পর্দা কেলেঙ্কারির পর এবার বৃক্ষরোপণে দুর্নীতি

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি ফরিদপুর
প্রকাশিত: ০৫:৫২ পিএম, ০৪ ডিসেম্বর ২০১৯

ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পর্দা কেলেঙ্কারির পর এবার বৃক্ষরোপণে অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিষয়টি নিয়ে চলছে আলোচনা-সমালোচনা।

মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল চত্বরে বিভিন্ন প্রজাতির বৃক্ষরোপণে ২০ লাখ ২ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। কিন্তু নামমাত্র হাসপাতাল ও মেডিকেল চত্বরে কিছু ফল ও ফুলের গাছ লাগিয়ে বরাদ্দকৃত অর্থ লোপাট করা হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৮ সালের প্রথম দিকে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপন শীর্ষক প্রকল্পে বৃক্ষরোপণে ২০ লাখ ২ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। বৃক্ষরোপণ প্রকল্পটি গণপূর্ত বিভাগের আরবরিকালচার ঢাকার তত্ত্বাবধানে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হয়। নামমাত্র কাজ শেষে সিকিউরিটি মানি রেখে ঠিকাদারকে ১৭ লাখ ২ হাজার ৩১৯ টাকার বিল দেয়া হয়।

ফরিদপুর গণপূর্ত বিভাগের এক পত্র থেকে জানা যায়, ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপন শীর্ষক প্রকল্পে বৃক্ষরোপণে ২০ লাখ ২ হাজার টাকা বরাদ্দ করা হয়। আরবরিকালচার ঢাকার তত্ত্বাবধানে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বৃক্ষরোপণ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়। প্রকল্পের মধ্যে ছিল গাছ লাগানো উপযোগী মাটি সরবরাহ, সার সংগ্রহ ও রোপণ স্থানে প্রয়োগ, গাছের চারা ক্রয়, ঘাস কাটার মেশিনসহ যন্ত্রাংশ ক্রয়। ওই সময় প্রকল্পটির পরিচালক ছিলেন ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক ডা. আবুল কালাম আজাদ।

সরেজমিনে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল চত্বরে গিয়ে দেখা যায়, কিছু ফুলের গাছ লাগানো রয়েছে। এছাড়া ১৮৬টি কদম, কৃষ্ণচূড়া, নারকেলসহ ফলের চারা লাগানো হয়েছে। পাশাপাশি প্রকল্পে কিছু যন্ত্রাংশ কেনার কথা থাকলেও তা চোখে পড়েনি। নামমাত্র কিছু গাছের চারা লাগিয়ে প্রকল্পের বরাদ্দকৃত অর্থ লুটপাট করা হয়েছে।

medicle-gas

হাসপাতাল চত্বরে লাগানো কৃষ্ণচূড়া গাছ

ফরিদপুর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শম্ভু রাম পাল বলেন, ‘আমি বর্তমানে রাজবাড়ীতে কর্মরত। অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছি ফরিদপুরের। আমার জানা মতে, বৃক্ষরোপণ প্রকল্পটি গণপূর্ত বিভাগের আরবরিকালচার ঢাকার তত্ত্বাবধানে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হয়েছে। কাজটি ঢাকা অফিসের কর্মকর্তারা দেখভাল করছেন। ফরিদপুর অফিস এ কাজের বিষয়টি দেখভাল করেনি। ফরিদপুর থেকে শুধু কাজের বিল দেয়া হয়েছে।’

ফরিদপুর মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. এস এম খবিরুল ইসলাম বলেন, ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের নির্মাণকাজের প্রকল্প পরিচালক যিনি ছিলেন বিষয়টি তিনিই ভালো বলতে পারবেন। এ বিষয়ে আমার কিছু জানা নেই। গাছের চারা লাগানোর কাজটি গণপূর্ত বিভাগ বাস্তবায়ন করেছে। প্রকল্প পরিচালক কাজটি বুঝে নিয়েছেন। তারাই ভালো বলতে পারবেন।

ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক কামদা প্রসাদ সাহা বলেন, ‘আমি ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২০১৮ সালের এপ্রিলে যোগ দেই। গাছের চারা লাগানোর বিষয়ে আমি কিছু জানি না। ওই প্রকল্পের পরিচালক আমি ছিলাম না। ওই প্রকল্পের পরিচালক ছিলেন তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক আবুল কালাম আজাদ।’

গাছের চারা লাগানো প্রকল্পটির পরিচালক ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তৎকালীন তত্ত্বাবধায়ক ডা. আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

medicle-gas-3

হাসপাতাল চত্বরে বরাদ্দকৃত অর্থে লাগানো ফলের গাছ

ফরিদপুর গণপূর্ত বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী নওয়াব আলী বলেন, গাছের চারা লাগানো প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে ঢাকার গণপূর্ত বিভাগের আরবরিকালচার। ঢাকা থেকেই ঠিকাদার এসেছিল, তারাই কাজ করেছে। দেখভালও করেছেন ঢাকার কর্মকর্তারা। ঢাকা থেকেই প্রকল্পের ফান্ড এসেছে ফরিদপুরে। তাদের নির্দেশে বিল দিয়েছেন নির্বাহী প্রকৌশলী।

গাছের চারা রোপণ প্রকল্প চলাকালীন ফরিদপুর গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্বে ছিলেন মানিক লাল সরকার। বর্তমানে তিনি যশোর গণপূর্ত বিভাগের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত।

এ বিষয়ে তিনি বলেন, গাছের চারা রোপণ প্রকল্পটি সরাসরি ঢাকা গণপূর্ত বিভাগের আরবরিকালচারের তত্ত্বাবধানে বাস্তবায়ন করা হয়। তারাই প্রকল্পটি তদারকি করেছে। কাজের বিল ফরিদপুর অফিস থেকে দেয়া হয়েছে।

মানিক লাল সরকার আরও বলেন, গাছের চারা রোপণ প্রকল্পের বরাদ্দ ছিল ২০ লাখ ২ হাজার টাকা। সিকিউরিটি মানি রেখে ১৭ লাখ ২ হাজার ৩১৯ টাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দেয়া হয়। ঢাকা গণপূর্ত বিভাগের আরবরিকালচারের প্রধান বৃক্ষপালনবিদ শেখ মো. কুদরত-ই-খোদার নির্দেশে ফরিদপুর থেকে কাজের বিল দেয়া হয়।

এ বিষয়ে জানতে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগের আরবরিকালচারের প্রধান বৃক্ষপালনবিদ শেখ মো. কুদরত-ই-খোদার মোবাইলে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কল রিসিভ করেননি।

medicle-gas-3

মেডিকেল চত্বরে লাগানো কিছু ফুলের গাছ

এর আগে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পর্দা কেলেঙ্কারিসহ সরঞ্জামাদি কেনাকাটায় দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া যায়। আলোচিত পর্দা কেলেঙ্কারিসহ সরঞ্জামাদি ক্রয়ে দুর্নীতি ও ১০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ছয়জনকে আসামি করে মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

১০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে যন্ত্রপাতি সরবরাহকারী দুই প্রতিষ্ঠানের মালিক, মেডিকেল কলেজের একজন সহযোগী অধ্যাপক, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, হাসপাতালের একজন জুনিয়র কনসালট্যান্ট ও সাবেক প্যাথলজিস্টকে মামলায় আসামি করা হয়।

দুদকের ফরিদপুর সমন্বিত জেলা কার্যালয়ে বুধবার (২৭ নভেম্বর) দুপুরে এ মামলা করা হয়। মামলার বাদী দুদকের ঢাকা প্রধান কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মামুনুর রশীদ চৌধুরী।

মামলার আসামিরা হলেন- মেসার্স অনিক ট্রেডার্সের প্রোপ্রাইটর আব্দুল্লাহ আল মামুন, মেসার্স আহমেদ এন্টারপ্রাইজের প্রোপ্রাইটর মুন্সী ফররুখ হোসাইন, জাতীয় বক্ষব্যাধি হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মুন্সী সাজ্জাদ হোসেন, ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক (দন্ত বিভাগ) ডা. গণপতি বিশ্বাস, ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সাবেক জুনিয়র কনসালট্যান্ট (গাইনি) ডা. মিনাক্ষী চাকমা ও ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সাবেক প্যাথলজিস্ট ডা. এ এইচ এম নুরুল ইসলাম।

ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পর্দা কেলেঙ্কারিতে ছয়জনকে আসামি করে মামলার অনুমোদন দেয় দুদক। গত মঙ্গলবার (২৬ নভেম্বর) রাজধানীর সেগুনবাগিচায় দুদকের প্রধান কার্যালয়ে কমিশনের সভায় এ অনুমোদন দেয়া হয়।

দুদক সূত্রে জানা যায়, দুদকের সহকারী পরিচালক মামুনুর রশীদ চৌধুরী বাদী হয়ে দণ্ডবিধির ৪০৯/৫১১/১০৯ ধারা এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় মামলাটি করেন।

২০১২ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত মেসার্স অনিক ট্রেডার্স ৫১ কোটি ১৩ লাখ ৭০ হাজার টাকার ১৬৬টি যন্ত্রপাতি সরবরাহ করে। অনিক ট্রেডার্স ৪১ কোটি ১৩ লাখ ৭০ হাজার টাকার বিল পেলেও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ১০ কোটি টাকা যন্ত্রপাতির দাম বেশি দেখানোসহ বিভিন্ন অসঙ্গতির কারণে বিল আটকে দেয়। এ কারণে ২০১৭ সালের ১ জুন বকেয়া আদায়ে হাইকোর্টে একটি রিট করে অনিক ট্রেডার্স।

রিটের পর স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালকের কাছে অনিক ট্রেডার্সের সরবরাহ করা ১০ কোটি টাকার যন্ত্রপাতির একটি তালিকা চেয়ে পাঠান।

ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক কামদা প্রসাদ সাহা ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর ওই ১০ কোটি টাকার বিপরীতে দামসহ ১০ আইটেমের যন্ত্রপাতির একটি তালিকা দেন।

ফরিদপুর মেডিকেল সামগ্রী কেনায় দুর্নীতি তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুদকের সূত্রগুলো জানায়, ফরিদপুর মেডিকেল কলেজের এমএসআর সামগ্রী কেনার জন্য ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়কের কার্যালয় থেকে ২০১৪-১৫ ও ২০১৫-১৬ অর্থবছরে এমএসআর সামগ্রী সরবরাহের জন্য ঠিকাদার নিয়োগে দরপত্র বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। ঢাকার পল্লবীর মেসার্স আহমেদ এন্টারপ্রাইজ, মেসার্স অনিক ট্রেডার্স ও বনানীর মেসার্স আলী ট্রেডার্সের দরপত্র দাখিল দেখানো হয়।

বি কে সিকদার সজল/এএম/পিআর