সেমিনারে বিশ্লেষকরা

লুটপাটের ঋণ আলাদা শ্রেণিতে রাখার পরামর্শ, কমতে পারে খেলাপি ঋণ

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ০৬:৩৫ পিএম, ১৬ মে ২০২৬
‘ব্যাংকিং খাতের বিপর্যয়, প্রেক্ষিত ইসলামী ব্যাংকিং সেক্টর: জাতীয় অর্থনীতিতে এর প্রভাব ও উত্তরণের পথ’ শীর্ষক সেমিনারে অতিথিরা/ছবি: জাগো নিউজ

ব্যাংকিং খাতে যেসব ঋণ সরাসরি লুটপাট বা অনিয়মের মাধ্যমে বিতরণ হয়েছে, সেগুলোকে সাধারণ খেলাপি ঋণের হিসাব থেকে আলাদা করার পরামর্শ দিয়েছেন খাতসংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, এ ধরনের ঋণ পৃথক শ্রেণিতে রাখলে ব্যাংকগুলোর প্রকৃত খেলাপি ঋণের চাপ কমবে এবং দুর্বল হয়ে পড়া ব্যাংকগুলো ঘুরে দাঁড়ানোর সুযোগ পাবে।

শনিবার (১৬ মে) রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত ‘ব্যাংকিং খাতের বিপর্যয়, প্রেক্ষিত ইসলামী ব্যাংকিং সেক্টর: জাতীয় অর্থনীতিতে এর প্রভাব ও উত্তরণের পথ’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এ মত তুলে ধরেন। ব্যাংক গ্রাহক ফোরাম এ সেমিনারের আয়োজন করে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও ব্র্যাকের চেয়ারপারসন ড. হোসেন জিল্লুর রহমান।

সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ব্র্যাক ব্যাংকের স্বতন্ত্র পরিচালক ও ভাইস চেয়ারম্যান ফারুক মঈনউদ্দীন আহমেদ বলেন, যেসব ঋণ লুটপাটের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছে, সেগুলোকে খেলাপি হিসাবের বাইরে রাখা গেলে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে। এতে নতুন করে ব্যাংকগুলোর সক্ষমতা বাড়বে এবং তারা পুনরায় কার্যকরভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবে।

তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংকগুলো থেকে তুলনামূলক বেশি ঋণ বিতরণের সুযোগ থাকায় লুটপাটকারীরা এসব ব্যাংককে টার্গেট করেছিল। তিনি উল্লেখ করেন, ভারতে ১৯৯৩ সালেই খেলাপি ঋণসংক্রান্ত আইন প্রণয়ন করা হলেও বাংলাদেশে এ ধরনের আইন এসেছে অনেক পরে, ২০২৩ সালে। তার ভাষ্য, দেশের বিদ্যমান খেলাপি ঋণ আইনে এখনো বিভিন্ন দুর্বলতা রয়ে গেছে, যা অনিয়মের সুযোগ তৈরি করেছে।

ফারুক মঈনউদ্দীনের বক্তব্যের সঙ্গে একমত পোষণ করে ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, লুট হওয়া ঋণকে সাধারণ খেলাপি ঋণের তালিকায় না রেখে আলাদা স্লটে নেওয়া হলে সামগ্রিক খেলাপি ঋণের চাপ কমবে। তিনি এটিকে ব্যাংকিং খাতের জন্য একটি “উদ্ভাবনী সিদ্ধান্ত” হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এতে গ্রাহকদের আস্থা পুনরুদ্ধারে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

সেমিনারে সভাপতির বক্তব্যে ব্যাংক গ্রাহক ফোরামের আহ্বায়ক ও ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট আবুল কাশেম হায়দার বলেন, গত ১৫ বছরে সরকারি ও বেসরকারি উভয় ধরনের ব্যাংক থেকেই ব্যাপক লুণ্ঠন হয়েছে, যার প্রভাব এখন পুরো ব্যাংকিং খাতে স্পষ্ট। তিনি বলেন, বর্তমান সরকার পরিস্থিতি মোকাবিলায় কিছু উদ্যোগ নিলেও তার দৃশ্যমান অগ্রগতি এখনো দেখা যাচ্ছে না।

তিনি আরও অভিযোগ করেন, দেশের কিছু শিল্পগ্রুপ বিদেশে বিপুল সম্পদ গড়ে তুললেও সেই অর্থের বড় অংশ এসেছে দেশের ব্যাংকিং খাত থেকে লুটপাটের মাধ্যমে। এর প্রভাব পড়েছে শিল্প খাতেও। গত দুই বছরে নতুন বিনিয়োগ সম্প্রসারণ হয়নি, বরং পোশাকসহ বিভিন্ন খাতের অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে।

সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন গবেষক ও কলামিস্ট ড. মো. মিজানুর রহমান। তিনি বলেন, ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে প্রথম প্রজন্মের বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে ইসলামী ব্যাংকিং জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে। ওই সময় থেকেই ধীরে ধীরে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যাংক খাতে প্রবেশ করে। পরবর্তীতে দ্বিতীয় প্রজন্মের ব্যাংকগুলোতে সুশাসনের দুর্বলতা, ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ বিতরণ ও ব্যবসায়িক প্রভাব বাড়তে থাকে।

তার মতে, ২০০১ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে তৃতীয় প্রজন্মের ব্যাংকগুলোতে পারিবারিক মালিকানা, স্বজনপ্রীতি, উচ্চ খেলাপি ঋণ এবং করপোরেট-রাজনৈতিক দখলদারিত্ব বেড়ে যায়। আর চতুর্থ প্রজন্মে রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংকের লাইসেন্স প্রদান, তারল্য সংকট, অর্থপাচার, আস্থাহীনতা ও খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির প্রবণতা আরও তীব্র আকার ধারণ করে। এ সময় ইসলামী ব্যাংকগুলোও ব্যাপকভাবে দখলদারিত্বের শিকার হয় বলে তিনি মন্তব্য করেন।

ইএআর/এমএমকে

পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন [email protected] ঠিকানায়।