলা মহিলা সংস্থা ফরিদপুরের প্রশাসনকে সঙ্গে নিয়ে পুনর্বাসন কেন্দ্রের শূন্য আসনগুলো অচিরেই পূর্ণ করে দেবেন। স্বপ্ন ভঙ্গ হবার আগেই যেন হতভাগ্য এই কিশোরীরা খুঁজে পায় আলোর ঠিকানা।

এমএএস/এমএস