এক থেরাপি সেন্টার দিয়েই চলছে উত্তরের ক্যানসার চিকিৎসা

জেলা প্রতিনিধি
জেলা প্রতিনিধি জেলা প্রতিনিধি রাজশাহী
প্রকাশিত: ০৭:৩৬ পিএম, ২৭ ডিসেম্বর ২০২২

কুষ্টিয়া থেকে ক্যানসার আক্রান্ত ছেলে মহিদুল ইসলামকে নিয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের রেডিওলজি বিভাগে এসেছেন শরিফুল ইসলাম। কয়েক মাস আগে তার ছেলের ক্যানসার ধরা পড়ে। প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে রেডিও থেরাপির জন্য রামেকে পাঠিয়ে দেন সেখানকার চিকিৎসকরা।

শনিবার (২৪ ডিসেম্বর) সকাল থেকে মঙ্গলবার (২৭ ডিসেম্বর) পর্যন্ত হাসপাতালে ঘুরছেন শরিফুল ইসলাম। তবে তিনি সিরিয়াল পাননি। হাসপাতালের একটি স্লিপে সিল মেরে দেওয়া হয়েছে। তাতে সম্ভাব্য সিরিয়াল তারিখ লেখা রয়েছে ২৮ ডিসেম্বর, বুধবার।

শরিফুল ইসলাম বলেন, ‘কুষ্টিয়ার চিকিৎসকরা বলেছিলেন ছেলের বয়স কম। রাজশাহীতে নিয়ে দ্রুত রেডিও থেরাপি দিলে সুস্থ হয়ে যাবে। তাই তাড়াহুড়ো করে মানুষের কাছ থেকে ঋণ করে টাকা নিয়ে রাজশাহীতে এসেছি। কিন্তু এখানে আসার পর বলা হচ্ছে সিরিয়াল পেতে দেরি হবে। এত বড় হাসপাতালে মাত্র একটি মেশিন দিয়েই রোগীর সেবা দেওয়া হচ্ছে। আমাদের তো আর সক্ষমতা নেই। তাই এখানেই অপেক্ষায় আছি।’

তিনি বলেন, ‘অনেকেই থেরাপি দিতে না পেরে বেসরকারি হাসপাতালে চলে যাচ্ছেন। কিন্তু আমি গরিব মানুষ, বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে এত খরচ জোগাতে পারবো না। এমনিতেই চিকিৎসা বাবদ অনেক খরচ করেছি। ধান বিক্রি করে খরচ চালাচ্ছি। এখন সরকারি হাসপাতাল ছাড়া আমার আর কোনো উপায় নেই। ছেলেকে নিয়ে আমরা চারজন লোক রাজশাহীতে আছি। এই কয়েকদিন চারজন মানুষের রাজশাহীতে থাকা-খাওয়া, অন্যান্য খরচ জোগাতে গিয়ে আমার পকেট শূন্য হয়ে যাচ্ছে।’

শরিফুল ইসলামের মতো হতাশা দেখা দিয়েছে পাবনার সিরাজুল ইসলামের। তার মা রাবিয়া বেওয়াকে নিয়ে রামেক হাসপাতালে এসেছিলেন তিনি। ক্যানসার আক্রান্ত মাকে বিভিন্ন স্থানে চিকিৎসা করিয়ে শেষ পর্যন্ত রামেক হাসপাতালের চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। এখানকার চিকিৎসকরাও প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে রাবিয়াকে রেডিও থেরাপি দেওয়ার জন্য বলেছেন। গত দুদিন ধরে তিনিও আছেন অপেক্ষায়। তবে কবে সিরিয়াল পাবে তা তিনি জানেন না।

রামেক হাসপাতালের রেডিওলজি বিভাগের সামনে রোগীদের প্রতিদিনের হতাশার চিত্র এটি। গোটা উত্তরাঞ্চলে মাত্র একটি রেডিওথেরাপি সেন্টার থাকায় ভোগান্তিতে পড়ছেন স্বজনরা। প্রিয় মানুষটিকে বাঁচাতে তাদের আকুতি ও চেষ্টার কমতি নেই। কিন্তু মেশিন স্বল্পতার কাছে অসহায় তারা।

রামেক হাসপাতালের রেডিওলজি বিভাগের তথ্যমতে, এখানে প্রতিদিনই বাড়ছে রোগীর চাপ। গত ১ জুলাই থেকে ২৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত এখানে নতুন রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন ১৩২৯ জন। এসময় পুরাতনরাও চিকিৎসা নিয়েছেন। নতুন ও পুরাতন মিলে গড়ে প্রতিদিন এখানে ১৫০-২০০ জন রোগী রেডিও থেরাপির জন্য আসেন। তবে রামেক হাসপাতালের রেডিওথেরাপির সক্ষমতা প্রতিদিন মাত্র ৬০ জনের।

Ra-(2).jpg

বর্তমানে কোবাল্ট মেশিন, ব্যাবিথেরাপি মেশিন ও সিটি সিমুলেটর মেশিন দিয়ে চলছে রেডিওথেরাপির কাজ। এসব মেশিন দিন দিন সক্ষমতা হারাচ্ছে। আগে এসব মেশিনে দিনে আশির অধিক থেরাপি দেওয়া গেলেও বর্তমানে তা কমে ৬০ জনে দাঁড়িয়েছে। আগামীতে এটি আরও কমবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এতে রোগী ও স্বজনদের ভোগান্তি বাড়ছে।

রামেক হাসপাতালের রেডিওথেরাপি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. অসীম কুমার ঘোষ বলেন, ‘রাজশাহীতে প্রতিদিনই ক্যানসার আক্রান্ত রোগী বাড়ছে। এটি এখন আর কোনো বয়সসীমায় নেই। শিশু থেকে সবার মধ্যেই এখন ক্যানসার ধরা পড়ছে। বিশেষ করে রাজশাহীতে বেশি শনাক্ত হচ্ছে মেয়েদের ব্রেস্ট ক্যানসার। ১৫ শতাংশ রোগই ব্রেস্ট ক্যানসারের। তবে যেভাবে শনাক্ত হচ্ছে আমাদের চিকিৎসার উপকরণ সেভাবে নেই। প্রতিদিন আমরা এখানে গড়ে ৬০ জনকে রেডিওথেরাপি দিতে পারি। চাহিদা থাকে তারও দ্বিগুণ বা তিনগুণ। পর্যায়ক্রমে আমাদের থেরাপি দিতে হয়।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের এখান থেকে বারবার একটি নতুন মেশিন দেওয়ার জন্য আবেদন করা হচ্ছে। আমাদের এখন খুব জরুরি হলো একটি কোবাল্ট মেশিন অথবা একটি লাইনআপ মেশিন। কিন্তু আমাদের বারবার বলা হচ্ছে বিশেষায়িত যে নতুন হাসপাতাল হবে সেখানে এগুলো দেওয়া হবে। নতুন হাসপাতাল নির্মাণকাজ কেবল চলছে। এতদিন আমরা রোগীদের সামাল দেবো কী করে?’

রামেক হাসপাতালে টুডি, থ্রিডি এবং এইচআরডি থেরাপির ব্যবস্থা আছে জানিয়ে ডা. অসীম কুমার ঘোষ বলেন, একটি আধুনিক মেশিন চালাতে মেডিকেল ফিজিওলজিস্ট লাগে। তবে এই পোস্ট এখনো সরকারিভাবে তৈরি না হওয়ায় আমরা পাইনি। আমাদের এখানে পাঁচজন চিকিৎসক ও তিনজন অন্য লোকবল দিয়ে চলছে এই বিভাগ।’

‘বগুড়ায় একটি রেডিওথেরাপির মেশিন থাকলেও সেটিও নষ্ট থাকে বেশিরভাগ সময়। তাই বাধ্য হয়ে রোগীরা এখানেই ছুটে আসেন। কিন্তু আমাদের তো সক্ষমতার বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। সবগুলোতেই পর্যায়ক্রমে চিকিৎসা দিচ্ছি। এ সংকট কাটাতে জরুরি ভিত্তিতে আরও মেশিন দরকার’, যোগ করেন ডা. অসীম কুমার ঘোষ।

এ বিষয়ে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল শামীম ইয়াজদানী বলেন, আমরা মন্ত্রণালয়কে বিষয়টি বলেছি। গোটা উত্তরাঞ্চলে একটি মেশিন হওয়ার কারণেই রোগীদের সিরিয়াল পেতে ভোগান্তি হচ্ছে।

তিনি বলেন, ‘এখানে একটি আধুনিক ক্যানসার হাসপাতালের নির্মাণকাজ চলমান। সেটি শেষ হলে কিছু মেশিন পাবো। তখন এই সমস্যার সমাধান হবে। তবে এর আগেও রোগীদের ভোগান্তি কমাতে আমরা একটি মেশিন আনার চেষ্টা করছি। দেখা যাক কী করতে পারি।’

এসআর/এমএস

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।