১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত স্কুলে এবার হলো শহীদ মিনার
গাজীপুর জেলার শ্রীপুর পৌর এলাকার মাধখলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। ১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়ে ছিল না স্থায়ী কোনো শহীদ মিনার।
দীর্ঘদিন ধরে ভাষা দিবসের শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের মাধ্যম ছিল এলাকার বিভিন্ন বাড়ি থেকে সংগ্রহ করা কলাগাছ, পুরোনো জীর্ণ কাপড় ও বাঁশ দিয়ে তৈরি অস্থায়ী শহীদ মিনার।
শিক্ষার্থী, শিক্ষকরা নিজেরাই ভাষা দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস উপলক্ষে মাঠের এক কোণে অস্থায়ী শহীদ মিনার তৈরি করেতেন। এতে পুষ্প অর্পণের মাধ্যমে শহীদদের শ্রদ্ধা জানানো হতো।
৫১ বছর ধরে এভাবে অস্থায়ী বেদিতে এই বিদ্যালয়সহ এলাকার শিক্ষার্থীরা শ্রদ্ধা নিবেদন করে আসলেও এবার সেগুলো যেন শুধু অতীতের কথা। শিক্ষার্থীদের দীর্ঘদিনের আকুতিতে এলাকার সমাজহিতৈষী ব্যক্তিগণ এগিয়ে এসে গড়ে তুললেন একটি স্থায়ী শহীদ মিনার।
শহীদ মিনার স্থাপনে সবচেয়ে খুশি ক্ষুদে শিক্ষার্থীরা। আর কয়েকদিন পরেই ভাষা দিবসের অনুষ্ঠান। এ অপেক্ষা যেন আর কাটছে না তাদের। বিদ্যালয় বন্ধ থাকার পরও এই শহীদ মিনার দেখতে প্রতিদিনই শিক্ষার্থীরা উপস্থিত হয়। তাদের ভাষার প্রতি আবেগ, অনুভূতি, ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার গল্প এখন এই শহীদ মিনারকে ঘিরে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তাহমিনা আক্তার বলেন, এই বিদ্যালয়টি ঘনবসতিপূর্ণ একটি এলাকায়। এখানে অধ্যয়ণ করছে ৫৭০ শিক্ষার্থী। এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীসহ আশপাশের আরো বেশ কয়েকটি কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ের অস্থায়ী কলাগাছ দিয়ে তৈরি শহীদ মিনারের বেদিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করতো।
তিনি আরও বলেন, স্থায়ী শহীদ মিনার না থাকায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে অপূর্ণতা বিরাজ করতো। কিন্তু সরকারিভাবে বরাদ্দ না থাকায় এতদিন শহীদ মিনার তৈরি করা যায়নি। তবে গত অর্থবছরে জেলা পরিষদ থেকে এক লাখ টাকা বরাদ্দ পাওয়া যায়। এ টাকা দিয়ে কাজ শুরু হলেও অর্থের অভাবে কাজ বন্ধ হয়ে যায়।
পরে বিদ্যালয়ের সভাপতির ব্যক্তিগত অর্থায়ন ও উদ্যোগে বাকি কাজ সম্পন্ন করে ৩ ফেব্রুয়ারি উদ্বোধন করা হয় শহীদ মিনার বলে জানান তিনি।
বিদ্যালয়ের সভাপতি খলিলুর রহমান বলেন, মাঝপথে কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থীদের মন খারাপ হয়ে যায়। তাদের ইচ্ছা ছিল- এবারই তারা স্থায়ী শহীদ বেদিতে ফুল দিবে। তাদের আবেগ ও অনুভূতি আমাকে বিচলিত করে তোলে। পরে সিদ্ধান্ত নেই শহীদ মিনারের কাজ এবারই সম্পন্ন করতে হবে।
তিনি আরও জানান, বিদ্যালয় মাঠের উত্তর-পূর্ব কোণে অবস্থিত এই দৃষ্টিনন্দন শহীদ মিনারটি গড়তে মোট দুই লাখ বিশ হাজার টাকা খরচ হয়েছে।
বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী তাহমিনা আক্তার বলেন, আমরা সবাই মিলে এবার স্থায়ী শহীদ মিনারে ফুল দিয়ে ভাষা শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে পারবো এটাই আমাদের আনন্দ।
বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী শাহরিয়ার হাসান বলেন, কোভিড-১৯ এর কারণে বিদ্যালয় বন্ধ। তবুও বন্ধুরা মিলে সময় পেলেই এই শহীদ মিনারটি দেখতে আসি। এবার গড়ে তোলা দৃষ্টিননন্দন এই শহীদ মিনারে আমরা ফুল দিতে পারবো, একুশের গান গাবো এটা ভাবতেই আনন্দ খুঁজে পাচ্ছি।
গাজীপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোফাজ্জল হোসেন বলেন, বর্তমানে জেলায় ৭৮০টি প্রাথমিক বিদ্যালয় থাকলেও স্থায়ী শহীদ মিনার রয়েছে ৫৯০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। গাজীপুরে এবার বেশ কয়েকটি বিদ্যালয়ে স্থায়ী শহীদ মিনার হয়েছে। এরমধ্যে এই বিদ্যালয়টি অন্যতম।
তিনি আরো বলেন, কোমলমতি শিশু শিক্ষার্থীদের মায়ের ভাষার প্রতি অন্যরকম আবেগ রয়েছে। একটি বিদ্যালয়ে স্থায়ী শহীদ মিনার হলে ভাষার এই চেতনাটা শুধু দিবস নয় সারা বছর ধরেই ধরে রাখা যায়।
এদিকে গাজীপুর জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রেবেকা সুলতানা বলেন, জেলায় মোট ৩৫২টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শহীদ মিনার রয়েছে ২৪৬ টিতে, ৪৩টি কলেজের বিপরীতে রয়েছে ৩২টিতে, ১৭৮টি মাদ্রাসার শহীদ মিনার রয়েছে ৯টিতে ও চারটি কারিগরি প্রতিষ্ঠানের কোনোটিতেই শহীদ মিনার নেই। এসব প্রতিষ্ঠানে শহীদ মিনার নির্মাণে নির্দেশনা দেয়া রয়েছে।
শিহাব খান/এসএমএম/এমএস