অজ পাড়াগাঁয়ের ভাষাসৈনিকের নামে সড়কটি চেনে না কেউ

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি শরীয়তপুর
প্রকাশিত: ০২:৩০ পিএম, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২১
ছগির হোসেন

ভাষাসৈনিক ডা. গোলাম মাওলা নামে শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার মোক্তারের চর ইউনিয়নে একটি সড়ক আছে। কিন্তু ওই এলাকার কিছু মানুষ জানলেও জেলা ও উপজেলার মানুষগুলো চিনেন না ডা. গোলাম মাওলার নামে একটি সড়ক আছে।

সড়কটি ওই ইউনিয়নের পোড়াগাছা এলাকা থেকে শুরু পাচুখার কান্দি গিয়ে শেষ হয়েছে। ওই সড়কটি দিয়ে প্রতিদিন রিকশা, অটোরিকশাসহ অসংখ্য গাড়ি চলাচল করে।

jagonews24

২০০৮ সালে ভাষাসৈনিক ডা. গোলাম মাওলা নামের সড়কটি উদ্বোধন করেন শরীয়তপুর-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ও সাবেক ডেপুটি স্পিকার কর্নেল (অবসরপ্রাপ্ত) শওকত আলী। ভাষাসৈনিকের নামে সড়ক এখন শুধু ‘নামফলকে’ বন্দি।

ভাষাসৈনিক ডা. গোলাম মাওলা সড়কে আট বছর ধরে রিকশা চালানো মো. ইউনুস আলী ঢালী বলেন, আট বছরের মধ্যে কেউ আমার রিকশায় উঠে বলেননি ভাষাসৈনিক ডা. গোলাম মাওলা সড়ক দিয়ে নড়িয়া বাজারসহ কোনো এলাকায় যাবো। এই প্রথম ভাষাসৈনিক ডা. গোলাম মাওলা সড়কের নাম শুনলাম।

সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট শরীয়তপুর জেলা শাখার সভাপতি অ্যাডভোকেট মুরাদ হোসেন মুন্সী বলেন, নড়িয়ায় ভাষাসৈনিক ডা. গোলাম মাওলার নামে একটি সড়ক আছে। সড়কটি অজপাড়াগাঁয়ে, গুরুত্বপূর্ণ সড়ক নয়। শরীয়তপুর-ঢাকা মহাসড়কের কোনো এক জায়গায় তার নাম দেয়া উচিত ছিল।

এছাড়া তার নামে ভাষাসৈনিক ডা. গোলাম মাওলা সরকারি গণগ্রন্থাগার রয়েছে শরীয়তপুরে। যা ডিসি অফিসের পশ্চিম পাশে অবস্থিত। যেখানে এসে জেলার স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা বই পড়ে। পাশাপাশি বাসায় বই নিয়ে পড়তে পারে।

গণগ্রন্থাগার আশা মো. জহিরুল ইসলাম বলেন,
২০১৯ সালে আইন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেছি। বিসিএস পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। তাই সরকারি গণগ্রন্থাগারটিতে এসেছি। বন্ধ ছাড়া প্রতিদিনই বই পড়তে আসি।

ভাষাসৈনিক ডা. গোলাম মাওলা ১৯২০ সালের ২০ অক্টোবর শরীয়তপুরের নড়িয়া উপজেলার মোক্তারের চর ইউনিয়নের পোড়াগাছা গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। গ্রামের লোকজন তাকে কালু বলে ডাকতেন।

জাজিরা উপজেলার পাঁচুখার কান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে থেকে পঞ্চম শ্রেণি পাশ করেন তিনি। ১৯৩৯ সালে নাড়িয়া বিহারী লাল উচ্চ বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগ থেকে মেট্রিক পাশ, ১৯৪১ ও ১৯৪৩ সালে জগন্নাথ কলেজ থেকে আইএসসি ও বিএসসি পাশ করেন তিনি। ১৯৪৬ সালে ঢাকা ও কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূতত্ত্ব বিদ্যায় এমএসসি করেন।

jagonews24

এরপর ১৯৫৪ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাস করেন। তিনি চিকিৎসাজীবনে উপার্জিত অধিকাংশ অর্থ সংগঠন ও সেবামূলক কাজে ব্যয় করেছেন।

তিনি শহীদ মিনারের রূপকার ছিলেন। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে বাংলা ভাষার জন্য আন্দোলনকারীদের যে স্থানটিতে গুলি করা হয়েছিল ঠিক সে স্থানটিতেই নির্মিত হয় প্রথম শহীদ মিনার।

ওই শহীদ মিনারের রূপকার ছিলেন শরীয়তপুর জেলার কৃতি সন্তান ঢাকা মেডিকেল কলেজ ছাত্র সংসদের তৎকালীন ভিপি ডা. গোলাম মাওলা।

জানা যায়, ১৯৫২ সালের অগ্নিঝড়া দিনগুলোতে ডা. গোলাম মাওলার ভূমিকা ছিলো অত্যন্ত উজ্জ্বল ও গৌরবময়।

১৯৫২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি রাতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ প্রাঙ্গণে রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদের সভায় যে চারজন ছাত্রনেতা ১৪৪ ধারা ভঙের পক্ষে মত দিয়েছিলেন তাদের মধ্যে ডা. গোলাম মাওলা অন্যতম।

২১ ফেব্রুয়ারি গুলিবর্ষণের পর সেদিন রাত ৯টায় মেডিকেল কলেজ ব্যারাকে ডা. আজমলের কোয়াটারে কর্মীদের যে সভা হয় সেখানে সভাপতিত্ব করেন ডা. গোলাম মাওলা। ওই সভায় ডা. গোলাম মাওলাকে আহ্বায়ক করে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কর্মপরিষদ পুনর্গঠিত হয়।

২৩ ফেব্রুয়ারি রাতে ডা. গোলাম মাওলার কথামতো ডা. বদরুল আলমের (ঢাকা মেডিকেল কলেজের মেধাবী ছাত্র) স্কেচ (ডিজাইন) অনুযায়ী হাসপাতালের প্রশাসনিক ভবন নির্মাণের জন্য আনা ইট, বালু, সিমেন্ট দিয়ে ডা. গোলাম মাওলা নিজে ডা. আলীম চৌধুরী, ডা. এসডি আহমেদসহ কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে যে স্থানটিতে গুলি করে ছাত্র-জনতাকে হত্যা করে মৃতদেহ ফেলে রাখা হয়েছিল সে স্থানটিতে নিজেরাই নির্মাণ করেন প্রথম শহীদ মিনার।

পরে অবশ্য শহীদদের স্মৃতির উদ্দেশে নির্মিত প্রথম শহীদ মিনারটি ২৫ ফেব্রুয়ারি সরকারের পেটুয়া পুলিশ বাহিনী ভেঙে গুড়িয়ে ভীতসহ উপড়ে ফেলে গর্তে মাটি ভরাট করে নিশ্চিহ্ন করে দেয়।

সম্প্রতি পানিসম্পদ উপমন্ত্রী ও শরীয়তপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য এ কে এম এনামুল হক শামীমের নির্দেশে নড়িয়ায় ভাষা সৈনিক ডা. গোলাম মাওলার বাড়ির সামনে মোক্তারের চর ইউপি চত্বরে ডা. গোলাম মাওলা
ও শহীদের স্মরণে একটি শহীদ মিনারের নির্মাণকাজের উদ্বোধন করা হয়েছে।

ছগির হোসেন/এসএমএম/জিকেএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।