চুলা বানিয়ে কবুলজানের দারিদ্র্য জয়

ফেরদৌস সিদ্দিকী ফেরদৌস সিদ্দিকী , নিজস্ব প্রতিবেদক রাজশাহী
প্রকাশিত: ০৯:৪২ এএম, ০৮ মার্চ ২০১৯

চুলা বা উনুন রয়েছে প্রত্যেক রান্নাঘরেই। গ্রামাঞ্চলের গৃহিণীরা রাঁধেন মাটির চুলায়। ধোঁয়ায় কেঁদে-কেটে একাকার। হালে সেই রান্নাঘরে বসেছে আধুনিক চুলা। অনেকেই একে ডাকেন ‘বন্ধু চুলা’। কাদামাটি দিয়ে বিশেষ এই চুলা বানিয়ে দারিদ্র্য জয় করেছেন রাজশাহীর তানোরের কবুলজান (৪৫)। গত ৫ বছরে তিনি বানিয়েছেন ৮ শতাধিক বিশেষ এই চুলা।

বেকল বন্ধু চুলাই নয়, দুই চুলা, তিন চুলা, ইঞ্জিন চুলা, এক তোলা চুলা, দুই তোলা চোলা এবং শিকের চুলা বানিয়ে বিক্রি করেন কবুলজান। তার আয়ে সচ্ছলতা ফিরেছে সংসারে।

তানোর পৌরশহরের হরিদেবপুর গ্রামের বাসিন্দা কবুলজান গ্রামে গ্রামে গিয়েও চুলা বানিয়ে দেন। তার দেখাদেখি অনেকেই এসেছেন চুলা বানানোর এ কাজে। এরা আবার প্রশিক্ষণ নিয়েছেন কবুলজানের কাছ থেকেই।

কথা হয় কবুলজানের সঙ্গে। তিনি বলেন, দিনমজুর বাবার সংসারে তারা ছিলেন পাঁচ ভাই বোন। তিনি ছিলেন সবার বড়। অভাবে টেনেটুনে প্রাথমিকের গণ্ডি পেরিয়েছেন কেবল। কন্যাদায়গ্রস্ত বাবা মাত্র ১৫ বছর বয়সে বিয়ে দিয়ে দেন।

স্বামী মোবারক আলী ছিলেন হতদরিদ্র। শ্বশুরবাড়ির ছোট্ট একটি কুঁড়ে ধরে শুরু করেন স্বপ্নের সংসার। অন্যের ক্ষেতে দিনমজুরি করে স্বামী সংসারের হাল ধরেন। সেই আয়ে সংসার চালানো হয়ে পড়ছিল দুরহ। ভেবেচিন্তে শুরু করেন হাঁস-মুরগি পালন। ঢেঁকিতে অন্যের ধান ভানতেন। মৌসুমে ভাপাপিঠাও বিক্রি করেন তিনি। সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে প্রাণান্তর চেষ্টা চালান স্বামীর সঙ্গে। ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে তাদের কষ্টের সঞ্চয়।

এক পর্যায়ে সঞ্চয় ভেঙে বাড়ির পাশে মুদি দোকান দেন কবুলজান। সংসার সামলে দোকান চালাতেন তিনি। দিনমজুরি করে এসে স্বামীও বসতেন দোকানে। সংসার খরচ মিটিয়ে জমানো অর্থ দিয়ে দুটি দুধেল গাই কেনেন কবুলজান। মুদিদোকানের পাশাপাশি শুরু করেন দুধ বিক্রি। ধীরে ধীরে সংসারে ফেরে সচ্ছলতা। বড় হয়েছে ক্ষুদ্র দোকানটিও।

গত ৫ বছর ধরে বিভিন্ন ধরনের চুলা তৈরি করছেন কবুলজান। এ কাজের শুরুর কথা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বছর পাঁচেক আগে তিনি তার এক নিকটাত্মীয়ের বাড়ি বেড়াতে গিয়েছিলেন। সেখানেই দেখেন সিমেন্টের তৈরি আধুনিক চুলা। বাড়ি ফিরে কাদামাটিতে অবিকল সেই চুলা বানাতে সক্ষম হন তিনি।

জ্বালানি সাশ্রয়ী ও ধোঁয়াবিহিনী এ চুলা তার বিক্রি হচ্ছে দেড়শ টাকায়। অথচ সিমেন্টের এই চুলার দাম ১২শ টাকা। কবুলজানের তৈরি সস্তা এই চুলা এলাকায় ব্যাপক জনপ্রিয়তা পেয়েছে। গত পাঁচ বছরে নিজহাতে বানানো আট শতাধিক চুলা বিক্রি করেছেন তিনি।

কবুলজানের সংসারে দুই ছেলে ও এক মেয়ে। এক ছেলে বাবার সঙ্গে কৃষিকাজ করেন। আরেক ছেলে পড়ালেখা করছেন। কয়েক বছর আগে বিয়ে দিয়েছেন মেয়ের। ছেলের পড়াশোনা এমনকি সংসার খরচার বড় অংশ আসে কবুলজানের আয় থেকেই। অন্যের জমি বর্গা নিয়ে চাষাবাদ করছেন তিনি। বাড়ির পাশের ফাকা জায়গাই গড়ে তুলেছেন দেশী ফলের বাগান। পরিশ্রম ও একাগ্রতায় ঘুরে দাঁড়িয়েছেন কবুলজান।

এফএ/এমএস

আপনার মতামত লিখুন :